চতুর্থ : বেশি লম্বা, কম চওড়া একটি বৃহৎ কক্ষ–ইহার ছাদে বহুসংখ্যক গম্বুজ এবং ভিতর স্তম্ভশ্রেণী দ্বারা অনেকগুলি কক্ষায় বিভক্ত। প্রত্যেকটি লম্বালম্বি কক্ষার পশ্চিমপ্রান্তে একটি মিহরাব এবং পূর্বপ্রান্তে অর্থাৎ সম্মুখদিকে ঠিক সেই বরাবর একটি খিলান। ছাদের বহুসংখ্যক গম্বুজের খিলানগুলি স্তম্ভশ্রেণীর শীর্ষদেশে প্রতিষ্ঠিত।
পাণ্ডুয়ার আদিনা মসজিদ উল্লিখিত তৃতীয় শ্রেণীভুক্ত এবং সুরক্ষিত মসজিদগুলির মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রাচীন।
১৩৬৪ খ্রীষ্টাব্দে সুলতান সেকন্দর শাহ ইহার নির্মাণ আরম্ভ করিয়াছিলেন। ভারতবর্ষে এত বড় মসজিদ আর কখনও নির্মিত হয় নাই। ৩৯৭ ফুট দীর্ঘ এবং ১৫৯ ফুট প্রস্থ একটি মুক্ত অঙ্গনের চারি পাশে চারি সারি কক্ষ। পশ্চিমের সারি আবার স্তম্ভশ্রেণী দ্বারা পাঁচ ভাগে বিভক্ত এবং ইহার মধ্যেই উপাসনা কক্ষ। অপর তিন দিকের সারিগুলি তিন তিন ভাগে বিভক্ত। পশ্চিম সারিতে মধ্যস্থলে একটি বিশাল উচ্চ কক্ষ (৬৪ ফুট x ৩৪ ফুট) এবং দুই পাশে নীচু আর দুইটি কক্ষ। ইহার প্রত্যেকটি পাঁচ সারি স্তম্ভ দিয়া পাঁচটি কক্ষায় বিভক্ত এবং পাঁচটি খিলানের মধ্য দিয়া মধ্যের কক্ষ হইতে ঐ পাঁচটি কক্ষায় যাওয়ার পথ। মধ্যের বিশাল কক্ষটির উপরে একটি প্রকাণ্ড খিলান আকৃতি ছাদ ছিল, এখন ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। মধ্য কক্ষের পশ্চাতের দেয়ালে প্রকাণ্ড মিহরাব, ইহার দক্ষিণে অনুরূপ কারুকার্য শোভিত কষ্টিপাথর নির্মিত উপাসনার বেদী। দুই পার্শ্বকক্ষের প্রত্যেকটিতে পশ্চাদভাগের প্রাচীরগাত্রে আঠারোটি কুলুঙ্গি এবং ইহাদের বরাবর অপর প্রান্তে সম্মুখের দিকে আঠারোটি উন্মুক্ত খিলান আছে। উত্তরের দিকের পার্শ্বকক্ষের খানিকটা অংশ জুড়িয়া ৮ ফুট উঁচু মোটা খাটো ২১টি কারুকার্যখচিত স্তম্ভের উপর বাদশাহ কা তখৃত অর্থাৎ রাজপরিবারের বসিবার জন্য মঞ্চ তৈরি হইয়াছে। মোট স্তম্ভ সংখ্যা ২৬০।
চারি দিকে চারি সারি কক্ষের উপরের ছাদ মোটামুটি ৩৭৬টি ছোট ছোট বর্গক্ষেত্রে ভাগ করিয়া প্রত্যেকটির উপর একটি করিয়া ছোট গম্বুজ নির্মিত হইয়াছে। পশ্চিম দিকের কক্ষের সারির ঠিক মাঝখানে যে বৃহদাকার খিলান আছে তাহা ৩৩ ফুট চওড়া এবং ৬০ ফুটের বেশি উঁচু। ইহার দুই পাশে যে খিলানগুলি আছে তাহাও ৮ ফুট চওড়া। হিন্দু মন্দির হইতে উৎকৃষ্ট কারুকার্যশোভিত স্তম্ভ খুলিয়া নিয়া মিহরাবটি তৈরী হইয়াছে।
আদিনা মন্দিরের ধ্বংসের মধ্যে হিন্দু দেবদেবীর অনেক পাথরের মূর্ত্তি পাওয়া গিয়াছে। মিহরাব দুইটি উৎকৃষ্ট হিন্দু শিল্পের উপকরণ দিয়া নির্মিত।
