ধর্মঠাকুরের ব্যাপার অবলম্বনে ধর্মমঙ্গল কাব্যগুলি ব্যতীত আরও এক ধরনের গ্রন্থ রচিত হইয়াছিল। এগুলিকে ‘ধর্মপুরাণ’ বলা হয়। ইহাদের মধ্যে বিশ্বসৃষ্টির কাহিনী (ধর্মঠাকুরের উপাসকদের মতানুযায়ী), ধর্মপূজা প্রবর্তনের কাহিনী এবং ধর্মপূজার পদ্ধতি বর্ণিত হইয়াছে। বিশ্বসৃষ্টির কাহিনীটি বেশ বিচিত্র। এই কাহিনী অনুসারে ধর্মই বিশ্বের সৃষ্টিকর্ত্তা; ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব তাঁহার পুত্র; ধর্ম পুত্রত্রয়কে পরীক্ষা করিবার জন্য ছয় মাসের শব হইয়া তাঁহাদের সম্মুখ দিয়া ভাসিয়া যান; ইহাদের মধ্যে শিবই পিতাকে চিনিতে পারেন; অতঃপর শিবের জানুর উপরে বিষ্ণুকে কাষ্ঠ করিয়া ব্রহ্মার নিঃশ্বাসে আগুন ধরাইয়া ধর্মকে সৎকার করা হয়; ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিবের জননী কেতকা অনুমৃতা হন। ধর্মপূজা-প্রবর্তনের কাহিনীতে সদা নামক ডোম কর্ত্তৃক ধর্মঠাকুরকে প্রথম পূজা করা এবং রামাই পণ্ডিত (আদিত্যের অবতার) কর্ত্তৃক ধর্মপূজা সুপ্রতিষ্ঠিত করা বর্ণিত হইয়াছে। ধর্মপূজার পদ্ধতির মধ্যে নানা ধরনের জিনিস দেখা যায়; যেমন, ধর্মঠাকুরের নিত্যপূজার প্রণালী, ধর্ম্মের “ঘরভরা” নামক গাজনের বিধি, সূর্যের ছড়া, ধর্ম্মের চাষ ও শিবের চাষ প্রভৃতির কাহিনী।
ধর্মপুরাণ প্রথম রামাই পণ্ডিত রচনা করিয়াছিলেন বলিয়া পরবর্তী গ্রন্থগুলিতে উল্লিখিত হইয়াছে। কিন্তু রামাই পণ্ডিতের ‘ধর্মপুরাণ’ পাওয়া যায় নাই। যাদুনাথ, সহদেব চক্রবর্তী, লক্ষণ, রামচন্দ্র বড়জ্জ্যা প্রভৃতি কবির লেখা ধর্মপুরাণ পাওয়া গিয়াছে। যাদুনাথের গ্রন্থ সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ দশকের এবং অন্যদের গ্রন্থ অষ্টাদশ শতাব্দীর রচনা। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ হইতে ‘শূন্যপুরাণ’ নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হইয়াছিল; ইহা ধর্ম্মের পূজাপদ্ধতির সংকলন। এই বইটিকে প্রথম প্রকাশের সময়ে খুব প্রাচীন রচনা বলিয়া মনে করা হইয়াছিল, কিন্তু ইহার রচনা অষ্টাদশ শতাব্দীর পূর্ববর্তী নয়।
শিবমঙ্গল বা শিবায়ন
শিবের সম্বন্ধে বাংলা দেশে বহু প্রাচীনকাল হইতে কাব্য রচনা হইয়া আসিতেছে। বাংলা দেশে শিবের বিশুদ্ধ পৌরাণিক রূপটি অক্ষুণ্ণ ছিল না। তাঁহার সহিত বহু লৌকিক ঐতিহ্য মিশিয়া গিয়াছিল। এইসব লৌকিক ঐতিহ্য অনুসারে শিব চাষ। করেন, গাঁজা-ভাঙ খান, এমন কি নীচজাতীয় লোকদের পাড়ায় গিয়া নীচজাতীয়া স্ত্রীলোকদের সহিত অবৈধ সংসর্গ পর্যন্ত করেন। শিবের গৃহস্থালীর চিত্রও বাঙালীর পরিচিত, কিন্তু সে গৃহস্থালী দরিদ্রের গৃহস্থালী।
শিবের চরিত্র ও তাঁহার গৃহস্থালীর বর্ণনা চণ্ডীমঙ্গল ও মনসামঙ্গল কাব্যে পাওয়া যায়। সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ হইতে শিব সম্বন্ধে স্বতন্ত্র মঙ্গলকাব্যও রচিত হইতে থাকে। এইগুলির নাম ‘শিবমঙ্গল’ বা ‘শিবায়ন’।
