অন্নদামঙ্গলই ভারতচন্দ্রের রচিত শ্রেষ্ঠ কাব্য। ১৬৬৪ শকাব্দে (১৭৪২-৪৩ খ্রষ্টাব্দ) বাংলার নবাব আলীবর্দী রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে বার লক্ষ টাকা নজরানা চান এবং কৃষ্ণচন্দ্র তাহা না দিতে পারায় তাঁহাকে বন্দী করেন। কারাগারে দেবী অন্নপূর্ণা তাঁহাকে স্বপ্নে দেখা দিয়া বলেন যে তিনি যেন তাঁহার সভাকবি ভারতচন্দ্রকে তাঁহার মাহাত্মবর্ণনামূলক কাব্য রচনা করিতে বলেন। মুক্ত হইয়া রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ভারতচন্দ্রকে ঐ কাব্য রচনা করিতে বলেন এবং তদনুসারে ভারতচন্দ্র ‘অন্নদামঙ্গল’ লেখেন; ১৬৭৪ শকাব্দে (১৭৫২-৫৩ খ্রীষ্টাব্দ) এই কাব্য সম্পূর্ণ হয়। এই কাব্য তিনটি খণ্ডে বিভক্ত; প্রথম খণ্ডে কৃষ্ণচন্দ্রের বিপন্মুক্তি অবলম্বনে অন্নদার মাহাত্ম্য বর্ণনা, কাব্য রচনার উপলক্ষ বর্ণনা, শিবের উপাখ্যান বর্ণনা এবং কৃষ্ণচন্দ্রের পূর্বপুরুষ ভবানন্দ মজুমদারের বাসভবনে অন্নদার আগমনের বর্ণনা লিপিবদ্ধ হইয়াছে। দ্বিতীয় খণ্ডে পাই ‘কালিকামঙ্গল অর্থাৎ ‘বিদ্যাসুন্দর উপাখ্যান। তৃতীয় খণ্ডের নাম ‘মানসিংহ’। ইহাতে ভবানন্দ মজুমদারের ইতিহাস, মানসিংহ কর্ত্তৃক প্রতাপাদিত্যকে পরাজিত করার কাহিনী এবং অন্নদার মহিমা বর্ণিত হইয়াছে। প্রথম খণ্ডটি অত্যন্ত সরস; এই খণ্ডে শিব, অন্নপূর্ণা, নারদ, মেনকা প্রভৃতি দেবচরিত্রগুলিও মানবতাগুণে মণ্ডিত হইয়াছে; মানবচরিত্রগুলির মধ্যে ঈশ্বরী পাটনী জীবন্ত ও উপভোগ্য। দ্বিতীয় খণ্ডে ‘বিদ্যাসুন্দরের কাহিনী ভারতচন্দ্রের প্রতিভার স্পর্শে অনুপম লাবণ্য লাভ করিয়া রূপায়িত হইয়াছে; ইহার মধ্যে স্থানে স্থানে অশ্লীলতাদোষ থাকিলেও ইহার বর্ণনাভঙ্গীর মনোহারিত্ব সকলকেই মুগ্ধ করে; ভারতচন্দ্রের ‘বিদ্যাসুন্দরে’ বিগতযৌবনা দূতী হীরা মালিনীর দুষ্ট চরিত্রটি যেরূপ জীবন্ত হইয়াছে, তাঁহার তুলনা বিরল। তৃতীয় খণ্ড মানসিংহ বাহ্যত ঐতিহাসিক কাব্য হইলেও আদর্শ ঐতিহাসিক কাব্যের লক্ষণ ইহাতে দেখা যায় না, কারণ ইহাতে বর্ণিত কাহিনীটির মধ্যে তথ্যের সহিত কল্পনার নির্বিচার সংমিশ্রণ হইয়াছে এবং ইতিহাসের পরিবেশ ইহার মধ্যে জীবন্ত হয় নাই; তবে এই খণ্ডটি বেশ সরস ও সুখপাঠ্য; ইহাতে বর্ণিত ঘেসেড়ানী, দাসু, বাসু প্রভৃতি গৌণচরিত্রগুলি বেশ জীবন্ত হইয়াছে। ইহার মধ্যে যুদ্ধের বর্ণনা পাওয়া যায়, তাহা খুবই উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত। ‘অন্নদামঙ্গলে’র ভাষা অত্যন্ত স্বচ্ছ, সাবলীল ও বৈদগ্ধ্যপূর্ণ। ভারতচন্দ্র প্রথম শ্রেণীর হাস্যরসিক ছিলেন এবং শ্লেষ ও যমক সৃষ্টিতে তাঁহার অসামান্য দক্ষতা ছিল। তাঁহার এই বৈশিষ্ট্যগুলির পরিচয় ‘অন্নদামঙ্গলে’ পূর্ণমাত্রায় বর্তমান। ছন্দের ক্ষেত্রেও ভারতচন্দ্র এই কাব্যে অপরূপ নৈপুণ্য প্রদর্শন করিয়াছেন; বহু সংস্কৃত ছন্দকে তিনি এই কাব্যে বাংলা ভাষায় প্রথম প্রয়োগ করিয়াছেন। মোটের উপর, ‘অন্নদামঙ্গলের বহিরাঙ্গিকের লাবণ্য অতুলনীয়। অবশ্য ইহার মধ্যে গভীরতার খানিকটা অভাব লক্ষিত হয়। তবে ইহার মধ্যে যে গানগুলি রহিয়াছে, তাহাদের মধ্যে মাধুর্য ও ভাবগভীরতার নিদর্শন পাই। ‘অন্নদামঙ্গল’ তাঁহার অসামান্য গুণগুলির জন্য শতাধিক বর্ষ ধরিয়া বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় কাব্যের আসন অধিকার করিয়াছিল। ‘অন্নদামঙ্গল’-এর মধ্যে কিয়ৎপরিমাণে আধুনিক যুগের দৃষ্টিভঙ্গী ও চিন্তাভাবনার পূর্বাভাস পাওয়া যায়।
