কক্ষের বিন্যাসপ্রণালী আগ্রা ও দিল্লির সৌধের অনুরূপ। মোটের উপর এই সমাধিসৌধের সৌন্দর্য ও গাম্ভীর্য বাংলা দেশের শিল্পে খুবই অপরিচিত-ইহার গঠনপ্রণালীও বাংলা দেশের গঠনপ্রণালী হইতে স্বতন্ত্র। লোকপ্রবাদ এই যে নবাব শায়েস্তা খাঁ তাঁহার কন্যা পরীবিবির এই সমাধিসৌধ নির্মাণ করেন।
মুঘল যুগের অনেকগুলি তোরণ-কক্ষ কারুকার্যখচিত। গৌড়ের দুর্গের দক্ষিণ দিকের তিনতলা বৃহৎ (৬৫ ফুট) তোরণটি শাহসুজা আনুমানিক ১৬৫৫ খ্রীষ্টাব্দে নির্মাণ করেন। ইহার অল্পকাল পরেই (১৬৭৮-৭৯ খ্ৰীষ্টাব্দে) নির্মিত ঢাকার লালবাগ দুর্গের দক্ষিণ চোরণটি এখনও মোটামুটি ভালভাবেই আছে। মুর্শিদাবাদের খুসবাগে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব আলিবর্দী ও সিরাজউদ্দৌলার কবর তিনটি প্রাচীর দিয়া ঘেরা। ইহার প্রবেশপথে একটি তোরণকক্ষ আছে।
মুঘল যুগের একমাত্র উল্লেখযোগ্য স্তম্ভ নিমাসরাই মিনার। ইহা ঠিক গৌড় ও পাণ্ডুয়ার মধ্যস্থলে অবস্থিত। একটি উচ্চ অষ্টকোণ মঞ্চের উপর এই মিনারটি প্রতিষ্ঠিত। মঞ্চটির প্রতিদিক ১৮ ফুট দীর্ঘ এবং কয়েকটি সিঁড়ি ভাঙ্গিয়া উঠিতে হয়। মঞ্চের ভিতরে ছোট ছোট খিলানযুক্ত কক্ষ আছে; এগুলি সম্ভবত প্রহরীদের বাসস্থান ছিল। মিনারটি গোল এবং ক্রমশঃ ছোট হইয়া উপরে উঠিয়াছে; ইহার পাদদেশের ব্যাস প্রায় ১৯ ফুট। ইহার চূড়া ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। এখন যে অংশ আছে। তাঁহার উচ্চতা ৬০ ফুট। মাঝখানে একটি ছজ্জ অর্থাৎ গোল প্রস্তরখণ্ড চারিদিকে একটু বাড়ান থাকায় মিনারটি দুই ভাগে বিভক্ত। ইহার ঠিক উপরেই আলো বাতাস প্রবেশের জন্য একটি গবাক্ষ ছিদ্র। অভ্যন্তরে একটি ঘোরান সিঁড়ি দিয়া চূড়ায় ওঠার ব্যবস্থা আছে। মিনারের গায়ে গজদন্তের অনুকারী বহু প্রস্তর শলাকাবিদ্ধ করা আছে–প্রত্যেকটি প্রায় আড়াই ফুট লম্বা। ইহা সম্ভবত পর্যবেক্ষণ স্তম্ভের কাজ করিত অর্থাৎ কোন বিপদ বা শত্রুর আক্রমণ আসন্ন হইলে ইহার চূড়ায় উঠিয়া আগুন জ্বালাইয়া সঙ্কেত করা হইত। গৌড় বা ছোট পাণ্ডুয়ার ফিরোজ মিনারের সহিত এই মিনারের বিশেষ কোন সাদৃশ্য নাই। কিন্তু ফতেপুর সিক্রীতে সম্রাট আকবর নির্মিত হিরণ মিনারের সহিত ইহার খুব সাদৃশ্য দেখা যায়। সম্ভবত হিরণ মিনারের অনুকরণে এবং তাঁহার অল্পকাল পরেই নিমাসরাই মিনার নির্মিত হইয়াছিল।
৩
মধ্যযুগের রাজপ্রাসাদ
