লালবাধের তীরবর্তী কালাচাঁদ মন্দিরে চারিটি দেওয়ালেই প্রবেশ–তোরণ এবং পূর্ব্বোক্ত মন্দিরের ন্যায় সাতটি পগ ও শিখর আছে। ১৭৫৮ খ্রীষ্টাব্দে নির্মিত রাধাশ্যাম মন্দিরটি মধ্যযুগের প্রায় শেষ নিদর্শন। মাকড়া পাথরের “এত নিপুণ ও এত অধিকসংখ্যক প্রস্তর-অলংকরণ বাঁকুড়া জেলার আর কোন মন্দিরে আছে কিনা। সন্দেহ।” রাধাবিনোদ মন্দির এই শ্রেণীর ইটের মন্দিরের মধ্যে প্রাচীনতম। ইষ্টকনির্মিত মদনমোহনের মন্দিরের স্থাপত্য ও ভাস্কর্য খুবই উচ্চ স্তরের। ভিত্তিবেদীর প্রত্যেক দিকের দৈর্ঘ্য ৫২ ফুট ও মন্দিরের সম্মুখভাগের প্রস্থ ৪০ ফুট; সুতরাং লালজীর মন্দির অপেক্ষা কিছু ছোট। বিষ্ণুপুরের আরও কয়েকটি এই শ্রেণীর মন্দির ভাস্কর্য-মণ্ডিত।
মল্লভূমের অন্যান্য অংশেও কয়েকটি এই শ্রেণীর মন্দির আছে। ইহাদের মধ্যে পাত্রসায়েরের প্রসিদ্ধ শিবমন্দির ও সাহারজোড়া গ্রামের নন্দদুলালের মন্দিরের শীর্ষে রেখ-দেউল-আকৃতির চূড়া আছে। ইহা হইতে কেহ কেহ মনে করেন যে এগুলি পূর্বে রেখ-দেউল ছিল, চৌচালাটি পরে সংযোজিত হইয়াছে। পুরুলিয়া জিলায় একাধিক চৌচালা মন্দির আছে।
মল্লভূমে অল্পসংখ্যক এবং বিশেষত্ববর্জিত কয়েকটি মাত্র ডবল চৌচালা শ্রেণীর মন্দির আছে। ১৬৭৬ খ্রীষ্টাব্দে নির্মিত সারাকোনের রামকৃষ্ণমন্দিরটি সম্বন্ধে বহু কিংবদন্তী প্রচলিত আছে। পাচালের এই শ্রেণীর শিবমন্দিরটি অতিশয় বিখ্যাত। রত্নমন্দিরের সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শন বিষ্ণুপুরের শ্যামরায়ের পঞ্চরত্নমন্দির। এই মন্দিরটিও শ্রীরাধাকৃষ্ণের আনন্দের জন্য রাজা শ্রীরঘুনাথ সিংহ ১৬৪৩ খ্রষ্টাব্দে জোড়–বাংলা মন্দিরের বারো বৎসর পূর্বে প্রতিষ্ঠা করেন। আকৃতিতে খুব বড় না হইলেও পোড়ামাটির ফলক দ্বারা অলংকরণের অজস্র সমাবেশে ইহা অপূর্ব শোভায় মণ্ডিত হইয়াছে। কেবলমাত্র ঢালু ছাদ ও শিখরগুলি ছাড়া মন্দিরের আর সকল অংশই ভাস্কর্যসজ্জিত। ইহার কেন্দ্রীয় চূড়াটি অষ্টকোণাকৃতি ও প্রান্তবর্তী শিখরগুলির প্রস্থচ্ছেদ চতুষ্কোণ। ইহার আর একটি বৈশিষ্ট্য, ভিত্তিবেদীর অত্যধিক উচ্চতা। এই মন্দিরটি মধ্যযুগের বাংলার হিন্দুশিল্পের একটি অমূল্য সম্পদ। প্রাচীনত্বে এই মন্দিরটি বিষ্ণুপুরে দ্বিতীয়। মাকড়া পাথরে নির্মিত এবং মদনগোপালের নামে ১৬৬৫ খ্রীষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত বিষ্ণুপুরের পঞ্চরত্ন মন্দিরটি আয়তনে মল্লভূমের মন্দিরগুলির মধ্যে সর্বাপেক্ষা বৃহত্তম। সলদা গ্রামের মাকড়া পাথরে নির্মিত গোকুলচাঁদের মন্দির পঞ্চরত্ন দেবালয়ের একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন, কারণ কেহ কেহ মনে করেন যে এইটিই মল্লভূমের সর্বপ্রাচীন দেবালয়।
বিষ্ণুপুরের বসুপল্লীতে নবরত্ন শ্রীধর মন্দির বসু-পরিবারের কোন ব্যক্তি সম্ভবত অষ্টাদশ শতাব্দে নির্মাণ করেন।
