কুটির-দেউলগুলির যে সমুদয় নিদর্শন এখনও বর্তমান আছে তাহা ষোড়শ শতকের পরবর্তী। এই শতকে এবং তাঁহার পূর্বেই বাংলায় মুসলমান স্থাপত্যরীতি অনুযায়ী বহু সৌধ নির্মিত হইয়াছিল; সুতরাং ইহার কিছু প্রভাব যে কুটির দেউলগুলিতে পরিলক্ষিত হইবে ইহা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু ইহার প্রাচীনতর দৃষ্টান্ত না থাকায় এই প্রভাব কিরূপে কতদূর বিস্তৃত হইয়াছে তাহা বলা শক্ত। কেহ কেহ মনে করেন যে প্রবেশ-পথের পত্রযুক্ত খিলান ও হ্রস্বাকৃতি স্থূল স্তম্ভগুলি, পোড়ামাটি-ফলকের অলঙ্কৃতি এবং কার্নিসের কোণার শিখরগুলি নিঃসন্দেহে মুসলমান শিল্পের প্রভাব সূচিত করে। কিন্তু প্রথম দুইটি সম্বন্ধে এই মত গ্রহণযোগ্য হইলেও অপর দুইটি সম্বন্ধে সন্দেহের যথেষ্ট অবসর আছে। পোড়ামাটির উৎকীর্ণ ফলক এদেশে মুসলমানদের আগমনের পূর্ব হইতেই প্রচলিত। শিখরের সম্ভাব্য উৎপত্তি সম্বন্ধে পূর্বেই আলোচনা করিয়াছি।
মল্লভূমির মন্দির
মধ্যযুগের যে কয়টি উৎকৃষ্ট মন্দির এখনও অভগ্ন আছে তাঁহার অনেকগুলিই মল্লভূমে অবস্থিত। ইহা একটি আকস্মিক ঘটনা নহে–এই অঞ্চলে হিন্দু মল্লরাজারা কার্যত স্বাধীনভাবে রাজত্ব করিতেন এবং মুসলমান রাজশক্তি কখনও এই অঞ্চলে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। এই কারণেই হিন্দুরা মন্দির গড়িয়াছে এবং তাহা রক্ষাও পাইয়াছে। খরস্রোতা দামোদর নদী ও অতি বিস্তৃত শাল গাছের নিবিড় অরণ্য এই ক্ষুদ্র হিন্দুরাজ্যটিকে মুসলমান সম্রাটদের কবল হইতে রক্ষা করিয়াছে। এই অঞ্চলের অধিবাসী সাহসী আদিম বন্যজাতি ও বীর মল্লরাজাদেরও এ বিষয়ে কৃতিত্ব অস্বীকার করা যায় না। মোটের উপর মাঝে মাঝে দিল্লির বাদশাহ ও বাংলার সুলতানদের অধীন নামেমাত্র স্বীকার করিলেও আভ্যন্তরিক শাসনকার্যে যে মল্লভূমের হিন্দু রাজারা স্বাধীন ছিলেন সে বিষয়ে সন্দেহ করিবার কোন কারণ নাই। বাংলা দেশের এই কোণে স্বাধীন হিন্দু রাজত্ব ছিল বলিয়াই মল্লভূমিতে (বাঁকুড়া জেলা ও পার্শ্ববর্তী স্থানে), বিশেষত মল্লরাজাদের রাজধানী বিষ্ণুপুরে, এই যুগের অর্থাৎ সপ্তদশ এবং অষ্টাদশ শতাব্দের বহু হিন্দু মন্দির এখনও টিকিয়া আছে। ইহাদের মধ্যে অনেকগুলি মন্দিরের গাত্রে উত্তীর্ণ প্রতিষ্ঠা-ফলক হইতে মন্দিরনির্মাণের তারিখও জানা যায় (১৬২২ হইতে ১৭৫৪ খ্রীষ্টাব্দ); সুতরাং মল্লভূমের মন্দিরগুলির সংক্ষিপ্ত বর্ণনাই প্রথমে দিব।
পুরুলিয়া জিলার বান্দাগ্রামের মন্দিরের কথা পূর্বেই বলা হইয়াছে। বাঁকুড়া জিলার ঘটগেড়িয়া ও হাড়মাসড়া গ্রামে দুইটি প্রস্তর-নির্মিত রেখ–দেউল আছে। ইহার কোনটিই ৪০ ফুটের বেশি উচ্চ নহে এবং মূল মন্দিরটি ছাড়া উড়িষ্যার রেখ-দেউলের ন্যায় জগমোহন, প্রশস্ত অঙ্গন ও প্রাকার প্রভৃতি কিছুই নাই। এই দুইটি মন্দিরই সম্ভবত সপ্তদশ শতাব্দে নির্মিত। ধরাপাট গ্রামের প্রস্তরনির্মিত রেখ দেউলটি সম্ভবত ১৭০৪ খ্রীষ্টাব্দে নির্মিত। ইহারও পরবর্তীকালে নির্মিত দুইটি রেখ-দেউল বিষ্ণুপুরে আছে। মন্দিরগুলি কোনপ্রকার বৈশিষ্ট্যবর্জিত।