ভারতচন্দ্রের অন্যান্য রচনাগুলি আয়তনে ক্ষুদ্র। তিনি দুইটি ‘সত্যনারায়ণের পাঁচালী’ রচনা করিয়াছিলেন; একটি ত্রিপদী ছন্দে, অপরটি চৌপদী ছন্দে লেখা; দ্বিতীয়টি ১১৪৪ সনে (১৭৩৭-৩৮ খ্রীষ্টাব্দে) রচিত হয়। তাঁহার আর একটি কাব্য ‘রসমঞ্জরী’, ইহা মৈথিল কবি ভানুদত্তের ‘রসমঞ্জরী’ নামক নায়ক-নায়িকার লক্ষণ বর্ণনামূলক গ্রন্থের অনুবাদ; ইহা ১৭৪৯ খ্রীষ্টাব্দের পূর্বে রচিত হইয়াছিল। তাঁহার ‘নাগাষ্টক’ কাব্যে আটটি সংস্কৃত শ্লোক ও তাহাদের বঙ্গানুবাদ রহিয়াছে; দুই একটি শ্লোক দ্ব্যর্থমূলক; এক অর্থে কালীয়নাগের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কালীয়দের জীবজন্তুরা কৃষ্ণের কাছে অভিযোগ জানাইতেছে, দ্বিতীয় অর্থে মূলাজোড় গ্রামের পত্তনিদার রামদেব নাগের (বর্ধমানরাজের কর্মচারী) অত্যাচারের বিরুদ্ধে ভারতচন্দ্র কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে অভিযোগ জানাইতেছেন; এই কাব্যটি পড়িয়া কৃষ্ণচন্দ্র রামদেব নাগের অত্যাচার নিবারণ করিয়াছিলেন। এই বইগুলি ভিন্ন ভারতচন্দ্র সংস্কৃত ভাষায় একটি ‘গঙ্গাষ্টক’ লিখিয়াছিলেন এবং হিন্দী, বাংলা ও সংস্কৃত তিন ভাষা মিলাইয়া ‘চণ্ডী-নাটক’ নামে একটি নাটক লিখিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন; ইহা সম্পূর্ণ হয় নাই। ইহা ব্যতীত ভারতচন্দ্র নিতান্ত লৌকিক বিষয়বস্তু লইয়া ‘বসন্ত বর্ণনা’, ‘বর্ষাবর্ণনা’, ‘বাসনাবর্ণনা’, ‘ধেড়ে ও ভেড়ে’ প্রভৃতি কয়েকটি ছোট বাংলা কবিতা রচনা করিয়াছিলেন; তাঁহার পূর্বে এই জাতীয় কবিতা এদেশে আর কেহ লেখেন নাই।
১৯
রামপ্রসাদ সেন ও তাঁহার অনুবর্তী কবিগোষ্ঠী
রামপ্রসাদ সেন ভারতচন্দ্রের সমসাময়িক এবং তিনিও বাংলার শ্রেষ্ঠ ও জনপ্রিয় কবিদের অন্যতম। রামপ্রসাদ ১৭২০ খ্রীষ্টাব্দের মত সময়ে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাতিতে বৈদ্য। তাঁহার পিতার নাম রামরাম সেন। বর্তমান ২৪ পরগণা জেলার অন্তর্গত হালিসহর-কুমারহট্ট গ্রাম রামপ্রসাদের নিবাসভূমি। অল্প বয়স হইতেই রামপ্রসাদ কবিতা রচনায়, বিশেষত শ্যামাসঙ্গীত রচনায় দক্ষতার পরিচয় দেন। তিনি প্রথম হইতেই তাঁহার ইষ্টদেবী কালীর ভক্ত সাধক, বিষয়-কর্মে তাঁহার তেমন মন ছিল না। তাঁহার রচিত গানগুলি অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলা দেশে জনপ্রিয় হইয়া উঠে এবং তাঁহার প্রতি রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ও অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। কৃষ্ণচন্দ্র রামপ্রসাদকে ‘কবিরঞ্জন’ উপাধি ও অনেক ভূসম্পত্তি দান করেন। তিনি রামপ্রসাদকে ভঁহার সভাকবির পদেও নিয়োগ করিতে চাহেন; বিষয়াসক্তিহীন রামপ্রসাদ তাহাতে সম্মত হন নাই। দীর্ঘকাল সাধনা ও কাব্য রচনার মধ্য দিয়া অতিবাহিত করিবার পরে রামপ্রসাদ ১৭৮১ খ্রীষ্টাব্দের মত সময়ে পরলোকগমন করেন।
