মন্দিরের সাধারণ প্রকৃতি
বাংলার কুটির-দেউলের শিখর উড়িষ্যার মন্দিরের জগমোহনের ছাদের মত ক্রম হ্রস্বায়মান উপর্যুপরি বিন্যস্ত বহুসংখ্যক সমান্তরাল কার্নিসের বিন্যাস দ্বারা গঠিত। এই কার্নিসের সারির উপর আমলক অথবা (এবং) চূড়া স্থাপিত হইত। কার্নিসগুলির সমান্তরাল রেখার দ্বারা পর্যায়ক্রমে আলোছায়ার সমন্বয়ে অপরূপ সৌন্দর্যসৃষ্টি এই গঠনের বৈশিষ্ট্য। উড়িষ্যার প্রসিদ্ধ কোণারক মন্দিরের জগমোহন এই শ্রেণীর স্থাপত্যের সর্বোৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। সাধারণত মন্দিরের সম্মুখভাগে তিনটি পত্ৰাকৃতি (cusped) খিলানযুক্ত প্রবেশপথ থাকে। মধ্যে দুইটি স্কুল খর্বাকৃতি স্তম্ভ এবং দুই পার্শে প্রাচীরগাত্রে অর্ধপ্রোথিত দুইটি কুড্যস্তম্ভের শীর্ষদেশের উপর এই খিলানগুলির নিম্নভাগ অবস্থিত। এই খিলানের খানিকটা উপরে এক বা একাধিক কার্নিস থাকিত। অনেক স্থলে মন্দিরের এই অংশও বিচিত্র কারুকার্যে শোভিত হইত।
প্রবেশপথের ঠিক পরেই অনেক মন্দিরে একটি ঢাকা বারান্দা থাকিত। কখনও কখনও এই ঢাকা বারান্দা গর্ভগৃহের চারিদিকেই বেষ্টন করিয়া থাকিত। কখনও কখনও এই বারান্দার প্রতি কোণে একটি কক্ষ থাকিত। রত্ন মন্দিরের সম্মুখের বারান্দার কোণের কক্ষ হইতে ছাদে উঠিবার সিঁড়ি থাকিত।
মন্দিরগুলি সাধারণত অঙ্গন হইতে তিন চারি হাত উচ্চ চতুষ্কোণ ভিত্তিবেদীর (platform) উপর স্থাপিত হইত। কোথাও উঠিবার সিঁড়ি আছে (হুগলি জিলার বক্সায় রঘুনাথ মন্দিরে)। মন্দিরের গর্ভগৃহ সাধারণত চতুষ্কোণ এবং অভ্যন্তরভাগ প্রায়ই অলঙ্কারবর্জিত। কিন্তু কোন কোন স্থলে, যেমন গুপ্তিপাড়ার বৃন্দাবনচন্দ্রের মন্দিরে, দেওয়ালগুলি চিত্রিত।
কতকগুলি মন্দির কারুকার্যখচিত টালি বা পোড়ামাটির ফলক (terracotta) দ্বারা অলঙ্কৃত হইয়াছে। কোন কোন মন্দিরে এই শ্রেণীর ভাস্কর্য বিশেষ উত্তৰ্ষ লাভ করিয়াছে এবং বহুল পরিমাণে ব্যবহৃত হইয়াছে। এই ভাস্কর্যগুলির বৈচিত্র্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। লতা পাতা ফুল প্রভৃতি প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং নানারূপ জ্যামিতিক নকসা প্রভৃতির সম্মিলনে অপূর্ব সৌন্দর্যের সৃষ্টি হইয়াছে। এই চিত্রগুলি হইতে সমসাময়িক জীবনযাত্রা, নরনারীর পোশাক-পরিচ্ছদ, অলঙ্কার, যানবাহন, তল্কালীন সামাজিক আচারপদ্ধতি, গৃহপালিত নানা পশুপক্ষী প্রভৃতির পরিচয় পাওয়া যা। তবে সবই শিল্পের প্রথাবদ্ধতার পরিচায়ক। নরনারী, জীবজন্তু প্রভৃতির আকৃতি পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করিলে ইহাকে খুব উচ্চাঙ্গের শিল্প বলা যায় না। অনেকটা বর্তমান কালের সাধারণ পটুয়া, কুমার প্রভৃতি কারিকর সৃষ্ট