বাংলায় হাবশীদের মধ্যে যাঁহারা প্রাধান্যলাভ করিয়াছিলেন তাঁহাদের মধ্যে মালিক আন্দিল (ফিরোজ শাহ), সিদি ব (মুজাফফর শাহ), হাবশ খান, কাফুর প্রভৃতির নাম বিভিন্ন ইতিহাসগ্রন্থ ও শিলালিপি হইতে জানা যায়। রজনীকান্ত চক্রবর্তী তাঁহার ‘গৌড়ের ইতিহাসে’ আরও কয়েকজন “প্রধান হাবশী”র নাম করিয়াছেন; কিন্তু তাঁহাদের ঐতিহাসিকতা সম্বন্ধে কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না।
০৬. হোসেন শাহী বংশ
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ – হোসেন শাহী বংশ
১
আলাউদ্দীন হোসেন শাহ
বাংলার স্বাধীন সুলতানদের মধ্যে আলাউদ্দীন হোসেন শাহের নামই সর্বাপেক্ষা বিখ্যাত। ইহার অনেকগুলি কারণ আছে। প্রথমত, আলাউদ্দীন হোসেন শাহের রাজ্যের আয়তন অন্যান্য সুলতানদের রাজ্যের তুলনায় বৃহত্তর ছিল। দ্বিতীয়ত, বাংলার অন্যান্য সুলতানদের তুলনায় হোসেন শাহের অনেক বেশি ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন (অর্থাৎ গ্রন্থাদিতে উল্লেখ, শিলালিপি প্রভৃতি) মিলিয়াছে। তৃতীয়ত, হোসেন শাহ ছিলেন চৈতন্যদেবের সমসাময়িক এবং এইজন্য চৈতন্যদেবের নানা প্রসঙ্গের সহিত হোসেন শাহের নাম যুক্ত হইয়া বাঙালীর স্মৃতিতে স্থান লাভ করিয়াছে।
কিন্তু এই বিখ্যাত নরপতি সম্বন্ধে প্রামাণিক তথ্য এ পর্যন্ত খুব বেশি জানতে পারা যায় নাই। তাঁহার ফলে অধিকাংশ লোকের মনেই হোসেন শাহ সম্বন্ধে যে ধারণার সৃষ্টি হইয়াছে, তাঁহার মধ্যে সত্য অপেক্ষা কল্পনার পরিমাণই অধিক। সুতরাং হোসেন শাহর ইতিহাস যথাসম্ভব সঠিকভাবে উদ্ধারের জন্য একটু বিস্তৃত আলোচনা আবশ্যক।
মুদ্রা, শিলালিপি এবং অন্যান্য প্রামাণিক সূত্র হইতে জানা যায় যে, হোসেন শাহ সৈয়দ বংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন এবং তাঁহার পিতার নাম সৈয়দ আশরফ অল-হোসেনী। ‘রিয়াজ’-এর মতে হোসেন শাহের পিতা তাঁহাকে ও তাঁহার ছোট ভাই য়ুসুফকে সঙ্গে লইয়া তুর্কিস্থানের তারমুজ শহর হইতে বাংলায় আসিয়াছিলেন এবং রাঢ়ের চাঁদপুর (বা চাঁদপাড়া) মৌজায় বসতি স্থাপন করিয়াছিলেন; সেখানকার কাজী তাঁহাদের দুই ভাইকে শিক্ষা দেন এবং তাঁহাদের উচ্চ বংশমর্যাদার কথা জানিয়া হোসেনের সহিত নিজের কন্যার বিবাহ দেন। স্টুয়ার্টের মতে হোসেন আরবের মরুভূমি হইতে বাংলায় আসিয়াছিলেন। একটি কিংবদন্তী প্রচলিত আছে যে হোসেন বাল্যকালে চাঁদপাড়ায় এক ব্রাহ্মণের বাড়ীতে রাখালের কাজ করিতেন; বাংলার সুলতান হইয়া তিনি ঐ ব্রাহ্মণকে মাত্র এক আনা খাজনায় চাঁদপাড়া গ্রামখানি জায়গীর দেন; তাঁহার ফলে গ্রামটি আজও পর্যন্ত একানী চাঁদপাড়া নামে পরিচিত; হোসেন কিন্তু কিছুদিন পর তাঁহার বেগমের নিবন্ধে ঐ ব্রাহ্মণকে গোমাংস খাওয়াইয়া তাঁহার জাতি নষ্ট করিয়াছিলেন। এই সমস্ত কাহিনীর মধ্যে কতখানি সত্য আছে, তাহা বলা যায় না। তবে চাঁদপুর বা চাঁদপাড়া গ্রামের সহিত হোসেন শাহের সম্পর্কের কথা সত্য বলিয়া মনে হয়, কারণ এই অঞ্চলে তাঁহার বহু শিলালিপি পাওয়া গিয়াছে।
