.
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদের পরিশিষ্ট
প্রাচীন বাংলা গদ্য
মধ্যযুগে বাংলার পদ্য সাহিত্যের যথেষ্ট উন্নতি হইলেও গদ্য সাহিত্যের বিশেষ কোন পরিচয় পাওয়া যায় না। অবশ্য নানা বৈষয়িক ব্যাপারে গদ্য লেখা প্রচলিত ছিল এবং লোকে চিরকাল গদ্যেই কথাবার্তা বলিত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে সাহিত্যের পর্যায়ে পড়ে মধ্যযুগের এমন কোন বাংলা গদ্য রচনা এখনও আবিষ্কৃত হয় নাই। গদ্যে লেখা যাহা কিছু পাওয়া গিয়াছে তাহা নিম্নলিখিত কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়।
(ক) সংস্কৃত সূত্রের ন্যায় কতকগুলি ছোট ছোট বাক্য–অনেকগুলিই দুর্বোধ্য প্রহেলিকার মত মনে হয়। দৃষ্টান্ত :
“পশ্চিম দুয়ারে কে পণ্ডিত–সেতাই জে
চারিসত্ৰ গতি আনি লেখ্যা।”
“হে কালিন্দিজল বার ভাই বার আদিত্ত।
হথে পাতি লহ সেবকর অর্ঘ পুষ্পপাণি। সেবক হব সুখি আমনি ধীমাৎ কন্নি”।
এ দুইটি শূন্য পুরাণ হইতে উদ্ধৃত। কেহ কেহ বলেন এই গ্রন্থ ত্রয়োদশ শতকে রচিত হইয়াছিল। কিন্তু অনেকের মতে ইহার রচনা কাল অষ্টাদশ শতকের পূর্বে নহে।
(খ) শ্রীচৈতন্যদেবের প্রিয় ভক্ত রূপ গোস্বামী বিরচিত কারিকা’ বলিয়া কথিত গ্রন্থ। রূপ গোস্বামী ষোড়শ শতাব্দীর লোক–কিন্তু তিনিই ইহার রচয়িতা কিনা সে বিষয়ে অনেকে সন্দেহ করেন। ইহার ভাষার নমুনা : “আগে তারে সেবা। তার ইঙ্গিতে তৎপর হইয়া কার্য করিবে। আপনাকে সাধক অভিমান ত্যাগ করিবে।”
(গ) সপ্তদশ শতাব্দীর রচনা “জ্ঞানাদি সাধনা” একখানি সহজিয়া সম্প্রদায়ের গ্রন্থ। ইহাতে জীবের জন্ম সম্বন্ধে বিস্তৃত বিবরণ আছে। দীনেশচন্দ্র সেন ১৭৫০ খ্রীষ্টাব্দে লিখিত ইহার একখানি পুঁথি হইতে যে অংশ উদ্ধৃত করিয়াছেন তাঁহার ভাষার নমুনা :
“পরে সেই সাধু কৃপা করিয়া সেই অজ্ঞান জনকে চৈতন্য করিয়া তাঁহার শরীরের মধ্যে জীবাত্মাকে প্রত্যক্ষ দেখাইয়া পরে তাঁহার বাম কর্ণেতে শ্রীচৈতন্য মন্ত্র কহিয়া পরে সেই চৈতন্য মন্ত্রের অর্থ জানাইয়া পরে সেই জীব দ্বারা দশ ইন্দ্রিয় আদি যুক্ত নিত্য শরীর দেখাইয়া পরে সাধক অভিমানে শ্রীকৃষ্ণাদির রূপ আরোপ চিন্তাতে দেখাইয়া পরে সিদ্ধি অভিমান শ্রীকৃষ্ণাদির মুক্তি পৃথক দেখাইয়া প্রেম লক্ষণার সমাধি ভক্তিতে সংস্থাপন করিলেন।” দীনেশচন্দ্রের মতে ইহা সম্ভবত সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগে রচিত। [বঙ্গ-সাহিত্য পরিচয় দ্বিতীয় খণ্ড, ১৬৩০-৩৭ পৃ.]
