দ্বিতীয় শ্রেণীর হর্মের একমাত্র নিদর্শন ১৫৩১ খ্রীষ্টাব্দে নসরৎ শাহ কর্ত্তৃক ইষ্টকনির্মিত গৌড়ের কদম রসুল। ইহার প্রধান কক্ষটি সমচতুষ্কোণ এবং ভিতরের দিকে ১৯ ফুট বর্গক্ষেত্র। [অনেকে কানিংহামের অনুকরণে ইহার দৈর্ঘ্য ২৫ ফুট ও প্রস্থ ১৫ ফুট বলিযা বর্ণনা করিয়াছেন। A.H. Dani, Muslim Architecture in Bengal, ১২৭ পৃ. দ্রষ্টব্য।] ইহার তিন দিকে তিনটি দরজা। এই কক্ষের উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বে ১৫ ফুট চওড়া তিনটি বারান্দা। পূর্বদিকের বারান্দার সম্মুখ ভাগ খোদিত ইষ্টকের কারুকার্যশোভিত ফলকে সম্পূর্ণ ঢাকা। খাটো পাথরের স্তম্ভের উপর খিলানযুক্ত তিনটি প্রবেশ পথ আছে। প্রধান কক্ষের উপর একটিমাত্র গম্বুজের ছাদ। গম্বুজের উপর পদ্মের ন্যায় চূড়া। প্রতি বারান্দার ছাদ অর্ধবৃত্তাকার খিলানের আকৃতি, চারি কোণে চারিটি অষ্টকোণ মিনার এবং প্রত্যেক মিনারের উপর একটি স্তম্ভ। সাধারণত মসজিদশ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হইলেও কদম রসুল মসজিদ নহে। হজরৎ মহম্মদের পদচিহ্নাঙ্কিত একখণ্ড কাল মার্বেল পাথর এখানে রক্ষিত হইয়াছিল বলিয়া ইহা কদম রসুল নামে খ্যাত।
পূর্ব্বোক্ত মসজিদগুলি ছাড়াও বাংলা দেশের নানা স্থানে উল্লিখিত শ্রেণীর আরও বহু কারুকার্যখচিত মসজিদ আছে। ইহাদের মধ্যে চারিটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
১। শ্রীহট্ট জিলার শঙ্করপাশা গ্রামের মসজিদ।
২। রাজশাহীর ২৫ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে বাঘা গ্রামে নসরৎ শাহ নির্মিত মসজিদ।
৩। রাজশাহী জিলার কুসুম্বা গ্রামের মসজিদ (১৫৫৮ খ্রীষ্টাব্দ)।
৪। পাণ্ডুয়ার কুত্ত্বশাহী মসজিদ (১৫৮২ খ্রীষ্টাব্দ) মুঘল আমলের প্রথমে নির্মিত, কিন্তু সুলতানী আমলের স্থাপত্যরীতি।
মসজিদ বাদ দিলে কয়েকটি তোরণকক্ষ ও মিনার মধ্যযুগে স্থাপত্যশিল্পের উৎকৃষ্ট নিদর্শন বলিয়া পরিগণিত হইবার যোগ্য।
গৌড়ের দাখিল-দরওয়াজা অর্থাৎ দুর্গের উত্তর প্রবেশদ্বার এই শ্রেণীর সর্বোৎকৃষ্ট নিদর্শন। ইহা ইষ্টকনির্মিত এবং ইহার ৬০ ফুট উচ্চ এবং ৭৩ ফুট প্রশস্ত ও কারুকার্যে শোভিত সম্মুখ ভাগের মধ্যস্থলে ৩৪ ফুট উচ্চ খিলানযুক্ত বিশাল তোরণ। ইহার দুই ধারে দুইটি বিশাল কুড্যস্তম্ভ এবং তাঁহার সহিত সংযুক্ত দ্বাদশ-কোণ সমন্বিত দুইটি অট্টালক (Tower) ক্ৰমশঃ সরু হইয়া উপরে উঠিয়াছে। প্রতি অট্টালক পাঁচটি তলায় বিভক্ত। সম্মুখ ভাগের ঠিক মধ্যস্থলে অবস্থিত তোরণের প্রবেশদ্বার হইতে অভ্যন্তরে যাইবার পথ ১১৩ ফুট লম্বা এবং ২৪ ফুট উচ্চ খিলানে ঢাকা। ইহার দুই ধারে রক্ষীদের কক্ষ। এইটিই দুর্গের প্রধান তোরণ ছিল এবং সম্ভবত পঞ্চদশ শতকে নির্মিত হইয়াছিল।
