অবশ্য এ যুগেও বহু সংখ্যক মসজিদ, সমাধিভবন, স্তম্ভ ও তোরণ নির্মিত হইয়াছিল; কিন্তু শিল্পের উৎকর্ষ হিসাবে তাহা খুব উচ্চ স্থান অধিকার করে না। সুতরাং সংক্ষেপে এই বিভিন্ন শ্রেণীর স্থাপত্য কলার বর্ণনা করিব। এখানে বলা আবশ্যক যে স্থাপত্য-শিল্পে ছোটখাট পরিবর্তন ও পরিবর্ধন হইলেও মুঘলযুগে বিশেষ কোন রীতিগত পরিবর্তন দেখা যায় না–সুলতানী আমলের শিল্পের ধারা মোটামুটি অব্যাহতই ছিল। বিশেষ প্রভেদ এই যে ইট, পাথর বা পোড়া মাটির ফলকে খোদিত ভাস্কর্যের পরিবর্তে চূণের পলস্তারা দ্বারা বাহিরের দেয়ালের শোভাবর্ধন করা হইত।
(ক) মসজিদ
এ যুগের সর্বপ্রাচীন উল্লেখযোগ্য মসজিদ পুরাতন মালদহে অবস্থিত। এই জমি মসজিদ ১৫৯৬ খ্রীষ্টাব্দে নির্মিত হয়। ইহা ইটের তৈরী, দৈর্ঘ্যে ৭২ ফুট ও প্রস্থে ২৭ ফুট। ইহার দুইটি বিশেষত্ব আছে।
প্রথমত, পূর্বদিকের সম্মুখভাগে মধ্যকার খানিক অংশ সম্মুখে প্রসারিত। ইহার দুই পাশে দুইটি ছোট মিনার এবং মধ্যভাগে খিলানযুক্ত প্রবেশপথের দুই ধারে ছোট দেয়াল। এই খিলানের তলদেশ সমতল নহে–ছোট ছোট তরঙ্গিত পলকাটা (Cusp)।
দ্বিতীয়ত, প্রসারিত অংশের পরট (Parapet) অন্য দুই অংশের পরট অপেক্ষা উচ্চ। ইহার ছাদ অনেকটা ছোট নৌকা বা গরুর গাড়ীর ছইয়ের আকৃতি। দুই পাশের নিম্নতর অংশের ছাদ নীচু গম্বুজের মত। এই দুই অংশের খিলানযুক্ত প্রবেশ-পথও মধ্যকার প্রবেশপথ অপেক্ষা নীচু।
ঢাকার অলুকুরি মসজিদ সম্ভবত সপ্তদশ শতকের শেষভাগে নির্মিত। ইহা সুলতানী আমলের প্রথম শ্রেণীর ন্যায় একটি মাত্র গম্বুজে ঢাকা একটি সমচতুষ্কোণ ক্ষুদ্র কক্ষ। ইহার তিনটি বিশেষত্ব। প্রথমত, ইহা একটি উচ্চ ও প্রশস্ত অধিষ্ঠানের উপর প্রতিষ্ঠিত। দ্বিতীয়ত, ইহার চারিদিকের মধ্যকার অংশই ঈষৎ প্রসারিত। তৃতীয়ত, চারি কোণের চারিটি স্তম্ভই কক্ষের দেয়াল ছাড়াইয়া অনেকটা উঁচুতে উঠিয়াছে। এগুলি পাঁচটি তলায় বিভক্ত এবং তাঁহার উপরে একটি ছত্রী।
ঢাকার লালবাগের মসজিদে পূর্ব্বোক্ত প্রথম ও তৃতীয় বিশেষত্বটি বর্তমান তবে ইহার ছাদে তিনটি গম্বুজ এবং গম্বুজগুলির গাত্রে পাতাকাটা নক্সা এবং উপরে একটি চূড়া। ইহা দৈর্ঘ্যে ৬৫ ফুট ও প্রস্থে ৩২ ফুট।
ঢাকার নিকটবর্তী সাতগম্বুজ মসজিদ দৈর্ঘ্যে ৫৮ ফুট ও প্রস্থে ২৭ ফুট। ইহার চারি কোণের স্তম্ভগুলির ভিতরে ফাঁপা ও মাথায় একটি করিয়া গম্বুজ। ছাদের তিনটি গম্বুজ লইয়া মোটমাট সাতটি গম্বুজ।