মধ্যযুগের সুলতানদের প্রাসাদ ও ধনীগণের সুরম্য হর্মের কোন নিদর্শনই নাই। পঞ্চদশ শতকের প্রথমে লিখিত চীনদেশীয় পর্যটকের বর্ণনায় রাজধানী পাণ্ডুয়ায় সুলতানের প্রাসাদের বর্ণনা আছে; দরবার কক্ষের পিত্তলমণ্ডিত স্তম্ভগুলিতে ফুল ও পশুপক্ষীর মূর্ত্তি খোদিত ছিল। চুনকাম করা ইটের তৈরী বাড়ি খুব উঁচু ও প্রকাণ্ড ছিল। তিনটি দরজা পার হইয়া গেলে প্রাসাদের অভ্যন্তরে নয়টি অঙ্গন দেখা যাইত। [বিভিন্ন চীনা পর্যটক প্রাসাদের বর্ণনা করিয়াছেন। একটি বর্ণনায় ‘তিনটি দরজা ও নয়টি অঙ্গনের উল্লেখ আছে। কিন্তু অনুরূপ আর একটি বর্ণনায় সেই স্থলে আছে ভিতরের দরজাগুলি তিনগুণ পুরু এবং প্রত্যেকের নয়টি পাল্লা (panels)। সম্ভবত শেষের বৃর্ণনাটি 793 (Visva Bharati, Annals 1.pp. 121, 126, 130)] দরবার কক্ষের দুই দিকের বারান্দা এত দীর্ঘ ও প্রশস্ত ছিল যে এক সহস্র অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত, বর্মে আচ্ছাদিত অশ্বারোহী এবং ধনুর্বাণ ও তরবারি হস্তে পদাতিকের সমাবেশ হইতে পারিত। অঙ্গনে ময়ূরপুচ্ছের তৈরী ছত্র হস্তে লইয়া একশত অনুচর দাঁড়াইত এবং বিরাট দরবার কক্ষে হস্তীপৃষ্ঠে ১০০ সৈন্য থাকিত। আঙ্গিনার সম্মুখে কয়েক শত হস্তী সারি দিয়া রাখা হইত।
কিন্তু সুলতানী আমলের পর যখন বাংলা দেশ মুঘল সাম্রাজ্যের একটি সুবায় পরিণত হইল, তখন এ সকল কিছুই ছিল না। ট্যাভার্ণিয়র ১৬৬৬ খ্রীষ্টাব্দে বাংলার রাজধানী ঢাকায় আসিয়াছিলেন। তিনি লিখিয়াছেন যে শাসনকর্ত্তা উঁচু দেয়াল দিয়া ঘেরা একটা ছোট কাঠের বাড়ীতে থাকেন। বেশির ভাগ তিনি ইহার আঙ্গিনায় তাঁবুতে বাস করেন। সমসাময়িক গ্রন্থে প্রকাণ্ড বাড়ী, বাগান প্রভৃতিরও উল্লেখ আছে–কিন্তু বিস্তৃত বর্ণনা নাই। বাড়ীগুলি সাধারণত ইটের, কাঠের বা বাঁশের তৈরী হইত। কিন্তু ইহা অনেক সময় বিচিত্র কারুকার্যে খচিত হইত। আবুল ফজল লিখিয়াছেন যে খগরঘাটার বাদশাহী কর্মচারীরা ১৫০০০ টাকা খরচ করিয়া এক একটি বাংলো তৈরী করিত এবং বাঁশের তৈরী বাড়িতে অনেক সময় পাঁচ হাজার টাকারও বেশি খরচ হইত। দীনেশচন্দ্র সেন এইরূপ একখানি খড়ের ঘরের বিস্তৃত বিবরণ দিয়াছেন। তাহাতে খরচ পড়িয়াছিল ১২,০০০, কাহারও মতে ৩০,০০০ টাকা। [বৃহৎ বঙ্গ, ৫৬০-৬১ পৃষ্ঠা]
৪
মধ্যযুগের হিন্দু শিল্প
(ক) মন্দির
