রামপ্রসাদের রচনাবলীর মধ্যে দেবীবিষয়ক গানগুলিই সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। আধুনিক কালে এই গানগুলিকে ‘শাক্ত পদাবলী’ নাম দেওয়া হইয়াছে। দেবীবিষয়ক গানগুলি দুইভাগে বিভক্ত–(১) বাৎসল্যরসাত্মক, (২) ভক্তিরসাত্মক। বাৎসল্যরসাত্মক গানগুলিতে শক্তিদেবী হিমালয় ও মেনকার কন্যা হইয়া দেখা দিয়াছেন এবং তাঁহার বাল্যলীলা, আগমনী ও বিজয়া এই গানগুলির মধ্যে বর্ণিত হইয়াছে। এই গানগুলি অপূর্ব সুধানির্যাসে ভরপুর। মেনকার মাতৃহৃদয়ের স্নেহ ও ব্যাকুলতা গানগুলিতে যেরূপ মর্মস্পর্শীভাবে প্রকাশিত হইয়াছে, তাঁহার তুলনা বিরল। আগমনী-গানে তিন দিনের জন্য উমার পিতৃগৃহে আগমনে মেনকার অপার আনন্দ বর্ণিত হইয়াছে এবং বিজয়া-গানে তিন দিনের অবসানে উমার বিদায়ে মেনকার বেদনা বর্ণিত হইয়াছে। তখনকার দিনে বাঙালী পিতামাতারা নববিবাহিতা বালিকা কন্যাদের পিতৃগৃহে আগমন ও শ্বশুরালয়ে প্রত্যাবর্তনের সময়ে ঠিক এইরূপ আনন্দ ও বেদনা অনুভব করিত। তাঁহারই প্রতিধ্বনি আগমনী ও বিজয়া গানগুলির মধ্যে শোনা যায়। রামপ্রসাদই এই অপূর্ব বাৎসল্যরসাত্মক গানের আদি রচয়িতা এবং তিনিই ইহাদের শ্রেষ্ঠ রচয়িতা।
রামপ্রসাদের ভক্তিরসাত্মক দেবীবিষয়ক গানগুলিতে শক্তিদেবী কালীর রূপে দেখা দিয়াছেন। এই গানগুলির মধ্য দিয়া ভক্ত কবি-সন্তান যেমন জননীকে ভালোবাসা জানায়, তেমনিভাবেই দেবীকে মাতৃরূপে কল্পনা করিয়া তাঁহার ভালোবাসা জানাইয়াছেন। এইরূপ অনাবিল অকৃত্রিম ভালোবাসার মধ্য দিয়া আরাধ্যের প্রতি ভক্তি-নিবেদন বাংলা সাহিত্যে অত্যন্ত দুর্লভ। বৈষ্ণব পদাবলীর রাধার মধ্যেও অবশ্য আমরা ভালোবাসার ভিতর দিয়া পূজারই নিদর্শন পাই, কিন্তু সে প্রেম কান্তাপ্রেম,–শুধু তাহাই নয়, পরকীয়া প্রেম। এই কারণের জন্য এবং সে প্রেম সামাজিক বিধিনিষেধের দ্বারা বারিত বলিয়া তাঁহার আবেদন ততটা ব্যাপক নহে। কিন্তু রামপ্রসাদের গানের মধ্যে যে ভাব অভিব্যক্ত হইয়াছে, তাহা যেমনই পবিত্র, তেমনই মধুর। তাঁহার আবেদন সর্বসাধারণের মধ্যেই পরিব্যাপ্ত। কতকগুলি গানে রামপ্রসাদ অবোধ শিশুর মত তাঁহার শ্যামা-মাতার কাছে আবদার করিয়াছেন, এমনকি কোন কোন গানে তিনি শ্যামা-মাতাকে ভর্ৎসনা ও গঞ্জনা পর্যন্ত করিয়াছেন। ইহাতে তাঁহার অন্তরের সরলতা ও ভক্তির অকপটতার অত্যন্ত মধুর নিদর্শন পাই। রামপ্রসাদের গানগুলির মধ্যে অত্যন্ত গভীর ভাব একান্ত অবলীলাক্রমে বর্ণিত হইয়াছে। এই গানগুলির ভাষা অত্যন্ত সরল ও প্রাঞ্জল। ইহাদের মধ্যে রামপ্রসাদ আমাদের পরিচিত লৌকিক জীবন হইতে উপমা সংগ্রহ করিয়া তদ্বারা ভাব পরিস্ফুট করিয়াছেন, এমনকি নিতান্ত জটিল দার্শনিক তত্ত্বকেও এই সব উপমার মধ্য দিয়াই তিনি রূপায়িত করিয়াছেন। ভক্তির প্রগাঢ়তা, ভাবের মাধুর্য ও অকপটতা এবং প্রকাশভঙ্গীর সরলতার জন্য রামপ্রসাদের এই গানগুলি সর্বজনপ্রিয় হইয়াছিল; এই সমস্ত গুণের জন্যই এগুলি এখনও আমাদের মুগ্ধ করে।