১৮৪৫ খ্রীষ্টাব্দে নির্মিত সোনামুখীর পঞ্চবিংশতি-চূড়-মন্দিরটি প্রতিপন্ন করে যে মল্লভূমের স্থাপত্যশিল্প মধ্যযুগের পরেও একেবারে লুপ্ত হয় নাই।
বাঁকুড়া শহরের দুই মাইল দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত এক্তেশ্বরের শিবমন্দির খুবই প্রাচীন, কিন্তু পুনঃ পুনঃ সংস্কারের ফলে ইহার আদিম আকৃতি সম্বন্ধে কোন স্পষ্ট ধারণা করা কঠিন। ১৬২২ খ্রীষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত বিষ্ণুপুরের প্রাচীনতম মল্লেশ্বর মন্দির সম্বন্ধেও একথা খাটে। ইহাদের বর্তমান আকৃতি পরিচিত কোন স্থাপত্যশৈলীর অন্তর্ভুক্ত করা যায় না।
পরম বৈষ্ণব রাজা বীর হাম্বির কর্ত্তৃক প্রতিষ্ঠিত বিষ্ণুপুরের রাসমঞ্চও একটি উল্লেখযোগ্য সৌধ। রাসলীলার সময় বিষ্ণুপুরের যাবতীয় রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহ এই সৌধে একত্র করা হইত। যাহাতে লক্ষ লক্ষ লোক ইহার চতুর্দিকস্থ উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ হইতে উৎসব দেখিতে পারে সেই জন্য চৌচালা ছাদে আবৃত এই সৌধের নিম্নাংশ বহু খিলানযুক্ত তিন প্রস্থ দেয়ালে পরিবেষ্টিত। ভিতরের দিক হইতে এই তিনটি দেয়ালের প্রতিদিকে যথাক্রমে ৫, ৮, ও ১০টি প্রশস্ত খিলান সন্নিবিষ্ট হইয়াছে। শীর্ষদেশের চারিটি ঢালু চান পিরামিডের আকৃতিতে ক্রমহ্রস্বায়মান ধাপে ধাপে উপরে উঠিয়া একটি বিন্দুতে মিলিত হইয়াছে। খিলানগুলির ঠিক উপরে এবং পিরামিডের ঠিক নিম্নপ্রান্তের চারি কোণে চারিটি চারচালা এবং অন্তর্বর্তী স্থানে তিন দিকে চারিটি করিয়া দোচালা নির্মিত হইয়াছিল। এগুলি অলঙ্কারমাত্র, কোন স্থাপত্য প্রয়োজনে গঠিত নহে।
বিষ্ণুপুরের আর দুইটি উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য নিদর্শন-ইষ্টকনির্মিত রথ এবং দুর্গ-তোরণ।
মল্লভূমের বাহিরে মন্দির
মল্লভূমের বাহিরে যে সমুদয় মন্দির আছে তাঁহার মধ্যে মালদহ জিলার হরিশ্চন্দ্রপুর থানার দশ মাইল উত্তরে অবস্থিত ওয়ারি গ্রামে যে একটি প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ আছে দুইটি কারণে তাহা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রথমতঃ, মন্দিরসংলগ্ন প্রস্তরফলকে উৎকীর্ণ লিপি হইতে জানা যায় যে এই প্রস্তরনির্মিত মন্দিরটি ১৪৬৭ শকাব্দে (১৫৪৫-৪৬ খ্রীষ্টাব্দে) নির্মিত হইয়াছিল। মধ্যযুগে সঠিক তারিখযুক্ত এরূপ প্রাচীন হিন্দু মন্দিরের নিদর্শন বিরল। দ্বিতীয়তঃ উপরিভাগ সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত হইলেও এই মন্দিরের অভ্যন্তর ভাগ এখনও যেটুকু অবশিষ্ট আছে–তাঁহার অনুরূপ আর কোন মন্দির অদ্যাবধি আবিষ্কৃত হয় নাই। উত্তীর্ণ লিপি হইতে জানা যায় যে এই মন্দিরে বিষ্ণু, সূর্য, গণেশ, পার্ব্বতী এবং বিশ্বনাথের মূর্ত্তি যথাক্রমে মধ্যস্থলে এবং অগ্নি, নৈঋত, বায়ু ও ঈশান কোণে অবস্থিত ছিল।
