মধ্যযুগে বাংলা দেশের মন্দিরও মুসলমান মসজিদ ও সমাধি-ভবনের ন্যায় প্রধানত ইষ্টকনির্মিত। তবে বাংলার পশ্চিম প্রান্তে মাকড়া (laterite) ও বেলে পাথর (sandstone) পাওয়া যায়। সুতরাং এই দুই প্রকারের পাথরে নির্মিত মন্দিরও আছে।
বাংলা দেশের মধ্যযুগের মন্দিরগুলি দুইটি বিভিন্ন স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত। এই দুইটিকে রেখ-দেউল ও কুটির-দেউল এই দুই সংজ্ঞা দেওয়া যাইতে পারে।
(খ) রেখ-দেউল
রেখ-দেউলের বিবরণ এই গ্রন্থের প্রথম ভাগে দেওয়া হইয়াছে। উড়িষ্যার সুপরিচিত মন্দিরগুলির ন্যায় সুউচ্চ বাঁকানো শিখরই ইহার বৈশিষ্ট্য। প্রাচীন হিন্দুযুগের যে কয়টি মন্দির এখনও টিকিয়া আছে তাঁহার প্রায় সবগুলিই এই শ্রেণীর এবং প্রথম ভাগে তাহাদের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হইয়াছে। কালক্রমে উড়িষ্যার রেখ-দেউল ক্ষুদ্রতর ও অলঙ্কারবর্জিত হইয়া অনেকটা সরল ও আড়ম্বরহীন স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত হইত। ময়ূরভঞ্জের অন্তর্গত খিচিং-য়ের মন্দিরগুলি ইহার দৃষ্টান্তস্থল। বাংলা দেশের মধ্যযুগের রেখ-দেউলেও এই পরিবর্তন অর্থাৎ প্রাচীন অলঙ্কত রেখ দেউলের সরলীকরণ ঘটিয়াছে। হিন্দুযুগের নির্মিত বহুলাড়ার সিদ্ধেশ্বর মন্দিরের সহিত মধ্যযুগের ধরাপাট অথবা হাড়মাসড়ার মন্দির তুলনা করিলেই এই পরিবর্তন বুঝা যাইবে। পূর্ব্বোক্ত মন্দিরের বিচিত্র কারুকার্য শেষোক্ত মন্দিরে নাই, কিন্তু উভয়ই যে একই স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত তাহা সহজেই বুঝা যায়।
পুরুলিয়া জিলার অন্তর্গত চেলিয়ামা নামক বর্ধিষ্ণু গ্রামের নিকটবর্তী বান্দা গ্রামে একটি উৎকৃষ্ট বেলে পাথরের রেখ-দেউল আছে। ইহাতে অনেক কারুকার্য আছে। ইহার তারিখ নিশ্চিতরূপে জানা যায় না-সম্ভবত ত্রয়োদশ শতকের কিছু পূর্বে বা পরে ইহা নির্মিত হইয়াছিল। এইটি বাদ দিলে বাংলা দেশে মুসলমান রাজত্বের প্রথম দুই শত বত্সরে নির্মিত কোন হিন্দু-মন্দিরের সন্ধান পাওয়া যায় না। পরবর্তী দুই শত বৎসরের মধ্যে নির্মিত মাত্র ৪/৫ টি মন্দির এখনও আছে। ইহার মধ্যে চারিটি বর্ধমান জিলায়। তিনটি বরাকরের বেগুনিয়া মন্দির, সম্ভবত পঞ্চদশ শতকে, এবং গৌরাঙ্গপুরে ইছাই ঘোষের মন্দির সম্ভবত আরও কিছুকাল পরে নির্মিত। এই সব মন্দির এবং কল্যাণেশ্বরীর মন্দির প্রস্তরনির্মিত রেখ-দেউল। ইহার মধ্যে কেবল বরাকরের একটি মন্দির ১৪৬১ খ্রীষ্টাব্দে নির্মিত হইয়াছিল বলিয়া নিশ্চিতরূপে জানা যায়। অপরগুলি কেহ কেহ হিন্দুযুগের মন্দির বলিয়া মনে করেন। কিন্তু সম্ভবত এইগুলিও পঞ্চদশ শতকে অথবা তাঁহার পরে নির্মিত হইয়াছিল ইহাই অধিকাংশ পণ্ডিতগণের মত। পরবর্তী কালে নির্মিত বাঁকুড়ায় বা মল্লভূমে এই শ্রেণীর যে পাঁচটি মন্দির আছে তাঁহার বিষয় পরে আলোচনা করিব। ১৭৫৪ খ্রীষ্টাব্দে নির্মিত বীরভূম জিলার ভাণ্ডীশ্বরের প্রস্তর-মন্দিরও একটি রেখ দেউল। ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মিত [বিংশ শতাব্দীতে নদীগর্ভে নিমজ্জিত] পদ্মাতীরবর্তী রাজাবাড়ীর মঠও এই স্থাপত্য শিল্পের অন্যতম নিদর্শন বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে। সুতরাং দেখা যাইতেছে যে মধ্যযুগের শেষ পর্যন্ত রেখ-দেউলের প্রচলন ছিল।