দেবীবিষয়ক গান ছাড়া রামপ্রসাদ কয়েকখানি গ্রন্থও রচনা করিয়াছিলেন। তাঁহার প্রথম গ্রন্থ সম্ভবত ‘কালীকীর্তন’; ইহা রাজকিশোর নামে একজন ধনী ব্যক্তির আজ্ঞায় রচিত হইয়াছিল; বইটির মধ্যে অনেক মধুর পদ রহিয়াছে; তবে ইহার একটি ত্রুটি এই যে, ইহার মধ্যে কালীর লীলাকে কৃষ্ণলীলার ছাঁচে ঢালিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে এবং কৃষ্ণের মত কালীরও গোষ্ঠলীলা, রাসলীলা প্রভৃতি বর্ণিত হইয়াছে; রামপ্রসাদের এই অভিনব প্রচেষ্টকে তাঁহার গানের প্যারডি-রচয়িতা আজু গোঁসাই ব্যঙ্গ করিয়া কাঁঠালের ‘আমসত্ত্ব’ বলিয়াছিলেন। রামপ্রসাদ ‘কৃষ্ণকীর্তন’ নামেও একটি কাব্য লিখিয়াছিলেন, তাঁহার মধ্যে তিনি কৃষ্ণলীলা বর্ণনা করিয়াছিলেন; ইহার একটি মাত্র পদ পাওয়া গিয়াছে। রামপ্রসাদ শাক্ত হইলেও বৈষ্ণবদের প্রতি যে তাঁহার কোন বিদ্বেষ ছিল না, তাঁহার প্রমাণ তাঁহার ‘কৃষ্ণকীর্তন’ রচনা এবং কৃষ্ণ ও কালীর অভিন্নতা ঘোষণা করিয়া গান লেখা হইতে পাওয়া যায়। রামপ্রসাদের অপর গ্রন্থ ‘কালিকামঙ্গল’ বা ‘বিদ্যাসুন্দর’ বা
কবিরঞ্জন। কেহ কেহ মনে করেন ইহা ভারতচন্দ্রের ‘বিদ্যাসুন্দর’-এর পূর্বে রচিত হইয়াছিল, কিন্তু বিভিন্ন আভ্যন্তরীণ ও বহিরঙ্গ প্রমাণ হইতে বলা যায় যে রামপ্রসাদের ‘বিদ্যাসুন্দর’ ভারতচন্দ্রের মৃত্যুরও পরে রচিত হইয়াছিল। কাব্য হিসাবে রামপ্রসাদের ‘বিদ্যাসুন্দর’ ভারতচন্দ্রের ‘বিদ্যাসুন্দর’-এর তুলনায় নিকৃষ্ট; ইহার মধ্যে অশ্লীলতাও ভারতচন্দ্রের ‘বিদ্যাসুন্দর’-এর তুলনায় বেশি; কিন্তু রামপ্রসাদের ‘বিদ্যাসুন্দর’-এর একটি গুণ এই যে, ইহার প্রত্যেকটি চরিত্র জীবন্ত হইয়াছে। ইহার মধ্যে কয়েকটি কৌতুকরসাত্মক বর্ণনায়ও রামপ্রসাদ দক্ষতা দেখাইয়াছেন, যেমন ভণ্ড সন্ন্যাসীদের বর্ণনা।
রামপ্রসাদের পরে আরও অনেক কবি তাঁহাকে অনুসরণ করিয়া দেবীবিষয়ক গান রচনা করেন। ইঁহাদের মধ্যে সর্বাগ্রে যাহার নাম উল্লেখযোগ্য, তিনি হইতেছেন বর্ধমানের মহারাজা তেজচন্দ্রের সভাকবি এবং ‘সাধকরঞ্জন’ নামক তান্ত্রিক যোগ নিবন্ধের রচয়িতা কমলাকান্ত ভট্টাচার্য। উঁহার রচিত শ্যামাসঙ্গীতগুলির মধ্যে রামপ্রসাদের গানেরই মত ভক্তির প্রগাঢ়তা, ভাবের গভীরতা ও প্রকাশভঙ্গীর সরলতার নিদর্শন মিলে। অন্যান্য শ্যামাসঙ্গীত-রচয়িতাদের মধ্যে যুগল ব্রাহ্মণ, রামানন্দ, ভৃগুরাম দাস, দ্বিজ নরচন্দ্র প্রভৃতির নাম উল্লেখযোগ্য। রামপ্রসাদ সেন ছাড়া রামপ্রসাদ নামক অন্যান্য শ্যামাসঙ্গীত-রচয়িতাও আবির্ভূত হইয়াছিলেন এবং তাঁহাদের মধ্যে দ্বিজ রামপ্রসাদ’ নামক একজন ব্রাহ্মণ কবি ছিলেন। আগমনী বিজয়া গান রচনায় রামপ্রসাদের পরে সর্বাপেক্ষা দক্ষতা দেখাইয়াছেন কবিওয়ালা রাম বসু। মোটের উপর রামপ্রসাদ রচিত ভক্তিরসাত্মক ও বাৎসল্যরসাত্মক দেবীবিষয়ক গানগুলির অনুসরণে বাংলায় একটি সুবিশাল ও সমৃদ্ধ গীতি-সাহিত্য গড়িয়া উঠিয়াছিল। এই সাহিত্যের ধারা সমগ্র ঊনবিংশ শতাব্দী ধরিয়া অপ্রতিহত গতিতে প্রবাহিত হইবার পরে বিংশ শতাব্দীতে উপনীত হইয়াও প্রাণবন্ত রহিয়াছে।
