১
সুলতানী যুগ
মধ্যযুগে বাংলার স্থাপত্য-শিল্পের উৎকৃষ্ট নিদর্শন পাওয়া যায় মুসলমান সুলতানদের নির্মিত মসজিদ ও সমাধি-ভবনে। এই শিল্পের কয়েকটি বিশেষত্ব আছে।
প্রথমত, এগুলি প্রধানত ইষ্টকনির্মিত। স্তম্ভ ও কোন কোন স্থলে প্রাচীরের বহিরাবরণের জন্য পাথর ব্যবহার করা হইয়াছে। কখনও কখনও আর্দ্রতা হইতে রক্ষা করিবার জন্য সর্বনিম্নে একসারি পাথর বসান হইয়াছে। ইহার কারণ বাংলা দেশের পশ্চিমপ্রান্তে রাজমহলের নিকটবর্তী অঞ্চল ছাড়া আর কোথাও পাহাড় নাই। সুতরাং প্রস্তর খুবই দুর্লভ ছিল। ইটের গাঁথনি মজবুত করার জন্য চুণ ব্যবহার করা হইত। তাহা ছাড়া মুঘল যুগে পলস্তারার জন্যও চুণ ব্যবহার করা হইত।
দ্বিতীয়ত, বাংলা দেশে বেশিরভাগ বাঁশের খুঁটি ও খড়ের চাল দিয়া ঘর তৈরি হইত। দোচালা ও চারচালা সাধারণত ঘরের এই দুই শ্ৰেণী। দেখা যায়, কাঠের ও ইটের বাড়ির ছাদ ইহার অনুকরণেই নির্মিত হইত। অর্থাৎ সরলরেখার পরিবর্তে খড়ের চালের ন্যায় কতকটা বাঁকানো হইত। ঘরগুলিতে যেমন চারিকোণে বাঁশের খুঁটি আড়াআড়িভাবে বাঁশ লাগাইয়া মজবুত করা হইত, ইটের বাড়িতেও তেমনি চারিকোণে চারিটি ইষ্টক স্তম্ভ অট্টালকের (Tower) আকারে নির্মিত হইত। দুইটি বাঁশ অল্পদূরে পুঁতিয়া তাঁহার মাথা নোয়াইয়া বাঁধিয়া দিলে যে আকৃতি ধারণ করে, ইটের ও পাথরের স্তম্ভের উপর গঠিত খিলানগুলিও তাঁহার অনুকরণ করিত।
তৃতীয়ত, দেয়ালের গঠনে অংশবিশেষ সম্মুখে বাড়াইয়া এবং পশ্চাতে হঠাইয়া বৈচিত্র্য সৃষ্টি, ইহার গায়ে নানারকমের নক্সা, ও এক খণ্ড প্রস্তরে গঠিত স্তম্ভ প্রভৃতি প্রথম প্রথম হিন্দুযুগের অনুকরণে করা হইত। ক্রমে ক্রমে ইহার পরিবর্তন হয়। হিন্দুমন্দিরের গায়ে চতুষ্কোণ প্রস্তরের ফলকের উপর মানুষের মূর্ত্তি খোদিত হইত। কিন্তু ইসলাম ধর্ম্মে মনুষ্যমূর্ত্তি গঠন নিষিদ্ধ হওয়ায় তাঁহার বদলে নানারূপ লতাপাতা ও জ্যামিতিক নক্সা খোদাই করা হইত।
চতুর্থত, নূতন এক প্রণালীতে খিলান নির্মিত হইত। হিন্দুযুগে সাধারণত একখানা ইট (বা পাথরের উপরে ঠিক সমান্তরালভাবে আর একখানা ইট (বা পাথর) বসান হইত, কেবল তাঁহার সামান্য একটু অংশ নিচের ইটের (বা পাথরের) চেয়ে একটু বাড়ানো থাকিত। এইভাবে দুইটি স্তম্ভের উপর দুই দিক হইতে ইটের (বা পাথরের) অংশ বাড়িতে বাড়িতে যখন দুইখানি ইটের (বা পাথরের) মধ্যে ব্যবধান খুব সঙ্কীর্ণ হইত তখন এক খণ্ড বড় ইট বা পাথর এই ব্যবধানের উপর বসাইয়া খিলান তৈরি হইত। মধ্যযুগে ইট বা পাথরগুলি সমান্তরালভাবে একটির উপর একটি না বসাইয়া কোণাকুণিভাবে পাশাপাশি সাজাইয়া খিলান তৈরি হইত। ইহার নাম প্রকৃত খিলান (True Arch)। ঠিক এই প্রণালীতেই বড় বড় গম্বুজ (dome) নির্মিত হইত। এই প্রকার খিলান ও গম্বুজ মুসলমান শিল্পের বিশেষত্ব। হিন্দুযুগে ইহা অজ্ঞাত ছিল না, কিন্তু ইহার ব্যবহার ছিল খুবই কম।