পুরুলিয়া জিলায় একাধিক প্রথম শ্রেণীর কুটির-দেউল আছে, কিন্তু বাঁকুড়ায় একটিও নাই। তবে বিষ্ণুপুরের দুই তিনটি দেবালয়ের ভোগরন্ধনগৃহ ঠিক দোচালা ঘরের মত।
বিষ্ণুপুরের জোড়-বাংলা মন্দিরটি গঠন-সৌকর্যে এবং পোড়ামাটির ভাস্কর্যের উৎকর্ষ ও বাহুল্যে বাংলার মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ মন্দিরসমূহের অন্যতম বলিয়া পরিগণিত হয়। সাধারণ প্রথাগত গঠনরীতি অনুযায়ী হইলেও এই জোড়-বাংলা মন্দিরের কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। ইহার প্রধান প্রবেশপথের খিলানতিনটি পত্রাকৃতি নহে। ইহাতে কেবল দক্ষিণ দিকেই একটিমাত্র ঢাকা বারান্দা আছে। গর্ভগৃহে প্রবেশের জন্য দ্বিতীয় দোচালাটির পূর্ব দেওয়ালে নীচু খিলানের একটি পৃথক দরজা আছে। দোচালা দুইটির সংযোগস্থলে যে চতুষ্কোণ চূড়া-সৌধটি আছে তাহা একটি ভিত্তিবেদীর উপর স্থাপিত এবং এই সৌধের শীর্ষদেশে চৌচালা আকৃতির একটি ছাদ সন্নিবিষ্ট হইয়াছে। এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা-ফলকে লিখিত আছে যে শ্রীরাধিকা ও কৃষ্ণের আনন্দের জন্য রাজা শ্ৰীবীর হাম্বিরের পুত্র রাজা শ্রীরঘুনাথ সিংহ কর্ত্তৃক ইহা ৯৬১ মল্লাব্দে (বাংলা সন ১০৬১, ইংরেজী ১৬৫৫ খ্রীষ্টাব্দে) প্রতিষ্ঠিত হইল। সুতরাং কৃষ্ণলীলাবিষয়ক কাহিনী ভাস্কর্যের প্রধান বিষয়বস্তু হইয়াছে। তাহা ছাড়া রামায়ণ মহাভারতের কাহিনী, পৌরাণিক উপাখ্যান, স্থল ও জলযুদ্ধ এবং নানাবিধ কার্যে ব্যস্ত বহু নরনারী ও পশুপক্ষী প্রভৃতির মূর্ত্তি আছে।
বিষ্ণুপুর শহর ও শহরতলীতে এক শিখরযুক্ত চৌচালা মন্দির বারোটি আছে এবং আরও তিনটি এককালে ছিল। ইহার মধ্যে দুইটি পোড়ামাটির ইটে এবং বাকি কয়টি ল্যাটেরাইট বা মাকড়া পাথরে নির্মিত। ইহাদের মধ্যে লালজীর মন্দিরটি মল্লভূমের এই শ্রেণীর মন্দিরগুলির মধ্যে বৃহত্তম। ভিত্তিবেদীর প্রত্যেক দিকের দৈর্ঘ্য ৫৪ ফুট এবং দক্ষিণমুখী মন্দিরটির সম্মুখভাগ প্রস্থে প্রায় ৪১ ফুট। ইহার পূর্ব, দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে তিনটি করিয়া তোরণযুক্ত প্রবেশপথ ও সংলগ্ন দরদালান আছে। দক্ষিণ দরদালানের দেওয়ালে বহুবর্ণ ফ্রেসকো অঙ্কিত ছিল কেহ কেহ এরূপ অনুমান করিয়াছেন। নীচের খাড়া অংশের চারিদিকে চারিটি খিলানযুক্ত অলিন্দ ও সাতটি করিয়া পগ (লম্ববান উদ্গত অংশ) আছে। উপরের অংশে উচ্চাবচ কার্নিসের সমবায়ে নির্মিত শিখর আছে। ইহাও রাধাকৃষ্ণের মন্দির, ১৬৫৮ খ্রীষ্টাব্দে নির্মিত।
