(চ) খ্রীষ্টীয় মিশনারীর রচনা
সাধারণ লোকের মধ্যে খ্রীষ্টধর্ম প্রচারের জন্য পর্তুগীজ ও অন্যান্য ইউরোপীয় মিশনারীগণ যত্নপূর্বক বাংলা শিখিতেন ও বাংলায় ছোট ছোট পুস্তিকা লিখিয়া খ্রীষ্টের মাহাত্ম প্রচার করিতেন। সপ্তদশ শতকে পর্তুগীজ মিশনারীরা বাংলা অভিধান ও ব্যাকরণ রচনা করিয়াছিলেন। ষোড়শ শতকের শেষভাগে বাংলা গদ্যে দুইখানি পুস্তিকা লিখিত হইয়াছিল বলিয়া শোনা যায়। কিন্তু এই সমুদয় পুস্তক এখন আর পাওয়া যায় না। এই শ্রেণীর যে সকল গ্রন্থ পাওয়া গিয়াছে তাঁহার মধ্যে সর্বপ্রাচীন গ্রন্থ ‘ব্রাহ্মণ রোমান ক্যাথলিক সংবাদ’। ১৭৪৩ খ্রীষ্টাব্দে এই বইখানি রচিত হয়। ইহার রচয়িতা ভূষণার (পূর্ব পাকিস্তানে) এক সম্ভ্রান্ত বংশে জাত খ্রীষ্টধর্ম্মান্তরিত বাঙালী হিন্দু। বাল্যকালে (১৬৬৩ খ্রীষ্টাব্দে) আরাকানের জলদস্যুরা তাহাকে অপহরণ করে। একজন পর্তুগীজ মিশনারী তাহাকে অর্থ দিয়া ক্রয় করিয়া খ্রীষ্টানধর্ম্মে দীক্ষিত করেন। তখন তাঁহার নাম হয় দোম আন্তোনিও (Dom Antonio)। এই গ্রন্থে একজন ব্রাহ্মণ ও রোমান ক্যাথলিক খ্রীষ্টানের মধ্যে কথাবার্তার অবতারণা করিয়া তিনি খ্ৰীষ্টধর্ম্মের মহিমা কীর্তন করিয়াছেন। ইহার ভাষার একটু নমুনা দিতেছি।
“রামের এক স্ত্রী তাহান নাম সীতা, আর দুই পুত্রো লব আর কুশ তাহান ভাই লকোন। রাজা অযোধ্যা বাপের সত্যো পালিতে বোনবাসী হইয়াছিলেন, তাহাতে তাহান স্ত্রীরে রাবোণে ধরিয়া লিয়াছিলেন, তাহান নাম সীতা, সেই স্ত্রীরে লঙ্কাত থাকা আনিতে বিস্তর যুৰ্দো করিলেন।”
আর একখানি মিশনারী গ্রন্থ ‘কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ’। মনোএল-দা-আস-সূম্পসাঁম (Manoel Da Assumpcam) নামক এক পর্তুগীজ পাদ্রী ১৭৩৪ সালে ঢাকার নিকটবর্তী ভাওয়ালে বসিয়া এই গ্রন্থ রচনা করেন। ইহার ভাষার একটু নমুনা দিতেছি।
“লুসিয়া এত দুঃখের মধ্যে একলা হইয়া রোদন করিয়া ঠাকুরাণীর অনুগ্রহ চাহিল : কহিল : ও করুণাময়ী মাতা, আমার ভরসা তুমি কেবল; মুনিষ্যের অলক্ষ্য আছি আমি; তথাচ আশা রাখি যে তুমি আমারে উপায় দিবা। আমার কেহ নাহি, কেবল তুমি আমার, এবং আমি তোমার; আমি তোমার দাসী; তুমি আমার সহায়, আমার লক্ষ্য আমার ভরসা। তোমার আশ্রয়ে বিস্তর পাপী অধমে, যেমত আমি, উপায় পাইল। তবে এত অধমেরে যদি উপায় দিলা, আমারেও উপায় দিবা। ইহা নিবেদন করিল।”
এই দুই গ্রন্থের ভাষার গুণাগুণ বিচার করিবার পূর্বে স্মরণ রাখিতে হইবে যে এগুলি বাংলা-কিন্তু রোমান হরফে লেখা। সুতরাং ‘লক্ষ্মণ’-এর পরিবর্তে লকোন, ‘যুদ্ধ’-র পরিবর্তে যুদো প্রভৃতি ভুল নহে, মূলে হয়ত শুদ্ধই ছিল।
