বিজয় গুপ্তের পরে বর্তমান ২৪ পরগণা জেলার অন্তর্গত বাদুড়িয়া গ্রাম নিবাসী ব্রাহ্মণ কবি বিপ্রদাস পিপিলাই মনসামঙ্গল রচনা করেন–“সিন্ধু ইন্দু বেদ মহী শক” অর্থাৎ ১৪১৭ শকাব্দে (১৪৯৫-৯৬ খ্রীষ্টাব্দ)। বিপ্রদাসের মনসামঙ্গলে কাহিনী খুব বিস্তৃত আকারে মিলিতেছে। এই গ্রন্থে মনসার পূজাপদ্ধতির খুব বিশদ বর্ণনা পাওয়া যায়। তবে বিপ্রদাসের মনসামঙ্গলে অনেকগুলি আধুনিক স্থানের উল্লেখ থাকার জন্য কেহ কেহ সন্দেহ করেন যে এই কাব্যের সবটাই প্রাচীন বা অকৃত্রিম নয়।
‘মনসামঙ্গলে’র আর একজন প্রাচীন কবি কায়স্থজাতীয় নারায়ণদেব। ইঁহার নিবাস ছিল বর্তমান ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্গত বোরগ্রামে। নারায়ণদেব “সুকবি” বা “সুকবিবল্লভ” উপাধি লাভ করিয়াছিলেন। ইঁহার কাব্যের ভাষা বেশ প্রাচীন; রচনাকাল সঠিকভাবে জানা যায় না; ভাষা দেখিয়া কাব্যটিকে ষোড়শ শতাব্দীর রচনা বলিয়া মনে হয়। নারায়ণদেবের ‘মনসামঙ্গলে’ চাঁদ সদাগরের চরিত্রটি অত্যন্ত জীবন্ত। চাঁদের দুর্জয় ব্যক্তিত্ব ও অদম্য পুরুষকার নারায়ণদেব অত্যন্ত চমৎকারভাবে রূপায়িত করিয়াছেন। নারায়ণদেবের চাঁদ সদাগর শেষপর্যন্ত মনসার নিকট নতি স্বীকার করেন নাই–বেহুলার ও ইষ্টদেবতা শিবের অনুরোধ ঠেলিতে না পারিয়া তিনি পিছন ফিরিয়া বাম হাতে মনসার উদ্দেশ্যে একটি ফুল ফেলিয়া দিয়াছেন মাত্র। নারায়ণদেবের ‘মনসামঙ্গল’ প্রতিবেশী রাজ্য আসামে খুব জনপ্রিয় হইয়াছিল, সেখানে তাঁহার ভাষা লোকমুখে পরিবর্তিত হইয়া অসমীয়া হইয়া গিয়াছে। আসামে নারায়ণদের “হুকনান্নি” (“সুকবি নারায়ণ”-এর অপভ্রংশ) নামে পরিচিত।
অপর একজন প্রাচীন ও জনপ্রিয় মনসামঙ্গল-রচয়িতা বংশীদাস। ইঁহার। নিবাস ছিল বর্তমান ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্গত পাটবাড়ী (বা পাতুয়ারী) গ্রামে। ইনি সম্ভবত সপ্তদশ শতকের লোক। বংশীদাসের ‘মনসামঙ্গল’ পূর্ববঙ্গে অত্যন্ত জনপ্রিয় হইয়াছিল। সেখানে নারীদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এই ‘মনসামঙ্গল’ গাওয়া হইত। পূর্ববঙ্গের বহু লোকে এই ‘মনসামঙ্গল’ আদ্যন্ত কণ্ঠস্থ করিয়া রাখিয়াছে। বংশীবদনের কন্যা চন্দ্রাবতীও কবি ছিলেন। তিনি একটি বাংলা রামায়ণ এবং কিছু কিছু ছড়া রচনা করিয়াছিলেন। তাঁহার ব্যর্থ প্রণয় সম্বন্ধে একটি কাহিনী ‘ময়মনসিংহ-গীতিকা’র মধ্যে পাওয়া যায়।
মনসামঙ্গলের শ্রেষ্ঠ কবি কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ। ইহার আত্মকাহিনী হইতে জানা যায় যে, পশ্চিমবঙ্গের সেলিমাবাদ পরগণার অন্তর্গত কথড়া গ্রামে ঘঁহার নিবাস ছিল। সেখানে স্থানীয় শাসনকর্ত্তার মৃত্যুর পরে অরাজকতা দেখা দিলে কবির পিতা তিন পুত্রকে লইয়া দেশত্যাগ করেন এবং রাজা বিষ্ণুদাসের ভাই ভরামলের কাছে আশ্রয় ও সম্পত্তি লাভ করেন। নূতন বাসভূমিতে একদিন বর্ষাকালে কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ বস্ত্রবিক্রয়িণী মূচিনীর মূর্ত্তিধারিণী মনসার দেখা পাইলেন। মনসা কবিকে মনসামঙ্গল রচনা করিতে বলিয়া অন্তর্হিত হইলেন। সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগে কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ মনসামঙ্গল রচনা করেন। ইহার প্রকৃত নাম ‘ক্ষেমানন্দ’, ‘কেতকাদাস’ (অর্থ মনসার দাস) উপাধি। ক্ষেমানন্দের ‘মনসামঙ্গল’ পশ্চিমবঙ্গে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করিয়াছিল। সে জনপ্রিয়তা এখনও অক্ষুণ্ণ আছে। ক্ষেমানন্দের ‘মনসামঙ্গলে’র বেহুলা একটি অপূর্ব চরিত্র; কবিত্বপ্রতিভার দিক দিয়া বাল্মীকির সহিত ক্ষেমানন্দের তুলনা হয় না। কিন্তু ক্ষেমানন্দের বেহুলা বাল্মীকির সীতার মতই করুণ ও মর্মস্পর্শী।
কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ ব্যতীত ক্ষেমানন্দ নামক আরও দুইজন পশ্চিমবঙ্গীয় কবি মনসামঙ্গল রচনা করিয়াছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য মনসামঙ্গল রচয়িতাদের মধ্যে সীতারাম দাস, দ্বিজ রসিক, দ্বিজ বাণেশ্বর, কবিচন্দ্র কালিদাস ও বিষ্ণুপালের নাম উল্লেখযোগ্য। ইহাদের মধ্যে কেহ সপ্তদশ শতকের, কেহ অষ্টাদশ শতকের লোক।
উত্তরবঙ্গের অনেক কবিও মনসামঙ্গল রচনা করিয়াছিলেন। তাঁহাদের মধ্যে দুর্গাবর, বিভূতি, জগজ্জীবন ঘোষাল, জীবনকৃষ্ণ মৈত্র প্রভৃতির নাম উল্লেখযোগ্য। দুর্গাবর ষোড়শ শতাব্দীর, অন্যেরা সপ্তদশ বা অষ্টাদশ শতাব্দীর লোক। ইহাদের মধ্যে জগজ্জীবন ঘোষালের কাব্যই শ্রেষ্ঠ–যদিও এই কাব্যে মাঝে মাঝে গ্রাম্যতার নিদর্শন পাওয়া যায়।
চণ্ডীমঙ্গল কাব্য–মুকুন্দরাম চক্রবর্তী
মনসার মত চণ্ডীর ঐতিহ্যও খুব প্রাচীন। তন্ত্রে ও পুরাণে চণ্ডীদেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে বাংলা দেশের চণ্ডীমঙ্গলে যে চণ্ডীদেবীর মাহাত্ম বর্ণিত হইয়াছে, তাঁহার পৌরাণিক স্বরূপটি সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ নাই, তাঁহার সহিত লৌকিক ঐতিহ্য মিলিয়া দেবীকে এক নূতন রূপ দিয়াছে।
চণ্ডীমঙ্গলগুলির মধ্যে দুইটি কাহিনী দেখিতে পাওয়া যায়। প্রথমটি ব্যাধদম্পতি কালকেতু ও ফুল্লরার কাহিনী; কালকেতু অপূর্ব শক্তিধর পুরুষ এবং তাঁহার স্ত্রী ফুল্লরা সাধ্বী নারী; ইহারা চণ্ডীর কৃপা লাভ করে এবং চণ্ডীর দেওয়া অর্থে বন কাটাইয়া এক নূতন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে; ইহার পর কলিঙ্গরাজের আক্রমণের ফলে তাহাদের সৌভাগ্য-সূর্য সাময়িকভাবে রাহুগ্রস্ত হয়, কিন্তু চণ্ডীর কৃপায় অচিরেই বিপদ কাটিয়া যায়। দ্বিতীয়টি এক বণিক-পরিবারের-ধনপতি-লহনা-খুল্লনা শ্রীমন্তের কাহিনী। প্রথমা স্ত্রী লহনা থাকাসত্ত্বেও বণিক ধনপতি খুল্লনাকে বিবাহ করিয়াছিল; এই খুল্লনা সপত্নীর হাতে নানারূপ নির্যাতন সহ্য করিয়া অবশেষে চণ্ডীর কৃপা লাভ করে; কিন্তু শিবভক্ত ধনপতি চণ্ডীর অমর্যাদা করিয়াছিল বলিয়া তাহাকে শাস্তি ভোগ করিতে হয়; সিংহলে যাইবার সময় সে পদ্মফুলের উপর দণ্ডায়মানা নারীর হস্তী গলাধঃকরণ করার এক অলৌকিক দৃশ্য দেখিতে পায়, কিন্তু সিংহলের রাজাকে তাহা দেখাইতে না পারায় তাহাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করিতে হয়; খুল্লনার পুত্র শ্ৰীমন্ত বড় হইয়া পিতার সন্ধানে সিংহলে যায়, সেও সেই একই দৃশ্য দেখে এবং সিংহলরাজকে তাহা দেখাইতে না পারায় তাঁহার প্রাণদণ্ডের আদেশ হয়, অবশেষে চণ্ডীর কৃপায় সমস্ত বিপদ কাটিয়া যায়, ধনপতি মুক্ত হয়, শ্ৰীমন্ত সিংহলের রাজকন্যাকে বিবাহ করিয়া স্ত্রী ও পিতাকে লইয়া দেশে ফিরে।