(ঘ) অষ্টাদশ শতাব্দীর রচনা
অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে কোচবিহারের রাজমুন্সী জয়নাথ ঘোষের ‘রাজোপাখ্যান’ গ্রন্থের ভাষার নমুনা :
“শ্রীশ্রীমহারাজা ভূপ বাহাদুরের বাল্যকাল অতীত হইয়া কিশোরকাল হইবাই, পার্শী বাঙ্গলাতে স্বচ্ছন্দ আর খোশখত অক্ষর হইল সকলেই দেখিয়া ব্যাখ্যা করেন বরং পার্শীতে এমত খোঝনবিস লিখক সন্নিকট নাহি চিত্রেতে অদ্বিতীয় লোক সকলের এবং পশু পক্ষী বৃক্ষ লতা পুষ্প তৎস্বরূপ চিত্র করিতেন অশ্বারোহণে ও গজচালানে অদ্বিতীয়।” [বঙ্গ-সাহিত্য পরিচয় দ্বিতীয় খণ্ড, ১৬৭৮ পৃ.]
১৭৭৫ খ্রীষ্টাব্দে লিখিত ‘ভাষা-পরিচ্ছেদ’ নামক সংস্কৃত গ্রন্থের অনুবাদ : “গৌতম মুনিকে শিষ্য সকলে জিজ্ঞাসা করিলেন আমাদিগের মুক্তি কি প্রকারে হয় তাহা কৃপা করিয়া বলহ। তাহাতে গৌতম উত্তর করিতেছেন তাবৎ পদার্থ জানিলে মুক্তি হয়।”
ইহার ভাষা প্রাঞ্জল এবং ইহা গদ্যরীতির সূচনা বলিয়া গ্রহণ করা যায়।
প্রায় সমসাময়িক ‘বৃন্দাবনলীলা’ গ্রন্থে গদ্য ভাষা আরও একটু উৎকর্ষ লাভ করিয়াছে :
(কৃষ্ণচন্দ্র) “যে দিবস ধেনু লইয়া এই পর্বতে গিয়াছিলেন সে দিবস মুরলির গানে যমুনা উজান বহিয়াছিলেন এবং পাষাণ গলিয়াছিলেন।”
নদীয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের একখানি দানপত্র পাওয়া গিয়াছে। [ইহার তারিখ ১১৬৫ সন ৪ ফাল্গুন। (সাহিত্যসাধক চরিতমালা নবম খণ্ড)]
হরপ্রসাদ শাস্ত্রী অষ্টাদশ শতাব্দীতে লিখিত ‘স্মৃতি কল্পদ্রুম’ নামে একখানি বাংলা গদ্য গ্রন্থের উল্লেখ করিয়াছেন। [শ্রীচণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবনচরিত ৪র্থ সংস্করণ ১১৮-১৯ পৃষ্ঠা]
(ঙ) চিঠিপত্রের ভাষা
ইহা ষোড়শ শতাব্দীতেই অনেকটা উন্নত হইযাছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ ১৫৫৫ খ্রীষ্টাব্দে অহোম রাজ্যের রাজাকে লিখিত কোচবিহার মহারাজার পত্র হইতে কিয়দংশ উদ্ধৃত করিতেছি।
“এথা আমার কুশল। তোমার কুশল নিরন্তরে বাঞ্ছা করি। অখন তোমার আমার সন্তোষ সম্পাদক পত্রপত্রি গতায়াত হইলে উভয়ানুকূল প্রীতির বীজ অঙ্কুরিত হইতে রহে।”
১৬৮২ খ্রীষ্টাব্দে লিখিত আর একটি পত্র হইতে কিছু অংশ উদ্ধৃত করিতেছি, “কএক দিবস হইল তথাকার মঙ্গলাদি পাই নাই। মঙ্গলাদি লিখিয়া আপ্যায়িত করিবেন… মহাশয় আমার কত্তা আমি ছাওল আমার দোষসকল আপনকার মাপ করিতে হয়।”
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে (১৭৭১ ও ১৭৭২ খ্রীষ্টাব্দ) লিখিত মহারাজা নন্দকুমারের দুইখানি সুদীর্ঘ পত্র পাওয়া গিয়াছে। ইহাতে কিছু ফারসী শব্দ ব্যবহৃত হইয়াছে, কিন্তু মোটের উপর প্রাঞ্জল গদ্য ভাষা। শ্রীযুক্ত পঞ্চানন মণ্ডল সম্পাদিত ‘চিঠিপত্রে সমাজ চিত্র’ নামক পত্ৰসঙ্কলনে অষ্টাদশ শতাব্দীর অনেক চিঠি আছে। এইগুলি হইতে দেখা যায় যে তখন বাংলা গদ্য লিখিবার একটি রীতি ধীরে ধীরে গড়িয়া উঠিতেছে।
