১৭
ময়মনসিংহ-গীতিকা
পূর্ববঙ্গের ময়মনসিংহ জিলার গ্রামাঞ্চলে অনেকগুলি গীতিকা অর্থাৎ কাহিনী বর্ণনাত্মক গাথা লোকমুখে প্রচলিত ছিল। এইগুলিই আধুনিককালে সঙ্কলিত হইয়া কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্ত্তৃক ‘মৈমনসিংহ-গীতিকা’ নামে প্রকাশিত হইয়াছে।
এই গীতিকাগুলি যেভাবে সঙ্কলিত ও প্রকাশিত হইয়াছে, তাঁহার মধ্যে ইহাদের প্রাচীন রূপটি অক্ষুণ্ণ নাই; সংগ্রাহকদের হস্তক্ষেপের ফলে ইহাদের কলেবর অনেকাংশে বর্ধিত হইয়াছে এবং ভাষা আধুনিকতাপ্রাপ্ত হইয়াছে। দুই একটি গীতিকার প্রাচীনতর রূপ অন্য সূত্র হইতে পাওয়া যায়; যেমন মেওয়া (নামান্তর মহুয়া) সুন্দরী ও জয়ানন্দের বিবাহ প্রভৃতি সম্বন্ধীয় গীতিকাগুলি; ইহাদের আদি রচনাকাল অজ্ঞাত। গীতিকাগুলি ‘লোকসাহিত্য’ নহে–কবিদের নিজস্ব সৃষ্টি। কবিদের নামও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জানা যায়।
মোটের উপর, ময়মনসিংহ-গীতিকা প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের গণ্ডীভুক্ত হইতে পারে কিনা সে বিষয়ে কিছু সংশয়ের অবকাশ আছে। তবে গীতিকাগুলি যে সাহিত্যসৃষ্টি হিসাবে খুব উল্লেখযোগ্য তাহাতে কোন সন্দেহ নাই।
এই গীতিকাগুলির অধিকাংশই প্রণয়মূলক। ইহাদের মধ্যে গ্রাম্য প্রেমেরই বর্ণনা পাই, কিন্তু তাহা একটি অপূর্ব রোমান্টিকতায় মণ্ডিত। কাজলরেখা, মেওয়া (মহুয়া), মলুয়া, মদিনা, নীলা, চন্দ্রাবতী প্রভৃতি নায়িকাদের প্রেম যেভাবে কৃচ্ছসাধন ও ত্যাগের মধ্য দিয়া মহিমান্বিত হইয়া ফুটিয়া উঠিয়াছে, তাহা আমাদের মনকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। দুই একটি গীতিকা প্রণয়মূলক নহে, যেমন দস্যু কেনারামের পালা; এই পালাটিতে একজন নরহন্তা দস্যুর ভক্ত ও সুগায়কে পরিণত হওয়ার জীবন্ত চিত্র পাই; এটিও কারুণ্যরসমণ্ডিত ও মর্মস্পর্শী।
এই গীতিকাগুলির মধ্যে পুরাণের প্রভাব খুবই অল্প। প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য শাখা যেমন ধর্ম্মাশ্রিত, এই শাখাঁটি তাঁহার আশ্চর্য ব্যতিক্রম। এই শাখাঁটিতে হিন্দু-সংস্কৃতি ও মুসলিম-সংস্কৃতির সম্মিলনেরও নিদর্শন পাওয়া যায়। হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের নায়কনায়িকার প্রণয়কাহিনীই এই গীতিকাগুলির মধ্যে সমান দক্ষতা ও সহানুভূতির সহিত বর্ণিত হইয়াছে।
ইহাদের মধ্যে ময়মনসিংহ অঞ্চলের পল্লীজীবনের যে আলেখ্য ফুটিয়াছে, তাহাও অপরূপ। এই পল্লীজীবনের পটভূমিতে নায়কনায়িকাদের প্রেম মনোহর বর্ণচ্ছটায় রঞ্জিত হইয়াছে এবং তাঁহার রূপায়ণে একটি নবতর লাবণ্য ফুটিয়া উঠিয়াছে। এই গীতিকাগুলিতে যেন প্রকৃতি ও মানবহৃদয় একাত্ম হইয়া গিয়াছে, কবিরা প্রকৃতিবর্ণনার মধ্য দিয়া আশ্চর্য কৌশলে মানুষের নিগূঢ় হৃদয়রহস্যকে উদ্ঘাটিত করিয়াছেন।
মানুষের নানা অনুভূতি এই গীতিকাগুলির মধ্যে সার্থক অভিব্যক্তি লাভ করিয়াছে। রূপমোহ, অন্তরের আলোড়ন, মিলনের আকুতি, বিরহের জ্বালা এবং বিদায়ের হাহাকার-সমস্ত কিছুকেই কবিরা আশ্চর্য কুশলতার সহিত জীবন্ত করিয়া
তুলিয়াছেন। এই সমস্ত ভাবের বর্ণনায় যেমন তাঁহাদের কবিত্বশক্তির নিদর্শন। মিলে, অপরদিকে তেমনি জীবন সম্বন্ধে তাঁহাদের গভীর ও বিস্তীর্ণ অভিজ্ঞতারও পরিচয় পাওয়া যায়।
