গৌড়ের চিকা মসজিদ একলাখীর মত, কিন্তু আয়তনে ছোট। ইহার মধ্যে মিহরাব বা বেদী নাই। কেহ কেহ বলেন, ইহা সুলতান মামুদের (১৪৩৭-৫৯ খ্রী) সমাধি-ভবন, কিন্তু ইহার মধ্যে কোন কবর নাই। কাহারও কাহারও মতে ইহা সুলতান হোসেন শাহের নির্মিত একটি তোরণ (১৫০৪ খ্রী)–কিন্তু ইহার গঠনপ্রণালী অনেক প্রাচীন বলিয়াই মনে হয়।
গৌড়ে এবং বাংলা দেশের নানা স্থান প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর অনেক মসজিদ আছে। কোন কোনটিতে মসজিদের সামনে একটি দরদালান আছে এবং ইহার ছাদে তিনটি গম্বুজ মসজিদে যাইবার তিনটি দরজার ঠিক উপরিভাগে। কোন কোনটিতে চারি কোণে চারিটি মিনারের জায়গায় ছয়টি মিনার আছে–অতিরিক্ত দুইটি দরদালানের দুই প্রান্তে। কোন কোনটিতে ছাদের উপর বিশাল গম্বুজ একটি বৃত্তাকার স্বতন্ত্র অধিষ্ঠানের উপর থাকায় সমস্ত হৰ্মটি অনেকটা উচ্চ বলিয়া মনে হয় এবং ইহার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। এইরূপ অধিষ্ঠানের অভাবে অধিকাংশ গম্বুজ খর্বাকৃতি হওয়ায় সমস্ত সৌধটির সৌন্দর্য ও মহিমা ম্লান হয়।
গৌড়ের তাঁতিপাড়া এবং ছোট সোনা মসজিদ, ত্রিবেণীতে জাফর খার মসজিদ এবং বাংলা দেশের নানা স্থানে বহুসংখ্যক মসজিদ পূর্ব্বোক্ত চতুর্থ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। কেহ কেহ তাঁতিপাড়া মসজিদকে (আ ১৪৮০ খ্রী) গৌড়ের সর্বোকৃষ্ট হ বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। ইহার ছাদ ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। কিন্তু দেয়ালের উপর পোড়া মাটির ফলক এবং অন্যান্য খোদিত আভরণগুলির যে বিচিত্র সৌন্দর্য এখনও বর্তমান তাহা উক্ত মতের সমর্থন করে।
ছোট সোনা মসজিদটিও উৎকৃষ্ট শিল্পের নিদর্শন। ইহার ইষ্টক নির্মিত বাহিরের দেয়াল পুরাপুরি এবং ভিতরের দেয়াল আংশিক ভাবে প্রস্তরমণ্ডিত। এই পাথরের উপর অনেক রকমের চিত্র ও নকসা খোদিত আছে। কিন্তু এগুলি অর্ধচিত্র অপেক্ষা আরও কম উচ্চ হওয়ায় তাঁতিপাড়ার মসজিদের ভাস্কর্যের অপেক্ষা নিকৃষ্ট। ছোট সোনা মসজিদের কোন কোন গম্বুজের ভিতরের দিকে সোনার গিল্টি করার চিহ্ন আছে। সম্ভবত ইহা ইহাতেই “সোনা মসজিদ” নামের উৎপত্তি। ছোট সোনা মসজিদে গম্বুজগুলির মধ্যে একখানি চৌচালা খড়ের ঘরের আকৃতি ছোট কুটির আছে।
গৌড়ের বড় সোনা মসজিদ এবং বাগেরহাটের সাত গম্বুজ মসজিদ এই শ্রেণীর অন্তর্গত। ইহাদের অভ্যন্তর ভাগ স্তম্ভের সারি দিয়া এগারটি পাশাপাশি ভাগ করা হইয়াছে। সাধারণত তিনটি বা পাঁচটি ভাগ থাকে। কেবলমাত্র ছোট পাণ্ডুয়ার (হুগলি জিলা) বারদোয়ারি মসজিদে একুশটি ভাগ আছে।