ময়মনসিংহ জিলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার অধীনে এগারসিন্দুর গ্রামে ইশা খানের দুর্গ ছিল। এখানে অনেকগুলি সুন্দর সুন্দর মসজিদ আছে। শাহ মুহম্মদের মসজিদ আকারে ক্ষুদ্র (৩২ X ৩২ ফুট) এবং সমসাময়িক ঢাকার পূর্ব্বোক্ত অলুকুরি মসজিদের অনুরূপ। কিন্তু মসজিদটি ইটের হইলেও ইহার সম্মুখের অঙ্গন শানবাঁধানো। ইহার প্রধান বিশেষত্ব এই যে ইহার প্রবেশদ্বার ঠিক একখানি দোচালা ঘরের আকৃতি (২৫ X ১৪ ফুট)। মুর্শিদাবাদের নিকটে মুর্শিদকুলী খাঁ কর্ত্তৃক ১৭২৩ খ্রীষ্টাব্দে নির্মিত কাটরা মসজিদ একটি বৃহৎ সমচতুষ্কোণ অঙ্গনের (১৬৬ ফুট) মধ্যস্থলে এক অধিষ্ঠানের উপর প্রতিষ্ঠিত। ইহা দৈর্ঘ্যে ১৩০ ফুট ও প্রস্থে ২৪ ফুট। ইহার চারিদিকে প্রায় ২০ গজ উচ্চ চারিটি বিশাল অষ্টকোণ মিনার ছিল। অভ্যন্তরস্থিত ৬৭টি ঘোরান সিঁড়ি দিয়া মিনারের চূড়াতলে ওঠা যায়। অঙ্গনের চারিপাশে দুই তলায় বহুসংখ্যক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘর। ১৪টি সোপান বাহিয়া অঙ্গনে উঠিতে হয়। এই সোপানের নিম্নে মুর্শিদকুলী খাঁর সমাধি-কক্ষ। অনেকগুলি হিন্দু মন্দির ভাঙ্গিয়া তাঁহার উপকরণ দিয়া এই মসজিদ নির্মিত হয়।
এই মসজিদগুলি ছাড়া ঢাকায় কর্তলব খানের মসজিদ, নারায়ণগঞ্জের বিবি মরিয়মের মসজিদ, ময়মনসিংহ জিলার আতিয়ায় জামি মসজিদ ও গুরাইয়ের মসজিদ এবং চট্টগ্রামের বায়াজিদ দরগা ও কদম-ই-মুবারিক মসজিদ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
(খ) সমাধি-ভবন, তোরণ-কক্ষ ও মিনার
গৌড়ে পূর্ব্বোক্ত কদম রসুল নামক সৌধের পাশে ইষ্টকনির্মিত নাতিবৃহৎ একটি গৃহ আছে (৩১ X ২২ ফুট), ইহা ঠিক একখানি দোচালা ঘরের অনুকৃতি। কেহ কেহ অনুমান করেন যে এটি ফৎ খানের সমাধি এবং সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি নির্মিত। আবার কেহ বলেন যে ইহা রাজা গণেশের সময়কার একটি হিন্দু মন্দির, কারণ ঘরটি উত্তর-দক্ষিণে লম্বা এবং ইহার চাল হইতে শিকলে ঘণ্টা বাঁধার জন্য একটি হুকের চিহ্ন দেখা যায়। ঘরটির তিনদিকে তিনটি দরজা আছে।
ঢাকার লালবাগ কিল্লার মধ্যে পরীবিবির সমাধি-ভবন আছে। বাহিরের গঠনপ্রণালী লালবাগের মসজিদের মত। তবে সমতল ছাদের উপরে তামার একটি কৃত্রিম গম্বুজ আছে অর্থাৎ ইহার নীচে কোন খিলান নাই। এককালে ইহা সোনার গিল্টি করা ছিল। অভ্যন্তর ভাগে নয়টি কক্ষ আছে। ঠিক মাঝখানে সমচতুষ্কোণ সমাধি-কক্ষ (১৯ ফুট), চারিকোণে চারিটি সমচতুষ্কোণ কক্ষ (১০ ফুট) এবং সমাধি-কক্ষের চারিপাশে চারিটি প্রবেশ-কক্ষ (২৫ X ১১ ফুট)। কেবলমাত্র দক্ষিণদিকের কক্ষই এখনকার প্রবেশপথ। ইহার চৌকাঠ পাথরের এবং দরজা চন্দন কাঠের। অন্য তিন দিকের দরজায় সুন্দর মার্বেলের জালি। সমাধি-কক্ষের দেয়াল সাদা মার্বেল পাথরের এবং মেজে ছোট ছোট নানা নক্সার কালো মার্বেল পাথরের খণ্ড দিয়া মণ্ডিত। সমাধি-কক্ষের মধ্যস্থলে মার্বেল পাথরের কবর–ইহার তিনটি ধাপের উপর লতাপাতা উৎকীর্ণ। সব কক্ষের দরজাতেই চৌকাঠ, কোন খিলান নাই। ইহা এবং ছাদের অভ্যন্তর ভাগের নির্মাণপ্রণালী হিন্দু শিল্পের প্রভাব সূচিত করে।
