মনসামঙ্গলের মত চণ্ডীমঙ্গলের রচনাও চৈতন্য-পূর্ববর্তী যুগেই আরম্ভ হইযাছিল, কারণ চৈতন্যভাগবতে’ ‘মঙ্গলচণ্ডীর গীত’ (যাহা চণ্ডীমঙ্গলের নামান্তর) এর উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু চৈতন্য-পূর্ববর্তীকালে রচিত কোন চণ্ডীমঙ্গলের এ পর্যন্ত নিদর্শন পাওয়া যায় নাই।
প্রথম চণ্ডীমঙ্গল রচনা করেন মাণিক দত্ত। ইহার রচিত কাব্য এ পর্যন্ত মিলে নাই, পরবর্তী কবিদের উক্তি হইতে তাঁহার অস্তিত্বের কথা মাত্র জানিতে পারা যায়। এক মাণিক দত্তের লেখা চণ্ডীমঙ্গল পাওয়া গিয়াছে, কিন্তু ইনি দ্বিতীয় মাণিক দত্ত–পরবর্তীকালের লোক।
ষোড়শ শতাব্দীতে যাঁহারা চণ্ডীমঙ্গল রচনা করিয়াছিলেন (বা অন্তত করিয়াছিলেন বলিয়া বলা হয়), তাঁহাদের মধ্যে দ্বিজ মুকুন্দ কবিচন্দ্র, বলরাম কবিকঙ্কণ এবং দ্বিজ মাধব বা মাধবাচার্যের নাম উল্লেখযোগ্য। দ্বিজ মুকুন্দের কাব্যের বিশিষ্ট নাম ‘বাশুলীমঙ্গল’, ইহা “শাকে রস রস বেদ” অর্থাৎ ১৪৬৬ শকাব্দে (১৫৪৪-৪৫ খ্রীষ্টাব্দে) রচিত হয় বলিয়া গ্রন্থমধ্যে উল্লিখিত হইয়াছে। কিন্তু এই কাব্যের ভাষা অত্যন্ত আধুনিক। বলরাম কবিকঙ্কণের কাব্য যে ষোড়শ শতাব্দীতে রচিত হইয়াছিল, তাঁহার কোন প্রমাণ নাই, তবে মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গলে কবির “গীতের গুরু শ্রীকবিকঙ্কণ”-এর উল্লেখ আছে, অনেকে মনে করেন বলরামই এই শ্রীকবিকঙ্কণ। বলরাম মেদিনীপুর অঞ্চলের লোক ছিলেন, তাঁহার কাব্য উড়িষ্যায় জনপ্রিয় হইয়াছিল ও উড়িয়া-রূপান্তর লাভ করিয়াছিল। দ্বিজ মাধব বা মাধবাচার্য “ইন্দু বিন্দু বাণ ধাতা শক” অর্থাৎ ১৫০১ শকাব্দে (১৫৭৯-৮০ খ্রীষ্টাব্দ) তাঁহার কাব্য রচনা করেন। কাব্যের সূচনায় কবি “পঞ্চগৌড়”-এর রাজা “একাব্বর” অর্থাৎ ভারতসম্রাট আকবরের নাম উল্লেখ করিয়াছেন। দ্বিজ মাধবের নিবাস ছিল সপ্তগ্রামে, ইঁহার পিতার নাম পরাশর। দ্বিজ মাধবের চণ্ডীমঙ্গলে অল্পস্বল্প গ্রাম্যতা থাকিলেও কাব্যটি সুলিখিত, ভাড় দত্তের চরিত্র অঙ্কনে কবি দক্ষতার পরিচয় দিয়াছেন। তাঁহার ভাষা ও বর্ণনাভঙ্গী অত্যন্ত সরল ও অনাড়ম্বর। দ্বিজ মাধবের কাব্যে কালকেতু ও ফুল্লরার উপাখ্যানটি বিস্তৃতভাবে বর্ণিত হইয়াছে। অপর উপাখ্যানটির বর্ণনা অপেক্ষাকৃত সংক্ষিপ্ত। আশ্চর্যের বিষয়, দ্বিজ মাধব পশ্চিমবঙ্গীয় কবি হইলেও চট্টগ্রাম ব্যতীত বাংলার অন্য কোন অঞ্চলে তাঁহার কাব্যের প্রচারের কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না, সম্ভবত মুকুন্দরামের কাব্যের অত্যধিক জনপ্রিয়তার ফলে অন্য সব অঞ্চলে দ্বিজ মাধবের কাব্যের প্রচার লোপ পাইয়াছিল। দ্বিজ মাধব চণ্ডীমঙ্গল ব্যতীত ‘কৃষ্ণমঙ্গল ও গঙ্গামঙ্গল কাব্যও রচনা করিয়াছিলেন।
