জগন্নাথমঙ্গল–ইহার মধ্যে স্কন্দপুরাণ’ অবলম্বনে জগন্নাথদেবের মাহাত্ম্য বর্ণিত হইয়াছে। ইহার অন্যতম লেখক গদাধর দাস (কাশীরাম দাসের অনুজ)।
সূর্যমঙ্গল–সূর্যদেবতার মাহাত্মবর্ণনামূলক কাব্য সূর্যমঙ্গল’। ইহার রচয়িতাদের মধ্যে রামজীবন ও কালিদাসের নাম উল্লেখযোগ্য।
লক্ষ্মীমঙ্গল–ধনের দেবী লক্ষ্মী বা কমলার মাহাত্মবর্ণনামূলক কাব্য লক্ষ্মীমঙ্গল’। ইহার রচয়িতাদের মধ্যে নিমতার কৃষ্ণরাম দাস, গুণরাজ খান এবং দ্বিজ নরোত্তমের নাম উল্লেখ করা যাইতে পারে। কৃষ্ণরাম দাস মোট পাঁচখানি মঙ্গলকাব্য লিখিয়াছিলেন–কালিকামঙ্গল, ষষ্ঠীমঙ্গল, ‘রায়মঙ্গল, শীতলামঙ্গল ও লক্ষ্মীমঙ্গল।
গঙ্গামঙ্গল–গঙ্গামঙ্গলে গঙ্গাদেবীর মাহাত্ম বর্ণিত। মাধব আচার্য, দ্বিজ গৌরাঙ্গ, জয়রাম দাস, দ্বিজ কমলাকান্ত, শঙ্কর আচার্য প্রভৃতি কবিগণ ‘গঙ্গামঙ্গল রচনা করিয়াছিলেন। দুর্গাপ্রসাদ মুখুজ্জ্যের লেখা ‘গঙ্গাভক্তিতরঙ্গিণী’ও (রচনাকাল অষ্টাদশ শতকের শেষ পাদ) গঙ্গামঙ্গল কাব্যের শ্রেণীভুক্ত; এই কাব্যে কবির শক্তির পরিচয় আছে; ইহার মধ্যে ভারতচন্দ্রের প্রভাব ও অনুকরণ দেখা যায়। এই কাব্যটি এক সময়ে কলিকাত্ৰা অঞ্চলে বহুল প্রচারিত ছিল।
কপিলামঙ্গল–ব্রহ্মার কামধেনু কপিলার অপহরণ ও কপিলার মাহাত্ম্য কপিলামঙ্গল কাব্যে বর্ণিত হইয়াছে। কপিলামঙ্গল’-এর প্রধান রচয়িতা শঙ্কর কবিচন্দ্র, কাশীনাথ ও কেতকাদাস-ক্ষুদিরাম দাস।
গোসানীমঙ্গল–এই কাব্যে উত্তরবঙ্গের এক স্থানীয় দেবতার মাহাত্ম বর্ণিত হইয়াছে। এ পর্যন্ত একটি মাত্র ‘গোসানীমঙ্গল’ পাওয়া গিয়াছে, তাঁহার রচয়িতার নাম রাধাকৃষ্ণ দাস।
বরদামঙ্গল–ইহার মধ্যে ত্রিপুরার বরদাখাত পরগণার অধিষ্ঠাত্রী দেবী বরদেশ্বরীর মাহাত্ম বর্ণিত হইয়াছে। এ পর্যন্ত কেবলমাত্র নন্দকিশোর শর্মার লেখা একখানি বরদামঙ্গল’ পাওয়া গিয়াছে।
১৬
ঐতিহাসিক কাব্য
আধুনিক-পূর্ব যুগে হিন্দুরা ইতিহাসবিমুখ ছিলেন। বাংলা দেশে আবার হিন্দু মুসলমান সকলেরই মধ্যে ইতিহাস সম্বন্ধে একটা নিস্পৃহতার ভাব ছিল। এইজন্য মুসলিম যুগের বাংলা দেশ সম্বন্ধে কোন প্রামাণিক ইতিহাস-গ্রন্থ রচিত হয় নাই বলিলেই চলে। এই যুগের বাংলা সাহিত্যেও তাই ঐতিহাসিক রচনা একান্ত দুর্লভ।
কেবলমাত্র ত্রিপুরায় বাংলা ভাষায় কয়েকটি ঐতিহাসিক গ্রন্থ রচিত হইয়াছিল। ইহাদের মধ্যে সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য ‘রাজমালা’; এই গ্রন্থে আদিকাল হইতে শুরু করিয়া অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত ত্রিপুরা রাজ্যের ধারাবাহিক ও বিশদ ইতিহাস লিপিবদ্ধ হইয়াছে। বইটি চারি খণ্ডে বিভক্ত; প্রথম খণ্ড পঞ্চদশ শতকে ধর্মমাণিক্যের রাজত্বকালে, দ্বিতীয় খণ্ড ষোড়শ শতকে অমরমাণিক্যের রাজত্বকালে, তৃতীয় খণ্ড সপ্তদশ শতকে গোবিন্দমাণিক্যের রাজত্বকালে এবং চতুর্থ খণ্ড