ষোড়শ শতাব্দীতে মহারাজ প্রতাপাদিত্যের পিতা কর্ত্তৃক নির্মিত নবরত্ব মন্দিরের ভগ্নাবশেষ খুলনা জিলার সাতক্ষীরার নিকট দামরাইল গ্রামে এখনও দেখিতে পাওয়া যায়।
দিনাজপুর হইতে ১২ মাইল দূরে অবস্থিত ১৭০৪-২২ খ্রীষ্টাব্দে নির্মিত কান্ত নগরের বিচিত্র কারুকার্যখচিত নবরত্ন মন্দির দেশীয় ও বিদেশীয় লেখকগণের প্রশংসা অর্জন করিয়াছে। ইটের এই মন্দিরটির গাত্রে পোড়ামাটির ফলকে যে সকল মূর্ত্তি ও দৃশ্য খোদিত আছে তাহাতে অষ্টাদশ শতাব্দীর গোড়ায় বাঙালীর জীবনযাত্রা, পোশাক-পরিচ্ছদ ও আচার-ব্যবহার প্রতিফলিত হইয়াছে। শিল্পের দিক হইতে প্রাচীন হিন্দুযুগের শিল্প অপেক্ষা নিকৃষ্ট হইলেও ইহার কঠোর শ্রমসাধ্যবহুল জীবন্ত আলেখ্য বিশেষ প্রশংসনীয় [James Fergusson, History of Indian and Eastern Architecture Vol. II. p. 161.]। ফার্গুসনের এই মন্তব্য এ যুগের আরও কয়েকটি মন্দির সম্বন্ধেও প্রযোজ্য। পঞ্চরত্ন মন্দিরের অনেক নিদর্শন আছে–যথা, চন্দ্রকোণায় ১৬৫৫-৫৬ খ্রীষ্টাব্দে নির্মিত রামেশ্বরের মন্দির, বিক্রমপুরের অন্তর্গত জপসায় লালা রামপ্রসাদ রায় কর্ত্তৃক অষ্টাদশ শতাব্দের প্রথম পাদে নির্মিত মন্দির, প্রায় সমসাময়িক রাজা সীতারাম রায়ের (অধুনা ভগ্ন) কৃষ্ণমন্দির (১৭০৩-০৪ খ্রীষ্টাব্দ) এবং বর্ধমান জিলার অন্তর্গত খাটনগরের লক্ষ্মীনারায়ণের মন্দির। ইহার নিকটেই খর্বাকৃতি শিখরযুক্ত মন্দিরে একটি লিঙ্গ প্রতিষ্ঠিত আছে। প্রস্তরফলকে উত্তীর্ণ লিপি হইতে জানা যায় যে ইহা ১১৬১ বঙ্গাব্দে (১৭৫৪ খ্র.) নির্মিত হইয়াছিল। লক্ষ্মীনারায়ণের পঞ্চরত্ন মন্দিরটিও সম্ভবতঃ ঐ সময়ে নির্মিত। ইহার স্তম্ভ ও অন্যান্য কারুকার্য উচ্চশ্রেণীর শিল্পের নিদর্শন। [Report of the Regional Records Survey Committee for West Bengal, (1952-3), pp 35-6.]
সাধারণ নিয়মের বহির্ভূত দুইটি মন্দিরের উল্লেখ করিয়া এই প্রসঙ্গের উপসংহার করিব-মুর্শিদাবাদ জিলায় বড়নগরে রাণী ভবানীকৃত শিখরযুক্ত অষ্টকোণ মন্দির এবং চারিটি দোচালা মন্দিরের সমবায়ে গঠিত মন্দির।
চিত্র বিদ্যা
মধ্যযুগের অনেক পুঁথিতে এবং কাঠের তাহাদের মলাটে ছবি আছে। ইহাদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য :
১। কালচক্ৰতন্ত্র (১৪৪৩ খ্রী.)।
২। ‘হরিবংশ (১৪৭৯ খ্রী)। বর্তমানে এসিয়াটিক সোসাইটীতে রক্ষিত।
৩। ভাটপাড়ায় প্রাপ্ত ভাগবত পুঁথি (১৬৮৯ খ্র.)