চণ্ডীমঙ্গলের শ্রেষ্ঠ রচয়িতা এবং প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী ষোড়শ শতকের শেষভাগে আবির্ভূত হন। তিনি যে সুন্দর আত্মকাহিনীটি লিখিয়া গিয়াছেন, তাহা হইতে জানা যায় যে, তাঁহার নিবাস ছিল বর্তমান বর্ধমান জেলার অন্তর্গত দামুন্যা বা দামিন্যা গ্রামে। এখানকার ডিহিদার মামুদ (বা মুহম্মদ) সরিফ প্রজাদের উপর অত্যাচার করিতে থাকেন এবং মুকুন্দরামের প্রভু ভূস্বামী গোপীনাথ নন্দীকে বন্দী করেন; তখন মুকুন্দরাম হিতৈষীদের সহিত পরামর্শ করিয়া দেশত্যাগ করেন; অনেক দুঃখকষ্ট সহ্য করিয়া এবং ঠিকমত স্নানাহার করিতে না পাইয়া তাঁহাকে পথ চলিতে হয়; পথে এক জায়গায় চণ্ডী তাঁহাকে স্বপ্নে দেখা দিয়া চণ্ডীমঙ্গল রচনা করিতে বলেন; ইহার পর মুকুন্দরাম বর্তমান মেদিনীপুর জেলার অন্তর্গত আরড়া গ্রামে উপনীত হন; সেখানে ব্রাহ্মণভূমির রাজা বাঁকুড়া রায় বাস করিতেন; বাঁকুড়া রায় কবির সকল দুঃখ দূর করিয়া দিয়া নিজের পুত্রকে পড়াইবার কাজে কবিকে নিযুক্ত করেন; বাঁকুড়া রায়ের মৃত্যুর পরে-তাঁহার পুত্র রঘুনাথ রায়ের রাজত্বকালে মুকুন্দরাম চণ্ডীমঙ্গল রচনা করেন এবং রঘুনাথের কাছে তিনি পুরস্কার লাভ করেন। মুকুন্দরামের আত্মকাহিনী হইতে জানা যায় যে মানসিংহ যখন গৌড়, বঙ্গ ও উৎকলের শাসনকর্ত্তা (১৫৯৪ ১৬০৬ খ্রীষ্টাব্দ), তখন মুকুন্দরাম জীবিত ছিলেন।
মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গল কাব্য হিসাবে উচ্চাঙ্গের। ইহার মধ্যে যে মানবিক রস আছে, তাহা তুলনারহিত। এই কাব্যের মধ্যে মানুষের জীবন, মানুষের সুখদুঃখ, মানুষের হৃদয়ের কথা যেমন নিখুঁতভাবে রূপায়িত হইয়াছে, তেমনি ইহার চরিত্রগুলি পরিপূর্ণভাবে রক্তমাংসের মানুষ হইয়া ফুটিয়া উঠিয়াছে।
মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গলের ভাষা সরল, বর্ণনা অনাড়ম্বর, কিন্তু তাঁহারই মধ্যে অপূর্ব কবিত্বশক্তির নিদর্শন পাওয়া যায়। এই কাব্যে নারীচরিত্র-বিশেষভাবে ফুল্লরা ও খুল্লনার চরিত্র অঙ্কনে মুকুন্দরাম নৈপুণ্যের পরিচয় দিয়াছেন। কুটিল স্বার্থান্বেষী প্রতারকের চরিত্র সৃষ্টিতে মুকুন্দরাম এই কাব্যে অপরূপ দক্ষতা দেখাইয়াছেন। মুরারি শীল, ভাঁড় দত্ত ও দুর্বলা দাসী এই শ্রেণীর চরিত্র। ইহাদের মধ্যে ভাঁড় দত্তের চরিত্রটি অতুলনীয়। শঠতার এমন জীবন্ত প্রতিমূর্ত্তি প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে আর দ্বিতীয় একটিও মিলে না।
জীবন সম্বন্ধে মুকুন্দরামের যে ব্যাপক ও গভীর অভিজ্ঞতা ছিল, তাঁহারই। রূপায়ণ এই কাব্যে দেখা যায়। মুকুন্দরাম বিশেষভাবে দুঃখের অভিজ্ঞতাই লাভ করিয়াছিলেন, তাই এই কাব্যে দুঃখের চিত্রগুলিই জীবন্ত ও উজ্জ্বল হইয়া ফুটিয়া উঠিয়াছে। কবির আত্মকাহিনী হইতে সুরু করিয়া কালকেতুর শরে জর্জর পশুদের খেদোক্তি, ফুল্লরার বারমাস্যা, খুল্লনার ক্লিষ্ট জীবনযাত্রা প্রভৃতি বর্ণনাগুলিতে সর্বত্রই দুঃখের তীব্র নগ্ন রূপ দেখিতে পাই। এই জন্য কেহ কেহ মুকুন্দরামকে ‘দুঃখবাদী কবি’ বলিয়া অভিহিত করেন। কিন্তু ইঁহাদের মত সমর্থন করা যায় না। কারণ মুকুন্দরাম দুঃখকেই জীবনের সার কথা বলেন নাই; দুঃখের পিছনে যে আশা আছে, সে কথাও তিনি শুনাইয়াছেন।