যাহাদের রচিত ‘শিবায়ন’ পাওয়া গিয়াছে, তাহাদের মধ্যে প্রাচীনতম রামকৃষ্ণ রায়। ইহার উপাধি ছিল কবিচন্দ্র। ইঁহার নিবাস ছিল বর্তমান হাওড়া জেলার অন্ত গত রসপুর-কলিকাতা গ্রামে। রামকৃষ্ণের ‘শিবায়ন’ সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে রচিত হয়। ইহার মধ্যে প্রধানতঃ পৌরাণিক শিবের কাহিনী বর্ণিত হইয়াছে।
‘কবিচন্দ্র’ উপাধিধারী আর একজন কবি আর একখানি ‘শিবায়ন’ রচনা করিয়াছিলেন। ইহার প্রকৃত নাম শঙ্কর চক্রবর্তী। গ্রন্থের মধ্যে কবি লিখিয়াছেন যে, বিষ্ণুপুরের রাজা বীরসিংহের রাজত্বকালে তিনি কাব্য রচনা করিয়াছিলেন।
দ্বিজ রতিদেব নামক জনৈক কবি ১৫৯৬ শকাব্দ বা ১৬৭৪ খ্রীষ্টাব্দে মৃগলুব্ধ’ নামে একটি ক্ষুদ্র শিবমাহাত্ম-বর্ণনামূলক আখ্যানকাব্য রচনা করেন। এই কবি সম্ভবত চট্টগ্রামের লোক ছিলেন।
‘শিবায়ন’ কাব্যের শ্রেষ্ঠ রচয়িতা রামেশ্বর ভট্টাচার্য। ইঁহার নিবাস ছিল বর্তমান মেদিনীপুর জেলার ঘাটাল মহকুমার যদুপুর গ্রামে। পরে ইনি কর্ণগড়ের রাজা রামসিংহের আশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষণ লাভ করেন এবং রামসিংহের পুত্র যশমন্ত সিংহের রাজত্বকালে ‘শিবায়ন’ রচনা করেন। এই গ্রন্থের রচনা-সমাপ্তিকাল বিষয়ক যে শ্লোক কবি লিপিবদ্ধ করিয়াছেন, তাঁহার অর্থ সম্বন্ধে পণ্ডিতেরা একমত না হইলেও তিনি যে অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে কাব্য রচনা করিয়াছিলেন, ইহা নিশ্চিত করিয়া বলা চলে। রামেশ্বরের ‘শিবায়ন’ অত্যন্ত সুখপাঠ্য রচনা। ইহার ভাষাও খুব সরল। এই কাব্যে কবি গ্রাম্য কাহিনীকে ভদ্র রূপ দিয়া সাহিত্যে প্রবেশ করাইয়াছেন, ইহা অত্যন্ত কৃতিত্বের বিষয়। কাব্যটিতে স্থানে স্থানে অল্পস্বল্প গ্রাম্যতা থাকিলেও মোটামুটিভাবে অধিকাংশ স্থানে সুরুচিরই পরিচয় পাওয়া যায়। রামেশ্বরের শিবায়নে সমসাময়িক সমাজের নিখুঁত প্রতিফলন পাওয়া যায়। সে যুগে লোকেরা এত দরিদ্র হইয়া পড়িয়াছিল যে কোনক্রমে খাইয়া পরিয়া বাঁচিয়া থাকাই চরম কাম্য মনে করিত-ইহা এই কাব্য হইতে জানা যায়। এই কাব্যের চাষ-পালাতে রামেশ্বর ধান-চাষের অত্যন্ত বিশদ ও সুনিপুণ বর্ণনা লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। রামেশ্বর একটি ‘সত্যনারায়ণের পাঁচালী’-ও লিখিয়াছিলেন।
কালিকামঙ্গল
কালিকামঙ্গল কাব্যে বাংলার সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় দেবী কালীর মাহাত্ম বর্ণিত হইয়াছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ‘কালিকামঙ্গল কাব্যে বিদ্যা ও সুন্দরের রোমান্টিক প্রেম-কাহিনী প্রধান স্থান লাভ করিয়াছে। সংস্কৃত সাহিত্যে রাজশেখর সূরী, বররুচি প্রভৃতি লেখকেরা ‘বিদ্যাসুন্দরের কাহিনী লইয়া কাব্য রচনা করিয়াছেন। কিন্তু সে কাহিনী লৌকিক কাহিনী, তাঁহার সহিত কালী দেবীর কোন সম্পর্ক নাই। বাংলা দেশের ‘কালিকামঙ্গল কাব্যে বলা হইয়াছে সুন্দরের উপাস্যা দেবী কালী এবং তিনি সুন্দরকে প্রাণদণ্ড হইতে রক্ষা করিয়াছিলেন। এইভাবে কালীর মাহাত্মের সহিত ‘বিদ্যাসুন্দরের প্রেম-কাহিনী এক সূত্রে গ্রথিত হইয়াছে।