বড় সোনা মসজিদ সুলতান নসরৎ শাহ ১৫২৬ খ্রীষ্টাব্দে নির্মাণ করেন। ইহা দৈর্ঘ্যে ১৬৮ ফুট ও প্রস্থে ৭৬ ফুট। ইহাতে ছয়টি মিনার আছে–চারি কোণে চারিটি এবং সম্মুখের দরদালানের দুই প্রান্তে দুইটি। দরদালান ও প্রধান কক্ষের মধ্যে দশটি বৃহৎ স্তম্ভ আছে। এই কক্ষের অভ্যন্তরে দশ দশ স্তম্ভের দুইটি সারি লম্বালম্বিভাবে তিনটি ভাগে ইহাকে বিভক্ত করিয়াছে। দরদালান ও কক্ষে এগারটি খিলানযুক্ত প্রবেশদ্বার আছে ও সেই বরাবর পশ্চাৎ ভাগের প্রাচীরে এগারটি মিহরাব আছে। কক্ষের উত্তর-পশ্চিম কোণে তিনটি পাশাপাশি ভাগ জুড়িয়া একটি উচ্চ মঞ্চ আছে অনেকটা আদিনা মসজিদের বাদশাহকা তখৃতের ন্যায়। অন্য দুএকটি মসজিদেও এরূপ ব্যবস্থা আছে। কক্ষের লম্বালম্বি তিন ভাগের উপর তিন সারি, দরদালানের উপর এক সারি এবং এই প্রতি সারিতে এগারটি করিয়া মোট ৪৪টি গম্বুজ দিয়া ছাদ করা হইয়াছিল কিন্তু কক্ষের গম্বুজগুলি সবই ধ্বংস হইয়াছে। মসজিদটি ইটের তৈরী কিন্তু বাহিরে পুরাপুরি এবং ভিতরে খিলানের আরম্ভ পর্যন্ত দেয়ালের অংশ প্রস্তরমণ্ডিত। ছোট সোনা মসজিদের ন্যয় বড় সোনা মসজিদেও সোনার গিল্টি করা ছিল। ইহাতে খোদাই করা আভরণের আধিক্য নাই, কিন্তু ইহার খিলানযুক্ত দরদালান, আয়তনের বিশালতা এবং পাথরের মজবুত গঠন ইহাকে একটি অনির্বচনীয় গাম্ভীর্য ও সৌন্দর্য প্রদান করিয়াছে। ফাণ্ডসন ইহাকে গৌড়ের সর্বোৎকৃষ্ট সৌধ বলিয়া মত প্রকাশ করিয়াছেন। এই মসজিদের সম্মুখে একটি মুক্ত সমচতুষ্কোণ অঙ্গন আছে, ইহার প্রতি দিক ২০০ ফুট এবং ইহার উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বে তিনটি খিলানযুক্ত তোরণ আছে।
বাগেরহাটের সাতগম্বুজ মসজিদ দৈর্ঘ্যে ১৬০ ফুট ও প্রস্থে ১০৮ ফুট। ইহার বৈশিষ্ট্য-অভ্যন্তর ভাগে ছয় সারি সরু স্তম্ভ দিয়া লম্বালম্বি সাতটি ভাগ, এগারটি মিহরাব ও এগারটি খিলানযুক্ত প্রবেশ দ্বার (ঠিক মাঝেরটি অন্য দশটির চেয়ে বড়) এবং ছাদে সাত সারিতে ৭৭টি গম্বুজ–কতকগুলি গম্বুজ বাংলা দেশের চৌচালা ঘরের মত। ঠিক মধ্যখানের দরজার উপর দোচালা ঘরের চালের প্রান্তের মত একটি ত্রিভুজাকৃতি গঠন–ইহা হইতে দুইধারে কার্নিস নামিয়া কোণের মিনারের দিকে গিয়াছে। কোণের মিনারগুলি গোল, সাধারণ মিনারের মত বহুকোণযুক্ত নহে, এবং দুই তলায় বিভক্ত।
ছোট পাণ্ডুয়ার বারদোয়ারি মসজিদ দৈর্ঘ্যে ২৩১ ফুট ও প্রস্থে ৪২ ফুট। বিভিন্ন নকসার দুই সারি স্তম্ভ (মোট কুড়িটি) দিয়া লম্বালম্বি তিন ভাগে বিভক্ত। পশ্চাতে একুশটি মিহরাব, সম্মুখে একুশটি খিলানমুক্ত প্রবেশদ্বার এবং প্রতিপাশে আরও তিনটি। মিহরাবগুলি এবং বেদীর উপর একখণ্ড পাথরে নির্মিত একটি ছত্রী নানা কারুকার্যখোদিত। ছাদে তিন সারিতে ২১টি করিয়া ৬৩টি গম্বুজ।