দীনেশচন্দ্র সেন মন্দিরগাত্র, পুঁথি, পুঁথির মলাটে রঞ্জিত চিত্রপট প্রভৃতি হইতে বহু বৈষ্ণব চিত্রের প্রতিকৃতি দিয়াছেন (বৃহৎ বঙ্গ, ৪৩৮ ও ৪৩৯ এবং ৬৯৬ ও ৬৯৭ পৃষ্ঠার মধ্যে)। তিনি এগুলিকে সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীর বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। এই ছবিগুলি খুব উন্নত শিল্পের পরিচায়ক নহে। অনেকটা পটের ছবির মত। তবে লোকসংগীতের মত এই সমুদয় লোকশিল্পের ঐতিহাসিক মূল্য আছে।
১৭. কোচবিহার ও ত্রিপুরা
পরিশিষ্ট – কোচবিহার ও ত্রিপুরা
১
উপক্রমণিকা
বহু প্রাচীনকাল হইতেই বঙ্গদেশের উত্তর ও পূর্ব প্রান্তে বিভিন্ন মোঙ্গল জাতীয় লোক বাস করিত। তাহাদের মধ্যে অনেকে ক্রমে ক্রমে হিন্দুধর্ম ও বাংলাভাষা গ্রহণ করে। মধ্যযুগে ইহারা যে সমুদয় স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করিয়াছিল তাহাদের মধ্যে কোচবিহার ও ত্রিপুরাই সর্বপ্রধান এবং ইহাদের কতকটা নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক বিবরণ পাওয়া যায়। বাংলা দেশের সহিত প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিক সম্বন্ধ খুব বেশি না থাকিলেও মধ্যযুগের বাংলার ইতিহাসে কোচবিহার ও ত্রিপুরার একটি বিশিষ্ট স্থান আছে। কারণ, প্রায় সমগ্র বঙ্গদেশে মুসলমানদের প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত হইলেও কোচবিহার ও ত্রিপুরা যথাক্রমে বঙ্গদেশের উত্তর ও পূর্ব অঞ্চলের বিস্তীর্ণ ভূভাগে বহুদিন পর্যন্ত স্বাধীন হিন্দুরাজ্যরূপে বিরাজ করিত এবং শক্তিশালী মুসলমান রাজাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়া স্বাধীনতা বজায় রাখিতে সমর্থ হইয়াছিল। এই দুই রাজ্যেই ফার্সীর পরিবর্তে বাংলা ভাষাতেই রাজকার্য নির্বাহ হইত। এই দুই রাজ্যের হিন্দুধর্ম ও বাংলা-সাহিত্য সম্বন্ধে বিস্তৃত আলোচনা এই গ্রন্থে সম্ভবপর নহে। সংক্ষেপে বলা যাইতে পারে যে মধ্যযুগে বাংলা দেশে শৈব, শাক্ত, বৈষ্ণব প্রভৃতি যে সমুদয় ধর্মমত ও পূজাপদ্ধতি দেখা যায় তাহা মোটামুটিভাবে এই দুই রাজ্যেই প্রচলিত ছিল। প্রধানত রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় দুই রাজ্যেই বাংলা সাহিত্যের খুব উন্নতি হইয়াছিল। এই বাংলা সাহিত্যের অধিকাংশই সংস্কৃত, রামায়ণ, মহাভারত এবং পুরাণাদি অনুবাদ অথবা তদবলম্বনে রচিত। ইহাদের মধ্যে ঐতিহাসিক আখ্যানও আছে। এ বিষয়ে ত্রিপুরা রাজ্য কোচবিহার অপেক্ষা অধিকতর অগ্রসর ছিল। ত্রিপুরার ‘রাজমালার ন্যায় ধারাবাহিক ঐতিহাসিক কাহিনী এবং চম্পকবিজয়ের ন্যায় ঐতিহাসিক আখ্যানমূলক কাব্য কোচবিহারে নাই। তবে রাজবংশাবলী আছে। কিন্তু এই এক বিষয়ে কোচবিহারের সাহিত্য নূন হইলেও ধর্মগ্রন্থের অনুবাদ এই সাহিত্যে অনেক বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়। ত্রিপুরায় রামায়ণ মহাভারতের অনুবাদ নাই, কোচবিহারে আছে। পুরাণাদি অনুবাদও সংখ্যার দিক দিয়া কোচবিহারেই বেশি। লোকের মনে ধর্মভাব জাগ্রত করাই ছিল এই সকল অনুবাদের উদ্দেশ্য। মৌলিক সাহিত্যসৃষ্টি এই দুই রাজ্যের কোনটিতেই বেশি নাই। এই দুই রাজ্যেই সংস্কৃত সাহিত্যেরও অনুশীলন হইত। অনেকে মত প্রকাশ করিয়াছেন যে বাংলার মুসলমান সুলতান ও ওমরাহের উৎসাহেই বাংলা সাহিত্য প্রতিষ্ঠা লাভ করিতে সমর্থ হইয়াছে। এ সম্বন্ধে (এই গ্রন্থের ‘ধর্ম ও সমাজ’ পরিচ্ছেদে) আলোচনা করা হইয়াছে। কোচবিহার ও ত্রিপুরার রাজগণের অনুগ্রহে ও পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা সাহিত্যের কি উন্নতি হইয়াছিল তাঁহার বিবরণ জানিলে উল্লিখিত মতবাদের নিরপেক্ষ বস্তুতান্ত্রিক আলোচনা করা সম্ভবপর হইবে।