কৃষ্ণদাস কবিরাজ তাঁহার ‘‘চৈতন্যচরিতামৃতে’ (মধ্যলীলা, ২৫শ পরিচ্ছেদ) লিখিয়াছেন যে, রাজা হইবার পূর্বে সৈয়দ হোসেন “গৌড়-অধিকারী” (বাংলার রাজধানী গৌড়ের প্রশাসনের ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী) সুবুদ্ধি রায়ের অধীনে চাকুরী করিতেন; সুবুদ্ধি রায় তাঁহাকে এক দীঘি কাটানোর কাজে নিয়োগ করেন এবং তাঁহার কার্যে ত্রুটি হওয়ায় তাঁহাকে চাবুক মারেন; পরে সৈয়দ হোসেন সুলতান হইয়া সুবুদ্ধি রায়ের পদমর্যাদা অনেক বাড়াইয়া দেন; কিন্তু তাঁহার বেগম একদিন তাঁহার দেহে চাবুকের দাগ আবিষ্কার করিয়া সুবুদ্ধি রায়ের চাবুক মারার কথা জানিতে পারেন এবং সুবুদ্ধি রায়ের প্রাণবধ করিতে সুলতানকে অনুরোধ জানান। সুলতান তাহাতে সম্মত না হওয়ায় বেগম সুবুদ্ধি রায়ের জাতি নষ্ট করিতে বলেন। হোসেন শাহ তাহাতেও প্রথমে অনিচ্ছা প্রকাশ করিয়াছিলেন, কিন্তু স্ত্রীর নির্বন্ধাতিশয্যে অবশেষে সুবুদ্ধি রায়ের মুখে করোয়ার (বদনার) জল দেওয়ান এবং তাঁহার ফলে সুবুদ্ধি রায়ের জাতি যায়।
এই বিবরণ সত্য বলিয়াই মনে হয়, কারণ কৃষ্ণদাস কবিরাজ দীর্ঘকাল বৃন্দাবনে হোসেন শাহের অমাত্য এবং সুবুদ্ধি রায়ের অন্তরঙ্গ বন্ধু রূপ-সনাতনের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য লাভ করিয়াছিলেন। সুবুদ্ধি রায়ও স্বয়ং শেষজীবনে বহুদিন বৃন্দাবনে বাস করিয়াছিলেন, সুতরাং কৃষ্ণদাস কবিরাজ তাঁহারও সহিত পরিচিত ছিলেন বলিয়া মনে হয়। অতএব কৃষ্ণদাস যে পূর্ব্বোক্ত কাহিনী কোন প্রামাণিক সূত্র হইতেই সংগ্রহ করিয়াছিলেন, তাহাতে সন্দেহের অবকাশ নাই।
পর্তুগীজ ঐতিহাসিক জোআঁ-দে-বায়োস তাঁহার ‘দা এসিয়া’ গ্রন্থে লিখিয়াছেন যে পর্তুগীজদের চট্টগ্রামে আগমনের একশত বৎসর পূর্বে একজন আরব বণিক দুইশত জন অনুচর লইয়া বাংলায় আসিয়াছিলেন; নানা রকম কৌশল করিয়া তিনি ক্রমশ বাঙলার সুলতানের বিশ্বাসভাজন হন ও শেষপর্যন্ত তাঁহাকে বধ করিয়া গৌড়ের সিংহাসন অধিকার করেন। কেহ কেহ মনে করেন যে, এই কাহিনী হোসেন শাহ সম্বন্ধেই প্রযোজ্য। কিন্তু জোআঁ-দে-বারোস ঐ আরব বণিকের যে সময় নির্দেশ করিয়াছেন, তাহা হোসেন শাহের সময়ের একশত বৎসর পূর্ববর্তী।
যাহা হউক, হোসেন শাহের পূর্ব-ইতিহাস অনেকখানি রহস্যাবৃত। কয়েকটি বিবরণে খুব জোর দিয়া বলা হইয়াছে যে তিনি বিদেশ (আরব বা তুর্কিস্তান) হইতে আসিয়াছিলেন, কিন্তু এ সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হওয়া যায় না। কোন কোন মতে হোসেন শাহ বিদেশাগত নহেন, তিনি বাংলা দেশেই জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। ফ্রান্সিস বুকাননের মতে হোসেন রংপুরের বোদা বিভাগের দেবনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। হোসেন শাহের মাতা যে হিন্দু ছিলেন, এইরূপ কিংবদন্তীও প্রচলিত আছে। বাবর তাঁহার আত্মজীবনীতে হোসেন শাহের পুত্র নসরৎ শাহকে “নরসৎ শাহ বঙ্গালী’ বলিয়াই উল্লেখ করিয়াছেন। কৃষ্ণদাস কবিরাজের ‘‘চৈতন্যচরিতামৃত এবং কবীন্দ্র পরমেশ্বরের মহাভারতে ইঙ্গিত করা হইয়াছে যে, হোসেন শাহের দেহ কৃষ্ণবর্ণ ছিল। এই সমস্ত বিষয় হইতে মনে হয়, হোসেন শাহ বিদেশী ছিলেন না, তিনি বাঙালীই ছিলেন; যে সমস্ত সৈয়দ-বংশ বাংলা দেশে বহু পুরুষ ধরিয়া বাস করিয়া আসিতেছিল, সেইরূপ একটি বংশেই তিনি জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন।