এই গীতিকাগুলির ভাষা অমার্জিত ও গ্রাম্য পূর্ববঙ্গীয় কথ্যভাষা। কিন্তু ইহাতেই অপরিসীম কাব্যসৌন্দর্য ফুর্ত হইয়াছে। এই ভাষার মধ্যদিয়া যেন আমরা রূপকথার জগতে উত্তীর্ণ হই। ইহার মধ্যে ব্যবহৃত শব্দ ও বাক্যাংশগুলি যেন রূপকথার মায়াঞ্জনজড়িত; অথচ সেগুলি যেমনই স্বাভাবিক, তেমনই প্রাণবন্ত।
মোটের উপর, ময়মনসিংহ-গীতিকা বাংলা সাহিত্যের সম্পদ বলিয়া গণ্য হইবার যোগ্য। ইহাদের মধ্যে মানুষের হৃদয়ানুভূতি, মানুষের সৌন্দর্য এবং প্রকৃতির সৌন্দর্য এই তিন উপাদানের সমন্বয়ে এক সজীব ব্যঞ্জনাময় কবিত্ব-স্বর্গ রচিত হইয়াছে। এই স্বর্গ যাহারা রচনা করিয়াছিলেন, তাঁহারা যে পণ্ডিত, সংস্কৃতিবান নাগরিক কবিগোষ্ঠী নহেন, সুদূর গ্রামাঞ্চলের অশিক্ষিত কবি-সম্প্রদায়–ইহা ভাবিয়া আমরা বিস্ময় অনুভব করি।
ময়মনসিংহ ব্যতীত পূর্ববঙ্গের অন্য কোন অঞ্চলেও অনেকগুলি গাথার সন্ধান পাওয়া গিয়াছে। ইহাদের অধিকাংশই কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্ত্তৃক প্রকাশিত ‘পূর্ববঙ্গ-গীতিকা’ গ্রন্থে সংকলিত হইয়াছে। কোন কোনটি পূর্বেই মুদ্রিত হইয়াছিল।
এই গীতিকাগুলি ময়মনসিংহ-গীতিকার অন্তর্ভুক্ত গাথাগুলির সমপর্যায়ভুক্ত না হইলেও উপভোগ্য। ইহাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা মনোরম ও জনপ্রিয় গাথা ‘ভেলুয়া সুন্দরী।
১৮
ভারতচন্দ্র রায়
ভারতচন্দ্র প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। শুধু তাহাই নয়, জনপ্রিয়তার দিক দিয়া আঁহার সমকক্ষ কবি এ পর্যন্ত বাংলাদেশে খুব কমই আবির্ভূত হইয়াছেন। ১৭১০ খ্রীষ্টাব্দের মত সময়ে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার আদি নিবাস ছিল বর্তমান হুগলি জেলার অন্তর্গত ভুরশুট পরগণার পাণ্ডুয়া বা পেঁড়ো গ্রামে। ভারতচন্দ্র মুখুজ্জ্যে-বংশীয় ব্রাহ্মণ। তাঁহার বংশ রাজবংশ হইলেও বর্ধমানের মহারাজা কীর্তিচন্দ্ৰ কবির পিতা নরেন্দ্রনারায়ণ রায়ের নিকট হইতে রাজ্য কাড়িয়া লওয়ার ফলে তাহাদের অবস্থা খারাপ হইয়া পড়ে। ভারতচন্দ্রের প্রথম জীবন দুঃখকষ্টেই অতিবাহিত হয়। তাহা সত্ত্বেও তিনি উচ্চশিক্ষা লাভ করেন এবং ব্যাকরণ, অলংকার, পুরাণ, আগম প্রভৃতি শাস্ত্রের বিশারদ হন। বাংলা ও সংস্কৃত ভিন্ন হিন্দী, উড়িয়া ও ফার্সী ভাষাতেও তিনি ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। অল্প বয়স হইতেই তিনি কবিত্বশক্তিরও পরিচয় দেন। প্রথম যৌবনে তিনি ঘটনাচক্রে এক সন্ন্যাসীর দলের সঙ্গে মিশিয়া যান এবং নানা দেশে ভ্রমণ করেন। অবশেষে আত্মীয় ও কুটুম্বদের নিবন্ধে তিনি গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন এবং চন্দননগরের ফরাসী সরকারের দেওয়ান ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর মারফতে নদীয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আশ্রয়লাভ করেন। কৃষ্ণচন্দ্র তাহাকে সভাকবির পদে নিয়োগ করেন; তিনি ভারতচন্দ্রকে ‘রায়গুণাকর’ উপাধিতে ভূষিত করেন এবং অনেক ভূসম্পত্তি দান করিয়া মূলাজোড় গ্রামে স্থিত করান। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রেরই আদেশে ভারতচন্দ্র ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্য রচনা করেন। ১৭৬০ খ্রীষ্টাব্দে ভারতচন্দ্রের মৃত্যু হয়।
