যাহাদের লেখা ‘কালিকামঙ্গল’ বা ‘বিদ্যাসুন্দর’ কাব্য পাওয়া গিয়াছে, তাহাদের মধ্যে সময়ের দিক দিয়া সর্বাপেক্ষা প্রাচীন দ্বিজ শ্রীধর কবিরাজ। ইনি নসরৎ শাহের রাজত্বকালে (১৫১৯-৩২ খ্রীষ্টাব্দ) তাঁহার পুত্র ফিরোজ শাহের পৃষ্ঠপোষণ ও আদেশ লাভ করিয়া এই বইটি লিখিয়াছিলেন; ইহার একটি খণ্ডিত পুঁথি পাওয়া গিয়াছে। সাবিরিদ খান নামক একজন মুসলমান কবির লেখা একটি ‘বিদ্যাসুন্দর’ কাব্যেরও খণ্ডিত পুঁথি পাওয়া গিয়াছে; ইহার ভাষা বেশ প্রাচীন; কাব্যটি শ্রীধর কবিরাজের ‘বিদ্যাসুন্দর’-এর অনুকরণে রচিত হইয়াছিল। গোবিন্দদাস নামক একজন চট্টগ্রাম-নিবাসী কবি ১৫২৭ শকাব্দে (১৬০৫-০৬ খ্রীষ্টাব্দে) একটি ‘কালিকামঙ্গল’ রচনা করিয়াছিলেন। সপ্তদশ শতাব্দীর আর একজন ‘কালিকামঙ্গল’–রচয়িতা প্রাণরাম চক্রবর্তী; ইহার কাব্যরচনাকাল ১৫৮৮ শকাব্দ (১৬৬৬ খ্রীষ্টাব্দ)। ইহা ভিন্ন কলিকাতার নিকটবর্তী নিমতার অধিবাসী কৃষ্ণরাম দাস ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালে ও শায়েস্তা খাঁর বঙ্গশাসনকালে–১৫৯৮ শকাব্দে (১৬৭৬-৭৭ খ্রীষ্টাব্দ) মাত্র কুড়ি বৎসর বয়সে একখানি ‘কালিকামঙ্গল’ রচনা করেন। ইঁহাদের কাহারও রচনা অসাধারণ নয়, এবং সকলের রচনাতেই অল্প-বিস্ত র অশ্লীলতা আছে। কৃষ্ণরামের কাব্যে এ দোষ সর্বাপেক্ষা বেশি।
অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে বলরাম চক্রবর্তী ‘কালিকামঙ্গল’ রচনা করেন। ইহার পর ১৬৭৪ শকাব্দে (১৭৫২-৫৩খ্রষ্টাব্দে) রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র ‘অন্নদামঙ্গল রচনা করেন, ইহার অন্যতম খণ্ড ‘বিদ্যাসুন্দর এবং সমস্ত ‘বিদ্যাসুন্দর’ কাব্যের মধ্যে ইহাই শ্রেষ্ঠ। ভারতচন্দ্রের কিছু পরে কবিরঞ্জন রামপ্রসাদ সেন আর একখানি ‘বিদ্যাসুন্দর’ রচনা করেন। ভারতচন্দ্র ও রামপ্রসাদ সম্বন্ধে পরে আমরা স্বতন্ত্রভাবে আলোচনা করিব। ইঁহারা ভিন্ন নিধিরাম আচার্য ১৬৭৮ শকাব্দে (১৭৫৬-৫৭ খ্রীষ্টাব্দ) এবং কলিকাতা-নিবাসী রাধাকান্ত মিশ্র ১৬৮৯ শকাব্দে (১৬৬৭-৬৮ খ্রীষ্টাব্দ) ‘কালিকামঙ্গল’ রচনা করিয়াছিলেন। কবীন্দ্র চক্রবর্তী নামে এক ব্যক্তিও অষ্টাদশ শতাব্দীতে এখানি ‘কালিকামঙ্গল’ লিখিয়াছিলেন। ইঁহাদের রচনা গতানুগতিক শ্রেণীর, তবে রাধাকান্ত মিশ্র অন্য কবিদের দেবতার প্রত্যাদেশ প্রাপ্তিতে আংশিক অনাস্থা প্রকাশ করিয়া দৃষ্টিভঙ্গীর অভিনবত্বের পরিচয় দিয়াছেন।
রায়মঙ্গল
