মন্দিরটি চতুষ্কোণ। ইহার চতুর্দিকে চারি ফুট প্রশস্ত ইটের প্রাচীরের দুই দিকই নীলোপল’ (Basalt) প্রস্তরফলক দ্বারা আবৃত ছিল। মন্দিরের অভ্যন্তর ভাগ ইটের দেওয়াল দিয়া নয়টি ক্ষুদ্র কক্ষে বিভক্ত। কেন্দ্রের কক্ষটি দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে ১১ ফুট। ইহার চারিকোণে চারিটি বর্গাকৃতি ও চারিপার্শ্বে দীর্ঘাকৃতি চারিটি কক্ষ। উত্তর-পূর্ব কোণে এখনও একটি শিবলিঙ্গ আছে–সুতরাং মধ্যের কক্ষে বিষ্ণু ও অন্য চারিটি কোণের কক্ষে পূর্ব্বোক্ত দেবদেবীর মূর্ত্তি ও শিবলিঙ্গ ছিল ইহা সহজেই অনুমান করা যায়। এই মন্দিরটি প্রাচীন পঞ্চায়তন মন্দিরের একটি অপূর্ব নিদর্শন। কিন্তু মন্দিরের উপরিভাগ সম্পূর্ণ ধ্বংস হওয়াতে ইহা কোন শ্রেণীর মন্দির তাহা নির্ণয় করা দুঃসাধ্য। [এই মন্দিরের বিস্তৃত বিবরণের জন্য নিম্নলিখিত গ্রন্থ দ্রষ্টব্য : Epigraphia Indica, Vol. XXXV. Pp. 179-84]
মল্লভূমের বহিরেও কুটির-দেউলের পূর্ব্বোক্ত সকল শ্রেণীর নিদর্শনই পাওয়া যায়।
চন্দননগরের নন্দদুলালের মন্দির প্রথম শ্রেণীর অর্থাৎ দোচালা মন্দিরের একটি উৎকৃষ্ট নিদর্শন।
দ্বিতীয় শ্রেণী অর্থাৎ জোড়-বাংলা মন্দিরের বহু নিদর্শন আছে। তন্মধ্যে নিম্নলিখিত কয়েকটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য :
১। হুগলি জিলার গুপ্তিপাড়ায় চৈতন্যের মন্দির [Journal of the Asiatic Society of Bengal, 1909, p. 160. Fig 9]–ইহার প্রতি দোচালার উপর একটি লোহার শিকের চূড়া, সম্ভবত ১৭শ শতাব্দে নির্মিত।
২। মুর্শিদাবাদের সন্নিকটে ভাগীরথীর পশ্চিম তীরে বড়নগর নামক স্থানে। রাণী ভবানী (১৮শ শতাব্দে) বহু মন্দির নির্মাণ করিয়াছিলেন। ইহার মধ্যে একটি পুষ্করিণীর চারিপাশে চারিটি ইষ্টকনির্মিত জোড়-বাংলা আছে। অর্ধভগ্ন বিশাল ভবানীশ্বর মন্দিরই এখানকার বহুসংখ্যক মন্দিরের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বৃহৎ।
৩। মহানাদে একটি জীর্ণ জোড়-বাংলা মন্দির আছে।
হুসেন শাহের সময়কার (ষোড়শ শতাব্দী) একটি জোড়-বাংলা মন্দির নাটোরের ৩৬ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে ভবানীপুর গ্রামে ছিল, কিন্তু ১৮৮৫ খ্রীষ্টাব্দে ভূমিকম্পে ইহা ধ্বংস হয়। রাজা সীতারাম রায় নির্মিত মামুদাবাদের বলরাম মন্দিরেরও এখন কোন চিহ্ন নাই।
হুগলি জিলায় আরামবাগ হইতে পাঁচ মাইল দূরে বালী দেওয়ানগঞ্জ গ্রামে একটি জোড়-বাংলার উপরে একটি নবরত্ন মন্দির স্থাপিত হইয়াছে।