শিল্পের জ্ঞাতি বলিয়াই মনে হয়, নূতন সৃজনশক্তির বা সূক্ষ্ম সৌন্দর্যানুভূতির কোন পরিচয় পাওয়া যায় না। বস্তুত লোকসাহিত্যের সহিত উচ্চশ্রেণীর সাহিত্যের যে সম্বন্ধ, এই সমুদয় শিল্পের সহিত গুপ্ত পাল ও সেনযুগের বাংলাশিল্পের সেই সম্বন্ধ। তবে স্মরণ রাখিতে হইবে যে মধ্যযুগে, ভারতের অন্যান্য প্রদেশের শিল্প সম্বন্ধেও ঠিক এই মন্তব্য প্রযোজ্য।
বাংলার কুটির-দেউলের স্থাপত্যপদ্ধতি বাংলার বাহিরেও প্রচলিত হইয়াছিল। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর মন্দির উড়িষ্যায় গৌড়ীয় বা বাংলারীতি নামে প্রচলিত। এই দুই শ্রেণীর মন্দির সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দে দিল্লি, রাজপুতনা ও পঞ্জাবেও প্রভাব বিস্তার করিয়াছিল। অন্যান্য শ্রেণীর মন্দিরগুলি বাংলার বাহিরে তেমন আদৃত হয় নাই।
বাংলার কুটির-দেউলগুলির শিল্পরীতি যে বাংলা দেশের নিজস্ব সম্পদ সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। বাংলায় মুসলমান স্থপতিও যে এই শ্রেণীর সৌধ নির্মাণ করিয়াছে তাহা পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে। কিন্তু ইহা তাহাদের সাধারণ স্থাপত্যরীতির ব্যতিক্রম। নিছক অভিনবত্বের জন্যই কদাচিৎ বাংলার মুসলমানেরা এবং বাংলার বাহিরের শিল্পীরা এই রীতির অনুসরণ করিয়াছে এইরূপ সিদ্ধান্তই যুক্তিসঙ্গত বলিয়া মনে হয়। সম্ভত বাংলায় দোচালা ও চৌচালা খড়ের ঘরই প্রথমে দেবালয়রূপে ব্যবহৃত হইত, যেমন এখনও হয়। পরে যখন ইষ্টক বা প্রস্তর উপকরণস্বরূপ ব্যবহৃত হইল তখনও দেবালয়নির্মাণের পূর্বরীতিই বহাল রহিল।
রত্নমন্দির বা বহু শিখরযুক্ত কুটির-দেউল বাংলার বাহিরে বড় একটা দেখা যায় না। উড়িষ্যার মন্দিরের জগমোহনের সহিত ইহার সাদৃশ্য পূর্বে উল্লিখিত হইয়াছে। কিন্তু এই গ্রন্থের প্রথম ভাগে বাংলার দ্ৰ দেউলের যে বর্ণনা আছে তাহা হইতেই যে কালক্রমে এই শ্রেণীর শিখর ও বহু শিখরযুক্ত রত্নমন্দিরের উদ্ভব হইয়াছে এরূপ অনুমান অসঙ্গত নহে। অরপচনের মন্দিরের [A.K. Coomaraswamy, History of Indian and Indonesian Art PL. LXXI. Fig. 29] যে অংশ বৌদ্ধ গ্রন্থের পুঁথিতে চিত্রিত হইয়াছে তাহা হইতে বেশ বুঝা যায় ইহার ছাদ কয়েকটি ক্রমহ্রস্বায়মান স্তরে গঠিত; প্রতি স্তরের কোণে কোণে একটি শিখর এবং সর্বোপরি একটি বৃহত্তর শিখর। এই কয়টি বৈশিষ্ট্যই বাংলার রত্নমন্দিরে দেখা যায়। সুতরাং অসম্ভব নয় যে বাংলার রত্নমন্দির প্রাচীন শিখরযুক্ত ভদ্র-দেউলেরই শেষ বিবর্তন। তবে মাঝখানে পাঁচ ছয় শত বৎসরের মধ্যে এরূপ কোন মন্দিরের নিদর্শন না থাকায় এ সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত কিছু বলা যায় না।
