মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গলের আর একটি বৈশিষ্ট্য এই যে, কাব্যটি নাটকীয় রীতিতে রচিত। কবির নিজের উক্তি ইহাতে খুব কমই আছে, বেশীর ভাগই বিভিন্ন পাত্রপাত্রীর উক্তিপ্রত্যুক্তির মাধ্যমে রচিত। এই কাব্যের জাগরণ-পালার মধ্যে নাটকীয় সঙ্কট-মুহূর্ত অর্থাৎ ক্লাইম্যাক্স সৃষ্টির প্রকৃষ্ট নিদর্শন দেখা যায়। এই কারণে মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গলকে নাট্যধর্মী কাব্যও বলা যায়।
আর একটি কারণে মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গল বিশেষভাবে মূল্যবান। এই কাব্য হইতে সে-যুগের সমাজ সম্বন্ধে অজস্র তথ্য পাওয়া যায়। বিশেষত, কালকেতুর নগরপত্তন-সংক্রান্ত অংশটি অত্যন্ত তথ্যপূর্ণ। এই গ্রন্থ ষোড়শ-সপ্তদশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণের বাঙালী-সমাজের দর্পণস্বরূপ।
মুকুন্দরামের পরেও আরও অনেক কবি চণ্ডীমঙ্গল রচনা করিয়াছিলেন। সপ্তদশ শতাব্দীর কবিদের মধ্যে রামদেব, দ্বিজ জনার্দন ও দ্বিজ কমললোচন এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর কবিদের মধ্যে মুক্তারাম সেন, জয়নারায়ণ সেন ও রামানন্দ যতির নাম উল্লেখযোগ্য। রামানন্দ যতির ‘চণ্ডীমঙ্গলে’র মধ্যে কিছু অবিনবত্ব আছে; এই কাব্যে তিনি অলৌকিক ব্যাপারে নিজের অনাস্থার পরিচয় দিয়াছেন এবং মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গল সম্বন্ধে বিরূপ মন্তব্য লিপিবদ্ধ করিয়াছেন।
ধর্মমঙ্গল ও ধর্মপুরাণ
চণ্ডী ও মনসার মত ধর্মঠাকুরকে কেন্দ্র করিয়াও বাংলা দেশে এক বিরাট সাহিত্য গড়িয়া উঠিয়াছিল। ধর্মঠাকুর সম্পূর্ণভাবে লৌকিক দেবতা। তবে ইঁহার পরিকল্পনার উপরে বুদ্ধ, সূর্য, বরুণ, যম প্রভৃতির পরিকল্পনার প্রভাব আছে বলিয়া কেহ কেহ মনে করেন। ধর্মঠাকুরের পূজা কেবলমাত্র রাঢ় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ। হিন্দু সমাজের তথাকথিত নিম্নশ্রেণীর লোকেরা ডোম, বাগদী, হাড়ি প্রভৃতি জাতির লোকেরাই বিশেষভাবে ধর্মঠাকুরের উপাসক। এইজন্য ধর্মমঙ্গল কাব্যও রাঢ় ভিন্ন অন্য কোন অঞ্চলের লোকেরা রচনা করেন নাই এবং ধর্মমঙ্গল কাব্যের জনপ্রিয়তা পূর্ব্বোক্ত জাতিসমূহের লোকদের মধ্যেই অধিক ছিল। ইঁহাদের রচয়িতা অবশ্য তথাকথিত উচ্চবর্ণের লোকেরাই হইতেন; কিন্তু ধর্মমঙ্গল রচনার ‘অপরাধে’, বিশেষ করিয়া আসরে গান করার ‘অপরাধে’, ইঁহারা অনেক সময়ে নিজেদের সমাজে পতিত হইতেন।