বর্ধমান জিলার গারুই গ্রামে প্রস্তরনির্মিত একটি চৌচালা মন্দির আছে [Ib. d, 153, Fig. 1]। অষ্টাদশ শতাব্দের শেষে নির্মিত হুগলি জিলার গুপ্তিপাড়ায় চৌচালা রামচন্দ্র মন্দিরের শীর্ষদেশের শিখর একটি অষ্টকোণ বাঁকানো কার্নিসযুক্ত ছাদওয়ালা সৌধের অনুকৃতি। হুগলি জিলার বাঁশবেড়িয়া গ্রামে ১৬৭৯ খ্রীষ্টাব্দে নির্মিত বিষ্ণুমন্দির [দীনেশচন্দ্র সেন, বৃহৎ বঙ্গ, দ্বিতীয় খণ্ড ৬৬০ (খ) পৃষ্ঠা] এই শ্রেণীর মন্দিরের অন্যতম নিদর্শন।
চতুর্থ শ্রেণী অর্থাৎ ডবল চৌচালা মন্দির বাংলায় সর্বত্র ও বহু সংখ্যায় দেখিতে পাওয়া যায় এবং বর্তমান কালে ইহাই হিন্দুমন্দিরের আদর্শরূপে গৃহীত হইয়াছে। প্রায় তিন শত বৎসরের পুরাতন কালীঘাটের কালীমন্দির ইহার সুপরিচিত দৃষ্টান্ত। নদীয়া জিলার শান্তিপুর গ্রামে ১৬২৬-২৭ খ্রীষ্টাব্দে নির্মিত শ্যামচাঁদের মন্দির সম্ভবত এই শ্রেণীর মন্দিরের মধ্যে বৃহত্তম [J.A.S. B 1909, p. 159, Fig. 8]। অন্যান্য মন্দিরের মধ্যে নিম্নলিখিত কয়টি উল্লেখযোগ্য :
১। আমতার (হাওড়া) মেলাইচণ্ডীর মন্দির (১৬৪৯-৫০ খ্রীষ্টাব্দে)।
২। চন্দ্রকোণার (ঘাটাল, মেদিনীপুর) লালজী মন্দির (১৬৫৫-৫৬ খ্রীষ্টাব্দ)।
৩-৮। শান্তিপুরের গোকুলচাঁদ, গুপ্তিপাড়ার বৃন্দাবনচন্দ্র এবং কৃষ্ণচন্দ্র, কালনার বৈদ্যনাথ এবং তারকেশ্বর ও উত্তরপাড়ার শিবমন্দির।
এই শ্রেণীর মন্দিরে সাধারণত কোন ভাস্কর্যের নিদর্শন থাকে না। অষ্টাদশ শতাব্দে অনেকগুলি ছোট ছোট মন্দির একসঙ্গে সারি সারি নির্মাণ করার প্রথা দেখা যায়। বাক্সার দ্বাদশ মন্দির ও বর্ধমান জিলার নবাবহাটলিঙ্গে আমবাগানের চতুর্দিকে একটি কেন্দ্রীয় মন্দিরকে বেষ্টন করিয়া নির্মিত ১০৮টি মন্দির ইহার উৎকৃষ্ট নিদর্শন। বলাবাহুল্য, সংখ্যাধিক্যহেতু এই সকল মন্দিরে কোনরূপ বিশেষত্ব থাকে না।
রত্নমন্দির-শৈলীটি মল্লভূমে খুব বেশি প্রচলিত ছিল না। ভাগীরথীর তীরবর্তী প্রদেশে ইহা খুব বেশি সংখ্যায় দেখা যায়। তবে মল্ল রাজবংশের পতনের পর বর্ধমান রাজ্যের সমৃদ্ধির দিনে বহুচূড় ভাস্কর্যে অলঙ্কৃত রত্নমন্দির-শৈলী প্রবর্তিত হয়।
হুগলি জিলার সোমড়া-সুখড়িয়া গ্রামের পঁচিশ চূড়াবিশিষ্ট আনন্দ-ভৈরবীর মন্দির রত্নমন্দিরের একটি উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। এই ত্রিতল মন্দিরের প্রথম তলে প্রতি কোণে তিনটি, দ্বিতীয় তলের প্রতি কোণে দুইটি, তৃতীয় তলের প্রতি কোণে একটি এবং সর্বোপরি কেন্দ্রীয় শিখরটি লইয়া মোট ২৫টি শিখর সন্নিবিষ্ট হইয়াছে। বর্ধমান জিলার কালনা গ্রামে পঁচিশ রত্ন লালাজীর মন্দির [J.A.S.B 1909, p. 153. Fig.7] ও কৃষ্ণচন্দ্র মন্দির মধ্যযুগের অনতিকাল পরেই ১৭৬৪ খ্রীষ্টাব্দে নির্মিত হয়।
মেদিনীপুর জিলার অন্তর্গত চন্দ্রকোণায় রঘুনাথপুরে বুড়া শিবের মন্দিরটি সতের রত্ন, কিন্তু ইহার নির্মাণকার সঠিক জানা যায় না।