মোটের উপর এই দুই গ্রন্থ হইতেও প্রমাণিত হয় যে সপ্তদশ শতকের শেষ ও অষ্টাদশ শতকের প্রথমে এবং সম্ভবত ইহার পূর্বেই বাংলা গদ্যভাষার যে একটি সরল প্রাঞ্জল রূপ ছিল তাহা সর্বাংশে সাহিত্যের উপযোগী। দেশীয় প্রবীণ সাহিত্যিকরা ইচ্ছা করিলে গদ্যে উৎকৃষ্ট রচনা করিতে পারিতেন। কিন্তু যে কোন কারণেই হউক তাঁহারা কবিতায় লেখা পছন্দ করিতেন। সম্ভবত পাঁচালী প্রভৃতি গানের মধ্য দিয়া কাব্য জনপ্রিয় হইয়াছিল-সহজ কথাবার্তার ভাষায় সাহিত্য রচনার সে যুগে আর হয় নাই। যাহাই হউক, উল্লিখিত দুইখানি মিশনারী গ্রন্থের জন্য বাংলা সাহিত্য পর্তুগীজদের নিকট ঋণী। পাদ্রী মনোএলের আরও একখানি গ্রন্থ পাওয়া গিয়াছে। ইহার প্রথমভাগে বাংলা ব্যাকরণের মূল সূত্র ব্যাখ্যা করা হইয়াছে এবং দ্বিতীয় ভাগে বাংলা-পর্তুগীজ ও পর্তুগীজ-বাংলা শব্দকোষ প্রদত্ত হইয়াছে। এই তিনখানি গ্রন্থই বাংলাভাষার সর্বপ্রাচীন মুদ্রিত গ্রন্থের সম্মান দাবি করিতে পারে। পর্তুগীজদের নিকট আমাদের ঋণ আরও আছে। ভারতে তাহারাই প্রথমে মুদ্রণ-যন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে-গোয়া শহরে ১৫৫৬ খ্রীষ্টাব্দে। পর্তুগীজরা যে এদেশে নূতন নূতন ফল ফুল আমদানি করিয়াছিল তাহা দ্বাদশ পরিচ্ছেদে বলা হইয়াছে। সাধারণ ব্যবহারের অনেক দ্রব্যও বাংলাভাষায় পর্তুগীজ নামে পরিচিত–যেমন ছবি, ফিতা, আলমারি, চাবি, বোতাম, বোতল, পিস্তল, বয়াম, বয়া, মাস্তুল, বালতী, পেরেক, সাবান, তোয়ালে, আলপিন ইত্যাদি। ইস্ত্রি, আয়া, মিস্ত্রী, নিলাম, দরজা, জানালা, গরাদে, কামরা, কেদারা, মেজ প্রভৃতি শব্দও পর্তুগীজ।
আরবী ও ফার্সীভাষার বহু শব্দ যে বাংলাভাষায় গৃহীত হইয়াছে তাহাতে আশ্চর্য বোধ করিবার কিছু নাই, কারণ ফার্সী ছিল মধ্যযুগে দরবারের ভাষা ও সম্ভ্রান্ত মুসলমানগণের কথ্য ভাষা। সুতরাং বিভিন্ন প্রাদেশিক হিন্দুভাষায়ও তাঁহার বহু শব্দ স্থায়ী আসন লাভ করিয়াছে। অষ্টাদশ শতাব্দী ও তাঁহার পরে অনেক ইংরেজী শব্দও বাংলাভাষার অন্তর্ভুক্ত হইয়াছে। এইভাবে মধ্যযুগে বাংলাভাষা বিদেশীভাষার সাহায্যে সমৃদ্ধিলাভ করিয়াছে।
১৬. শিল্প
ষোড়শ পরিচ্ছেদ – শিল্প
[এই পরিচ্ছেদে নিম্নলিখিত পরিভাষা ব্যবহৃত হইয়াছে : অট্টালক (Tower); অধিষ্ঠান (Basement); অর্ধচিত্র Bas-relief); অলিন্দ (Corridor) কক্ষ (Bay); কুড্যস্তম্ভ (Pilaster); google (Niche); cpogettent saptamattani (Nave and Aisle); usipo পলকাটা (Cusp); পরট (Parapet); পলকাটা (Flueted); বলভি (Turret);
এই অধ্যায় প্রধানত আহম্মদ হাসান দানি প্রণীত “Muslim Architecture in Bengal মনোমোহন চক্রবর্তী লিখিত Bengali Temples and their characteristices’ নামক প্রবন্ধ এবং শ্রীঅমিয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীত ‘বাঁকুড়ার মন্দির’ অবলম্বনে রচিত হইয়াছে।]