গৌড় নগরীর গুণমন্ত এবং দরসবারি মসজিদ আদিনা মসজিদের ন্যায় পূর্ব্বোক্ত তৃতীয় শ্রেণীর মসজিদ। এই দুই মসজিদের নিকটে যে দুইটি লেখ পাওয়া গিয়াছে তাহাদের তারিখ ১৪৮৪ এবং ১৪৭৯ খ্রীষ্টাব্দ এবং অনেকেই মনে করেন যে উক্ত মসজিদ দুইটিও ঐ তারিখ। কিন্তু আদিনা মসজিদের সহিত সাদৃশ্য বিবেচনা করিলে মনে হয় মসজিদ দুইটি আরও পূর্বেই নির্মিত হইয়াছিল। লেখ দুইটি যে ঐ দুইটি মসজিদেই উত্তীর্ণ হইয়াছিল তাঁহার কোন নিশ্চয়তা নাই। গুণমন্ত মসজিদের মধ্যবর্তী বৃহৎ কক্ষের খিলান আকারের ছাদটি এখনও আছে। আদিনা ও দরসবারির ছাদ ধ্বংস হইয়াছে। সুতরাং গুণমন্ত মসজিদের ছাদের, বিশেষত ইহার নিম্ন অংশের বরগা ও খিলান-যুক্ত কুলুঙ্গিগুলি সম্ভবত অন্য দুইটি মসজিদেও ছিল।
পান্ডুয়ার একলাখী পূর্ব্বোক্ত প্রথম শ্রেণীর একটি উৎকৃষ্ট নিদর্শন। অনেকেই অনুমান করেন যে ইহা জলালউদ্দীন মুহম্মদ শাহের সমাধি। বাহিরের দিকে ইহা দৈর্ঘ্যে ৭৮ ফুট ও প্রস্থে ৭৪ ফুট, সুতরাং প্রায় সমচতুষ্কোণ। কিন্তু ভিতরে ইহা অষ্ট কোণ, এবং ইহার উপর অর্ধ-বৃত্তাকার গম্বুজ। ইহার প্রতি দিকে একটি করিয়া খিলানযুক্ত তোরণ। কোনও প্রাচীন হিন্দু মন্দির ধ্বংস করিয়া তাঁহার উপকরণ দিয়া এই সমাধি ভবন নির্মিত হইয়াছিল। কারণ, ইহাতে হিন্দু স্থাপত্যের নিদর্শনযুক্ত বহু প্রস্তরখণ্ড দেখিতে পাওয়া যায় এবং ইহার কষ্টি পাথরে নির্মিত তোরণের তলদেশে হিন্দু দেবতার মূর্ত্তি খোদিত আছে। ইহার কার্নিসটি খড়ের চালের মত ঈষৎ বাঁকানো এবং দেয়াল হইতে অনেকটা বাড়ানো।
গৌড়ের নত্তন বা লত্তন মসজিদ প্রথম শ্রেণীর মসজিদের আর একটি উৎকৃষ্ট নিদর্শন। কানিংহামের মতে ইহা ১৪৭৫ খ্রীষ্টাব্দে, কিন্তু কাহারও কাহারও মতে ইহা হোসেন শাহের আমলে অর্থাৎ আরও ৩০/৪০ বৎসরে পরে নির্মিত হইয়াছিল। প্রবাদ এই যে রাজার কোন প্রিয় নর্তকী ইহা নির্মাণ করে বলিয়াই মসজিদের নাম নত্তন। মসজিদের অভ্যন্তর ৩৪ ফুট বর্গক্ষেত্র এবং বহির্দেশ ৭২ ফুট দীর্ঘ এবং ৫১ ফুট প্রস্থ। পূর্বদিকে ১১ ফুট চওড়া অলিন্দ এবং প্রতি কোণে অষ্টকোণ অট্টালক। পূর্বদিকে খিলানযুক্ত তিনটি প্রবেশ পথ। মধ্যবর্তী প্যানেলগুলিতে বিচিত্র কারুকার্যখচিত কুলুঙ্গি। কার্নিসগুলি ঈষৎ বাঁকানো। বারান্দার উপর তিনটি গম্বুজ, মধ্যবর্তীটি চৌচালা ঘরের আকৃতি। অন্তর্কক্ষের উপর বৃহৎ গম্বুজ, কিন্তু ইহার ভিত্তিবেদী অতিশয় নীচু। এককালে সমগ্র মসজিদটির ভিতর ও বাহির নানা রঙের মসৃণ টালির বিচিত্র জ্যামিতিক নকসায় সজ্জিত ছিল। এখন ইহার বাহিরের অংশের সাজসজ্জা নষ্ট হইয়া গিয়াছে। কানিংহাম, ফ্রাঙ্কলিন প্রভৃতি এই মসজিদের উচ্চ প্রশংসা করিয়াছেন।