গৌড়দুর্গের পূর্বদিগের তোরণ–সুমতি দরওয়াজা। একটি গম্বুজের ছাদে ঢাকা এবং সমচতুষ্কোণ কক্ষ। কক্ষের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ৪২ ফুট, প্রবেশপথের খিলান ৫ ফুট চওড়া। ইহার দুই ধারে পল-কাটা ইটের স্তম্ভ তিন তলায় বিভক্ত। কক্ষের চারিটি মিনার ছিল, সবই ভাঙ্গিয়া গিয়াছে।
গৌড়ের আলাউদ্দীন হোসেন শাহের সমাধির তোরণও উৎকৃষ্ট কারুকার্যের নিদর্শন।
গৌড়ের ফিরোজা মিনার এই শ্রেণীর স্থাপত্যের একটি উৎকৃষ্ট নিদর্শন। এটি পাঁচ তলায় বিভক্ত এবং ৮৪ ফুট উচ্চ। ইহার সর্বনিম্ন অংশের পরিধি ৬২ ফুট। নীচের তিনটি তলা দ্বাদশ-কোণ-সমন্বিত এবং উপরের দুই তলা গোলাকৃতি। ইটের তৈরী এই মিনারের উপরিভাগ পোড়ামাটির নানা নকসার এবং নীল ও সাদা রংয়ের মসৃণ টালি দ্বারা শোভিত। কেহ কেহ মনে করেন যে হাবসী সুলতান সৈফুদ্দীন ফিরোজ শাহই ইহা নির্মাণ করেন। ইহা সম্ভবত দিল্লির কুতব মিনারের আদর্শে নির্মিত।
হুগলি জিলার ছোট পাণ্ডুয়াতে ফিরোজ মিনার নামে আর একটি ইটের মিনার আছে। এটি সম্ভবত চতুর্দ্দশ শতকের প্রথমে নির্মিত হইয়াছিল। ইহা প্রায় ১২০ ফুট উচ্চ এবং পাঁচটি তলায় বিভক্ত। ইহা গোলাকৃতি এবং লম্বালম্বিভাবে পলকাটা। ইহার উচ্চতা ও নীচের বিশাল ছয় ফুট পরিধির মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকায় এবং কারুকার্যের অভাবে গৌড়ের ফিরোজ মিনারের সহিত ইহার তুলনা হয় না।
২
মুঘল যুগ
রাজশক্তির সহিত শিল্পের উৎকর্ষের যে একটি ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ আছে বাংলার স্বাধীন সুলতানদের যুগের শিল্পের সহিত মুঘল যুগের শিল্পের তুলনা করিলেই তাহা বুঝা যায়। মুঘল যুগের সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থল দিল্লি ও আগ্রায় মুসলমান শিল্পের চরম উৎকর্ষ হইয়াছিল। কিন্তু বাংলা দেশে তখন কোন স্বাধীন রাজশক্তি ছিল না, একজন সুবাদার শাসন করিতেন–কার্যান্তে তিনি বাংলার বাহিরে স্বদেশে ফিরিয়া যাইতেন। উচ্চ কর্মচারীদের সম্বন্ধেও ঐ কথা বলা যায়, এবং এই অবস্থা অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে মুর্শিদকুলী খাঁর শাসন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। সুতরাং বাংলা দেশের প্রতি তাহাদের অন্তরের টান ছিল না। তাহা ছাড়া সুবাদার ও উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা কোটি কোটি টাকা এদেশ হইতে লইয়া যাইতেন এবং কোটি কোটি টাকা রাজস্বস্বরূপ বাংলা দেশ হইতে আগ্রা ও দিল্লিতে যাইত। রাজশক্তির ইচ্ছা ও উৎসাহ এবং ধনসম্পদের প্রাচুর্য না থাকিলে কোন দেশেই শিল্পের উন্নতি সম্ভবপর হয় না। মুগল যুগের বাংলা দেশে পূর্বযুগের তুলনায় এ দুইয়েরই অভাব ছিল, সুতরাং শিল্পের উৎকর্ষ বিশেষ কিছুই হয় নাই।