মনসা যেমন সাপের দেবতা, তেমনি বাঘের দেবতা দক্ষিণরায়। তাঁহাকে উপাসনা করিলে বাঘের কবল হইতে রক্ষা পাওয়া যায় বলিয়া বাংলা দেশের লোকেরা বিশ্বাস করিত। ‘রায়মঙ্গল কাব্যে এই দক্ষিণরায়ের মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হইয়াছে। এই কাব্যের মধ্যে আরও দুইজন উপাস্যের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। একজন কুমীরের দেবতা কালুরায়, অপর জন মুসলমানদের পীর বড় খাঁ গাজী। ‘রায়মঙ্গল কাব্যে এই দুইজনের মাহাত্মও বর্ণিত হইয়াছে। দক্ষিণরায়, কালুরায় ও বড় খাঁ গাজী, তিনজনেরই পূজা সুন্দরবন অঞ্চলে অধিক প্রচলিত। ‘রায়মঙ্গলের মধ্যে দক্ষিণরায় ও বড় খা গাজীর যুদ্ধ এবং ঈশ্বরের অর্ধ-শ্রীকৃষ্ণ অর্ধ-পয়গম্বর বেশে অবতীর্ণ হইয়া উভয়ের মধ্যে সন্ধিস্থাপন করার বর্ণনা পাওয়া যায়।
‘রায়মঙ্গলে’র প্রথম রচয়িতার নাম মাধব আচার্য। ইনি ‘কৃষ্ণমঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল ও গঙ্গামঙ্গলের রচয়িতা মাধব আচার্যের সঙ্গে অভিন্ন হইতে পারেন। ইহার নাম কৃষ্ণরামের ‘রায়মঙ্গলে উল্লিখিত হইয়াছে, কিন্তু ইহার কাব্য পাওয়া যায় নাই। যে কয়টি ‘রায়মঙ্গল পাওয়া গিয়াছে, তাঁহার মধ্যে নিমতা গ্রাম নিবাসী কৃষ্ণরাম দাসের রচনাটিই প্রাচীনতম। ইহার লেখা ‘কালিকামঙ্গলের নাম পূর্বেই উল্লিখিত হইয়াছে। কৃষ্ণরামের ‘রায়মঙ্গল’ ১৬০৮ শকাব্দে (১৬৮৬-৮৭ খ্রীষ্টাব্দে) রচিত হয়। এই কাব্যখানি অশ্লীলতাদোষে দুষ্ট হইলেও শক্তিশালী হাতের রচনা; ইহার একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় এই যে, ইহার মধ্যে অনেক রকমের বাঘের নাম ও বর্ণনা পাওয়া যায়।
কৃষ্ণরামের পর আরও দুইজন কবি ‘রায়মঙ্গল’ লিখিয়াছিলেন। একজনের নাম রুদ্রদেব। ইঁহার কাব্যের খণ্ডিত পুঁথি মিলিয়াছে। ইনি সম্ভবত অষ্টাদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের লোক ছিলেন। দ্বিতীয় জনের নাম হরিদেব। ১৬৫০ শকাব্দে (১৭২৮ খ্রীষ্টাব্দে) ইঁহার ‘রায়মঙ্গল’ সম্পূর্ণ হয়।
অন্যান্য মঙ্গলকাব্য
যে সমস্ত মঙ্গলকাব্য সম্বন্ধে আমরা আলোচনা করিলাম, সেগুলি ভিন্ন আরও অনেক মঙ্গলকাব্য রচিত হইয়াছিল। ইহাদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও প্রধান প্রধান রচয়িতাদের নাম নিম্নে উল্লেখ করা হইল।
শীতলামঙ্গল–ইহাতে বসন্ত রোগের দেবী শীতলার মাহাত্ম বর্ণিত হইয়াছে। মাণিকরাম গাঙ্গুলী, নিত্যানন্দ বল্লভ, দয়াল, অকিঞ্চন চক্রবর্তী, দ্বিজ গোপাল, শঙ্কর এবং পূর্ব্বোল্লিখিত নিমতাবাসী কৃষ্ণরাম দাস প্রভৃতি কবিগণ শীতলামঙ্গল রচনা করিয়াছিলেন।
ষষ্ঠীমঙ্গল–ষষ্ঠী শিশুদের রক্ষয়িত্রী দেবী। ইহার মাহাত্ম ষষ্ঠীমঙ্গল কাব্যে বর্ণিত হইয়াছে। নিমতার কৃষ্ণরাম দাস (কাব্যের রচনাকাল ১৬০১ শক বা ১৬৭৯-৮০ খ্রীষ্টাব্দ) এবং রুদ্ররাম প্রভৃতি কবিগণ ষষ্ঠীমঙ্গল রচনা করিয়াছিলেন।
সারদামঙ্গল–সারদামঙ্গলে সারদা অর্থাৎ সরস্বতী দেবীর মাহাত্ম বর্ণিত হইয়াছে। দয়ারাম, দ্বিজ বীরেশ্বর প্রভৃতি কবিগণ ইহার রচয়িতা।