অষ্টাদশ শতকে কৃষ্ণমাণিক্যের রাজত্বকালে রচিত হইয়াছিল। ‘রাজমালাতে স্থানে স্থানে অলৌকিক উপাদান ও একদেশদর্শিতা-দোষ থাকিলেও মোটের উপর বইটির মধ্যে প্রামাণিক বিবরণই লিপিবদ্ধ হইয়াছে। ঊনবিংশ শতকের প্রথমে দুর্গামণি উজীর নামে ত্রিপুরার একজন রাজকর্মচারী ‘রাজমালা’র স্বেচ্ছানুযায়ী পরিবর্তন সাধন করেন, সেই পরিবর্তিত রূপটিই পরে মুদ্রিত হইয়াছে। এই মুদ্রিত সংস্করণটির তুলনায় দুর্গামণি উজীরের আবির্ভাবের পূর্বে লিপিকৃত পুঁথিগুলি অধিকতর নির্ভরযোগ্য। ‘রাজমালা ব্যতীত ত্রিপুরায় রচিত ‘চম্পকবিজয়’, ‘কৃষ্ণমালা’ ও ‘বরদামঙ্গল’ প্রভৃতি ঐতিহাসিক গ্রন্থগুলিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ‘চম্পকবিজয়’ গ্রন্থে ত্রিপুরারাজ দ্বিতীয় রত্নমাণিক্যের রাজত্বকালে (১৬৮৫-১৭১০ খ্রীষ্টাব্দ) নরেন্দ্রমাণিক্যের বিদ্রোহ এবং রত্নমাণিক্যের সাময়িক রাজ্যচ্যুতি ও বিশ্বস্ত সেনাপতি চম্পক রায়ের সহায়তায় রাজ্য পুনরুদ্ধার বর্ণিত হইয়াছে। ‘কৃষ্ণমালা’য় ত্রিপুরারাজ কৃষ্ণমাণিক্যের (রাজত্বকাল ১৭৬০-৮৩ খ্রীষ্টাব্দ) জীবনেতিহাস বর্ণিত হইয়াছে। ‘বরদামঙ্গল’ গ্রন্থ বাহ্যত বরদেশ্বরী দেবীর মাহাত্মবর্ণনামূলক মঙ্গলকাব্য হইলেও ইহার মধ্যে ত্রিপুরার অন্যতম পরগণা বরদাখাতের ইতিহাস বিশদভাবে বর্ণিত হইয়াছে।
অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে রচিত ‘মহারাষ্ট্রপুরাণ’ নামক গ্রন্থটিকেও ঐতিহাসিক সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত করা যাইতে পারে। ইহার লেখকের নাম গঙ্গারাম। ইহার ‘ভাস্কর-পরাভব’ নামক প্রথম কাণ্ডটি পাওয়া গিয়াছে, অন্যান্য কাণ্ড রচিত হইয়াছিল কিনা জানা যায় না। অষ্টাদশ শতকের পঞ্চম দশকে বর্গীদের পশ্চিমবঙ্গ আক্রমণ ও লুণ্ঠন, নবাব আলীবর্দীর সাময়িক পরাজয়, অবশেষে জনসাধারণের বিরোধিতায় বর্গী-সেনাপতি ভাস্করের পরাভব এবং আলীবর্দীর চক্রান্তে ভাস্করের নিধন এই গ্রন্থে বর্ণিত হইয়াছে; ইহার মধ্যে লেখকের প্রত্যক্ষদৃষ্ট ‘বর্গীয় হাঙ্গামা’র জীবন্ত ও উজ্জ্বল বর্ণনা পাওয়া যায়; এই। গ্রন্থের রচনাকাল ১১৫৮ বঙ্গাব্দ (১৭৫১-৫২ খ্রীষ্টাব্দ)।
অষ্টাদশ শতকের তৃতীয় পদে বিজয়রাম নামক জনৈক বৈদ্যজাতীয় লেখক ‘তীর্থমঙ্গল’ নামে একখানি ভ্রমণকাহিনী রচনা করিয়াছিলেন। খিদিরপুরের কৃষ্ণচন্দ্র ঘোষাল নামে একজন ধনী ব্যক্তি নৌকাযোগে নবদ্বীপ, হাঁড়রা, ঝিনুকঘাটা, টুঙ্গীবালী, জলঙ্গী, রাজমহল, মুঙ্গের, গয়া, রামনগর, কাশী, প্রয়াগ, বিন্ধ্যগিরি প্রভৃতি স্থানে ভ্রমণ ও তীর্থদর্শন করিয়াছিলেন; বিজয়রামও তাঁহার দলের সহিত গিয়াছিলেন। এই ভ্রমণের অভিজ্ঞতাই গ্রন্থটিতে বর্ণিত। ১৭৭০ খ্রীষ্টাব্দে কৃষ্ণচন্দ্র দেশে ফিরেন এবং তাঁহার কিছু পরে ‘তীর্থমঙ্গল’ রচিত হয়। বইখানির যথেষ্ট ঐতিহাসিক মূল্য আছে।