হিন্দু ও মুসলমান উভয়েরই শিল্প ধর্মভাবের উপরই প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছিল। মুসলমানদের মসজিদ ও সমাধি-ভবন তাহাদের শিল্পের প্রধান ও সর্বোৎকৃষ্ট নিদর্শন। মন্দির এবং দেবদেবীর মূর্ত্তি ও ছবির মধ্য দিয়াই হিন্দু শিল্প প্রধানত আত্মপ্রকাশ ও উৎকর্ষলাভ করিয়াছিল। কিন্তু ইসলামের নির্দেশ অনুসারে হিন্দু মন্দির ও দেবদেবীর মূর্ত্তি ধ্বংস করাই মুসলমানের কর্তব্য ও পুণ্যার্জনের অন্যতম উপায়। কার্যত যে মুসলমানেরা ভারতে এই নীতি পালন করিয়াছে তাঁহার যথেষ্ট প্রমাণ আছে। অষ্টম শতাব্দীর প্রারম্ভে সিন্ধুদেশবিজয়ী মুহম্মদ বিন কাশিম হিন্দুর মন্দির ভাঙ্গিয়া মসজিদ তৈরী করেন। সহস্র বৎসর পরে ঔরঙ্গজেবও ভারতের বৃহত্তর পটভূমিতে ঠিক সেই একই নীতির অনুসরণ করিয়াছিলেন। বাংলা দেশেও ঠিক ঐ নীতিই অনুসৃত হইয়াছিল। ত্রয়োদশ শতকে অর্থাৎ বাংলা দেশে মুসলমান রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রথম যুগে হিন্দুর প্রসিদ্ধ তীর্থ ত্রিবেণীতে এক বা একাধিক বিচিত্র কারুকার্যখচিত হিন্দু মন্দির ভাঙ্গিয়া জাফর খা গাজি তাঁহার উপকরণ দিয়া মসজিদ ও সমাধি-ভবন তৈরী করিয়াছিলেন। অষ্টাদশ শতাব্দীতে মুসলমান রাজত্বের অবসানে নবাব মুর্শিদকুলী খাঁ কয়েকটি হিন্দু মন্দির ধ্বংস করিয়া রাজধানী মুর্শিদাবাদের নিকটে কাটরা মসজিদ নির্মাণ করিয়াছিলেন। সুতরাং বাংলার মধ্যযুগের হিন্দু মন্দির বা দেবদেবীর মূর্ত্তির যে বিশেষ কোন নিদর্শন পাওয়া যায় না তাহাতে আশ্চর্য বোধ করিবার কোন কারণ নাই। তবে ধ্বংস করিবার শক্তিরও একটা সীমা আছে; তাই ঔরঙ্গজেবও ভারতকে একেবারে মন্দিরশূন্য করিতে পারেন নাই। বাংলা দেশেও অল্পসংখ্যক কয়েকটি মধ্যযুগের মন্দির এখনও দেখিতে পাওয়া যায়। কিন্তু হয়ত যাহা ছিল তাঁহার এক ক্ষুদ্র অংশমাত্র এখনও আছে–সুতরাং ইহা দ্বারা হিন্দু শিল্পের প্রকৃত ইতিহাস রচনা করা যায় না। তবে ইহাও খুবই সম্ভব যে হিন্দুরাও কতকটা অর্থ-সম্পদের অভাবে এবং কতকটা মুসলমানদের হাতে ধ্বংসের আশঙ্কায়, বিশাল মন্দির গড়িতে উৎসাহ পায় নাই। সেজন্য মধ্যযুগে খুব বেশি উৎকৃষ্ট হিন্দু মন্দিরও তৈরী হয় নাই। এই কারণে হিন্দু শিল্পেরও অবনতি হইয়াছিল এবং উৎকৃষ্ট নূতন মন্দিরের সংখ্যাও অনেক কম ছিল। আর যে কয়েকটি তৈরী হইয়াছিল তাঁহারও কতক প্রাকৃতিক কারণে এবং কতক মুসলমানদের হাতে ধ্বংস হইয়াছে। বাকী যে কয়টি এই উভয়বিধ ধ্বংসের হাত হইতে রক্ষা পাইয়া এখনও কোন মতে টিকিয়া আছে তাহাদের উপর নির্ভর করিয়াই হিন্দু শিল্পের পরিচয় দিতে হইবে।