(গ) কুটির-দেউল
মধ্যযুগে বাংলার অন্যান্য মন্দিরগুলি যে নূতন স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত তাঁহার বিশেষত্ব এই যে ইহা বাংলাদেশের চিরপরিচিত কুটির বা কুঁড়ে ঘরের–অর্থাৎ দোচালা ও চৌচালা খড়ের ঘরের গঠনপ্রণালী অনুসরণ করিয়া নির্মিত হইয়াছে। সুতরাং ইহাকে কুটির-দেউল এই সংজ্ঞায় অভিহিত করা যায়। এই শ্রেণীর মন্দির ইষ্টক বা প্রস্তরনির্মিত হইলেও চালাগুলির ঊর্ধ্ব মিলনরেখা এবং কার্নিসগুলি অস্বাভাবিকভাবে খড়ের ঘরের মতই বাঁকানো।
এই মন্দিরগুলি নিম্নোক্ত পাঁচ শ্রেণীতে ভাগ করা যাইতে পারে।
প্রথম শ্রেণী–দোচালা
দোচালা খড়ের ঘরের অবিকল অনুকৃতি। কেহ কেহ ইহাকে একবাংলা মন্দির বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। ইহাকে দোচালা বলাই সঙ্গত মনে হয়।
দ্বিতীয় শ্রেণী–জোড় বাংলা
পাশাপাশি দুইটি দোচালা। ইহাকে জোড়দোচালা বা জোড়-বাংলা বলা যাইতে পরে। জোড়-দোচালার পার্শ্ববর্তী সংলগ্ন দুইটি চালার সংযোগরেখার ঠিক মধ্যস্থলে দেয়াল দুইটির উপর একটি শিখর স্থাপন করাই সাধারণ বিধি ছিল।
তৃতীয় শ্রেণী–চৌচালা
চারচালা খড়ের ঘরের মত চারটি দেওয়ালের উপর ত্রিভুজের ন্যায় আকৃতি চারটি সংলগ্ন চালা, ঊর্ধ্বে একটি বক্র সংযোগরেখা বা একটি বিন্দুতে সংযুক্ত। এখানেও খড়ের চালার কার্নিসের ন্যায় প্রতি চালার নিম্নাংশ বাঁকানো। চারিটি চালার ঢাল (slope) অনেকটা কমাইয়া কেন্দ্রস্থলে একটি শিখর স্থাপন করাই সাধারণ বিধি (চিত্র নং ৩০-৩৪)।
চতুর্থ শ্রেণী–ডবল চৌচালা
নীচের চৌচালার উপর অল্পপরিসর বেদী দ্বারা একটু ব্যবধান করিয়া, ক্ষুদ্রতর আকৃতির অনুরূপ আর একটি চৌচালা স্থাপন করাই এই শ্রেণীর বৈশিষ্ট্য। এই দ্বিতল মন্দিরের মাথায় ত্রিশূল এবং (অথবা) এক বা একধিক চূড়া থাকিত–কখনও বা ক্ষুদ্র সৌধাকৃতি অথবা কার্নির্সযুক্ত শিখর থাকিত।
পঞ্চম শ্রেণী–রত্নমন্দির
চৌচালা বা ডবল চৌচালা মন্দিরের মাথায় কেন্দ্রস্থলে একটি বৃহৎ শিখর ব্যতীত প্রতি তলের কার্নিসের প্রতি কোণে এক বা একাধিক ক্ষুদ্রতর শিখর স্থাপন করাই এই শ্রেণীর বিশেষত্ব। মন্দিরের তলের পরিমাণ বাড়াইয়া এবং প্রতি তলের কার্নিসের প্রতি কোণের শিখর সংখ্যা বৃদ্ধি করিয়া মন্দিরের মোট শিখরের সংখ্যা পঁচিশ বা ততোধিক করা যাইতে পারে। শিখরের সংখ্যা অনুসারে এই মন্দিরগুলিকে পঞ্চরত্ন, নবরত্ন, পঁচিশ রত্ন ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়। এই শ্ৰেণীর মন্দিরের সাধারণ নাম রত্ন-মন্দির।