ধর্মমঙ্গল কাব্যের কাহিনী সংক্ষেপে এই। জনৈক গৌড়েশ্বর (ইনি ধর্মপালের পুত্র বলিয়া অভিহিত, ইহার নাম কোথাও উল্লিখিত নাই) তাঁহার শ্যালক মহাপাত্র মহামদকে না জানাইয়া তরুণী শ্যালিকা রঞ্জাবতীর সহিত ময়নাগড়ের বৃদ্ধ সামন্ত রাজ কর্ণসেনের বিবাহ দেন। মহামদ পরে এ কথা জানিয়া খুব ক্রুদ্ধ হয়। এদিকে রঞ্জাবতী ধর্মঠাকুরের পূজা এবং তদুপলক্ষে কঠোর আত্মনিপীড়ন করার পরে ধর্ম্মের অনুগ্রহে লাউসেন নামক পুত্রকে লাভ করে। মহামদ শিশু লাউসেনকে বধ করিবার চেষ্টা করিয়া ব্যর্থ হয়। বড় হইয়া লাউসেন বহুবার অলৌকিক বীরত্ব দেখায়, অনেকবার বিপদেও পড়ে, কিন্তু ধর্মঠাকুরের কৃপায় প্রতিবার রক্ষা পায়। শেষপর্যন্ত লাউসেন কঠিন তপস্যার দ্বারা ধর্মঠাকুরকে সন্তুষ্ট করিয়া পশ্চিমদিকে সূর্যোদয় দেখাইতেও সমর্থ হয়। মহামদ লাউসেনকে বিনষ্ট করিবার জন্য অনেক ষড়যন্ত্র করিয়াছিল, কিন্তু কিছুই করিতে পারে নাই; অবশেষে একবার লাউসেনের অনুপস্থিতির সুযোগ লইয়া মহামদ ময়নাগড় আক্রমণ করিল এবং লাউসেনের স্ত্রী কলিঙ্গা ও অনেক অনুচরকে বধ করিল; লাউসেন ফিরিয়া আসিয়া ধর্ম্মের স্তব করিল এবং ধর্ম্মের কৃপায় সবাইকে পুনরুজ্জীবিত করিয়া ময়নায় নিরুদ্বেগে রাজত্ব করিতে লাগিল; ধর্মঠাকুরের অভিশাপে মহামদ কুষ্ঠরোগগ্রস্ত হইল।
ধর্মমঙ্গল কাব্য অনেকগুলি রচিত হইয়াছিল। সবগুলির সাহিত্যিক উৎকর্ষ সমান নয়। তবে চরিত্রগুলি (এক নায়ক লাউসেন ছাড়া) প্রায় সব ধর্মমঙ্গলেই জীবন্ত হইয়াছে। রঞ্জাবতী পুত্রস্নেহে অন্ধ; কর্ণসেন ভীরু ও দুর্বল প্রকৃতির; গৌড়েশ্বর ব্যক্তিত্বহীন; মহামদ খল ও জিঘাংসু; কর্পূরধবল কাপুরুষ ও ভড়; লাউসেনের দুই স্ত্রী কলিঙ্গা ও কানড়া মহীয়সী বীরাঙ্গনা; কালু ডোম, কালুর স্ত্রী, ধুমসী, হরিহর বাইতি প্রভৃতি চরিত্রগুলি ন্যায়ের জন্য আত্মোৎসর্গের মধ্য দিয়া আমাদের হৃদয়ে স্থান লাভ করে। এই সব চরিত্র সব ধর্মমঙ্গলেই জীবন্ত হইয়াছে; ধর্মমঙ্গলগুলিতে তথাকথিত উচ্চবর্ণের লোকদের চাইতে নিম্নবর্ণের লোকদের চরিত্রগুলিই বেশি প্রাণবন্ত হইয়াছে। সে যুগের যোদ্ধৃ জাতি ডোমদের বীরত্বও ধর্মমঙ্গলে সুন্দরভাবে বর্ণিত হইয়াছে। তবে নায়ক লাউসেনের চরিত্র-তাঁহার বীরত্ব বাস্তবতার সীমা ছাড়াইয়া যাওয়ার জন্য এবং প্রতিপদেই তাঁহার ধর্মঠাকুরের উপর নির্ভর করা ও ধর্মঠাকুরের কৃপায়, বিপন্মুক্ত হওয়ার ফলে জীবন্ত হইতে পারে নাই। ধর্ম মঙ্গলকাব্যগুলিতে রাঢ়ের লোকদের জীবনযাত্রার পরিচয় বেশ সুপরিস্ফুট হইয়াছে।