পঞ্চমত, নানা রংয়ের ও নানা আকৃতির মিনা করা কাঁচের ন্যায় মসৃণ টাইল ও ইটের ব্যবহার। ভিতরের ও বাহিরের দেওয়ালে এইগুলির ব্যবহারের দ্বারা সৌন্দর্য বৃদ্ধি করাই ছিল সাধারণ বিধি।
ষষ্ঠত, ছাদের উপর গম্বুজের পাশে বাংলা দেশের খড়ের চালের ঘরের ন্যায় ইষ্টক নির্মিত ক্ষুদ্র কক্ষের সমাবেশ। ইহার দৃষ্টান্ত খুব বেশি নহে।
মুসলমান আমলের যে সকল ইমারৎ এখন পর্যন্ত মোটামুটি সুরক্ষিত অবস্থায় আছে তাঁহার কোনটিই চতুর্দ্দশ শতকের পূর্বে নির্মিত নহে। সর্বাপেক্ষা প্রাচীন হর্মের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায় হুগলি জিলার অন্তঃপাতী ত্রিবেণী ও ছোট পাণ্ডুয়া গ্রামে। ত্রিবেণীতে জাফরখান গাজির সমাধি-ভবন ত্রয়োদশ শতকের শেষভাগে প্রাচীন হিন্দুমন্দির ভাঙ্গিয়া তাঁহারই বিভিন্ন অংশ ও খোদিত কারুকার্য জোড়াতাড়া দিয়া নির্মিত হইয়াছিল। ত্রিবেণীতে একটি বিশাল মসজিদের ধ্বংসাবশেষ আছে। ইহাও জাফরখানের নির্মিত (১২৯৮ খ্রীষ্টাব্দ)। ইহা দৈর্ঘ্যে প্রায় ৭৭ ফুট এবং প্রস্থে প্রায় ৩৫ ফুট। ইহাতে খিলানযুক্ত পাঁচটি দরজা ও ছাদে পাঁচটি গম্বুজ ছিল। এগুলির ধ্বংসাবশেষ হইতে হিন্দু মন্দিরের কারুকার্যখোদিত ও মূর্ত্তিযুক্ত বহুসংখ্যক ফলক পাওয়া গিয়াছে। ছোট পাণ্ডুয়াতে একটি মসজিদ ও একটি মিনার আছে।
স্বাধীন বাংলার মুসলমান সুলতানদের রাজধানী ছিল প্রথমে গৌড়, পরে ইহার ১৭ মাইল উত্তরে অবস্থিত পাণ্ডুয়া এবং তাঁহার পরে আবার গৌড়। সুতরাং মধ্যযুগের বাংলার স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন এই দুই শহরেই আছে। এই দুই শহরে যে সকল মসজিদ ও সমাধি-ভবন আছে তাহা মোটামুটি নিম্নলিখিত চারি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়।
প্রথম : সমচতুষ্কোণ একটি গম্বুজওয়ালা কক্ষ–ভিতরে কোন স্তম্ভের ব্যবহার নাই, কার্নিসের উপর চারিকোণে চারিটি অষ্টকোণ বলভি এবং সম্মুখে অলিন্দ।
দ্বিতীয় : প্রথমের অনুরূপ, তবে ইহার তিনদিকে তিনটি অলিন্দ।
তৃতীয় : বেশি লম্বা, কম চওড়া একটি বৃহৎ ও উচ্চ কেন্দ্রশালা–ইহার উপরে খিলানের ছাদ ও দুই পাশে দুইটি কম উঁচু পার্শ্বশালা। পার্শ্বশালার উপরে একাধিক গম্বুজ এবং অভ্যন্তরভাগ স্তম্ভশ্রেণী দ্বারা লম্বালম্বি ও পাশাপাশি অনেকগুলি কক্ষায় বিভক্ত।