প্রথম ধর্মমঙ্গল কাব্য রচনা করিয়াছিলেন ময়ূরভট্ট; পরবর্তী ধর্মমঙ্গল-কাব্যের রচয়িতারা ইঁহার নাম করিয়াছেন; কিন্তু ময়ূরভট্টের কাব্য পাওয়া যায় নাই। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ হইতে ময়ূরভট্ট বিরচিত শ্রীধর্মপুরাণ’ নাম দিয়া যাহা বাহির হইয়াছিল, তাহা জাল। খেলারাম নামক জনৈক ধর্মমঙ্গল-কাব্যরচয়িতাকে কেহ কেহ ষোড়শ শতাব্দীর লোক বলেন, কিন্তু এই মতের যাথার্থে গভীর সংশয় আছে; খেলারামের কাব্যের কয়েকটি পংক্তি মাত্র পাওয়া গিয়াছে; এগুলি হইতে তাঁহাকে সপ্তদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের লোক বলিয়া মনে হয়। শ্রীশ্যাম পণ্ডিত সম্ভবত সপ্তদশ শতকের প্রথমার্ধের লোক, কিন্তু তাঁহার রচিত ধর্মমঙ্গল কাব্যও সম্পূর্ণ মিলে নাই। যাহাদের লেখা ধর্মমঙ্গল পাওয়া গিয়াছে, তাহাদের মধ্যে রূপরাম চক্রবর্তী, রামদাস আদক, সীতারাম দাস, ঘনরাম চক্রবর্তী ও মাণিকরাম গাঙ্গুলীর নাম উল্লেখযোগ্য। রূপরামের নিবাস ছিল বর্তমান বর্ধমান জিলার শ্রীরামপুর গ্রামে। শুজা যে সময় বাংলার শাসনকর্ত্তা (১৬৩৯-৫৯ খ্রী.), সে সময়ে রূপরাম ধর্ম্মের গান গাহিতে শুরু করেন এবং শুজার শাসন অবসানের কিছু পরে ধর্মমঙ্গল রচনা সম্পূর্ণ করেন। রূপরামের ধর্মমঙ্গলের চরিত্রগুলি বেশ জীবন্ত; ইহার মধ্যে সে-যুগের যুদ্ধযাত্রার বাস্তব ও উজ্জ্বল বর্ণনা পাওয়া যায়; রূপরামের আত্মকাহিনী সুরচিত ও তথ্যপূর্ণ। রামদাস ১৬৬২ খ্রীষ্টাব্দে ধর্মমঙ্গল রচনা করেন; ইনি রূপরামকেই অনুসরণ করিয়াছেন। সীতারাম ১৬৯৬ খ্রীষ্টাব্দে ধর্মমঙ্গল সম্পূর্ণ করেন; ইহার আত্মকাহিনী বেশ কবিত্বপূর্ণ; ইনি একটি মনসামঙ্গলও লিখিয়াছিলেন। ঘনরাম ১৭১১ খ্রীষ্টাব্দে ধর্মমঙ্গল রচনা শেষ করিয়াছিলেন। ইনি বর্ধমানের রাজা কীর্তিচন্দ্রের আশ্রিত ছিলেন। ঘনরাম পণ্ডিত লোক ছিলেন, তাঁহার কাব্যেও পাণ্ডিত্যের পরিচয় আছে; ইহার ধর্মমঙ্গলখানি আয়তনে অত্যন্ত বৃহ; কিন্তু কাব্যহিসাবে তাঁহার বিশিষ্ট মূল্য রহিয়াছে; ছন্দ ও অলঙ্কার–বিশেষত অনুপ্রাসের ক্ষেত্রে ঘনরাম এই কাব্যে সবিশেষ নৈপুণ্য প্রদর্শন করিয়াছেন। ঘনরাম একটি ‘সত্যনারায়ণের পাঁচালী’ও রচনা করিয়াছিলেন। মাণিকরাম ১৭১১ হইতে ১৭৬৪ খ্রষ্টাব্দের মধ্যে কোন এক সময়ে ধর্মমঙ্গল রচনা করিয়াছিলেন; ইহার রচিত ধর্মমঙ্গল আয়তনে ক্ষুদ্র হইলেও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ; তাঁহার মধ্যে উপভোগ্য হাস্যরসের নিদর্শন পাওয়া যায়। মাণিকরাম একটি শীতলামঙ্গল কাব্য রচনা করিয়াছিলেন। এই কয়জন কবি ব্যতীত নিধিরাম চক্রবর্তী, প্রভুরাম মুখটি, রামচন্দ্র বাড়জ্জ্যা, রামকান্ত রায়, নরসিংহ বসু, ভবানন্দ রায়, দ্বিজ রাজীব প্রভৃতি কবিরাও ধর্মমঙ্গল রচনা করিয়াছিলেন। ইঁহাদের অধিকাংশই অষ্টাদশ শতাব্দীর লোক।
