১৫
মঙ্গলকাব্য
‘মঙ্গলকাব্য’ প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের একটি বিশিষ্ট শাখা। মঙ্গলকাব্য নামটি আধুনিক। কাব্যগুলির নামের শেষে ‘মঙ্গল’ শব্দ থাকিত বলিয়া বর্তমানকালের গবেষকরা ইহাদের এই নাম দিয়াছেন। ‘মঙ্গলকাব্য’ বলিতে দেবদেবীর মাহাত্মবর্ণনামূলক আখ্যানকাব্য বুঝায়। বাংলা দেশে অসংখ্য লৌকিক ও পৌরাণিক দেবদেবীর পূজা প্রচলিত ছিল। মুসলমান আমলে হিন্দুদের মধ্যে এইসব দেবদেবীর জনপ্রিয়তা সবিশেষ বৃদ্ধি পাইয়াছিল। বিধর্মী রাজশক্তি হিন্দুদের উপর অনেক সময় উৎপীড়ন করিত; ইহা ভিন্ন সর্প, ব্যাঘ্র, বন্যা, দুর্ভিক্ষ, মহামারী প্রভৃতি বিপদও সে যুগে খুব বেশি মাত্রায় ছিল। এই সমস্ত সঙ্কট হইতে পরিত্রাণ পাইবার অন্য কোন উপায় না দেখিয়া বাঙালী হিন্দুরা দেবদেবীদের শরণাপন্ন হইত। এইভাবে যেমন ঐসব দেবদেবীর জনপ্রিয়তা বাড়িতে থাকে, তেমনি কবিরা তাঁহাদের মাহাত্ম বর্ণনা করিয়া মঙ্গলকাব্যও রচনা করিতে থাকেন।
মঙ্গলকাব্যের ধারায় তিন শ্রেণীর মঙ্গলকাব্যকে প্রধান বলা যাইতে পারে মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল ও ধর্মমঙ্গল। ইহা ব্যতীত শিবমঙ্গল বা শিবায়ন, কালিকা মঙ্গল, ‘রায়মঙ্গল, শীতলামঙ্গল, ষষ্ঠীমঙ্গল, লক্ষ্মীমঙ্গল, সারদামঙ্গল, সূর্যমঙ্গল, গঙ্গামঙ্গল প্রভৃতি অন্যান্য বহু মঙ্গলকাব্য বিভিন্ন কবি কর্ত্তৃক রচিত হইয়াছিল।
মঙ্গলকাব্যগুলি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করিয়াছিল। সর্বসাধারণের মধ্যে এগুলি সমাদর লাভ করিয়াছিল। ইহাদের মধ্যে সে-যুগের বাঙালী সমাজের আলেখ্য লাভ করা যায় এবং বাঙালীর জাতীয় চরিত্রের প্রতিফলন দেখিতে পাওয়া যায়। এই জন্য মঙ্গলকাব্যগুলিকে বাঙালীর জাতীয় কাব্য বলা যাইতে পারে।
প্রতি মঙ্গলকাব্যের মধ্যে কতকগুলি বিশেষ বিশেষ বিষয়ের অবতারণা দেখা যায়। যেমন, কাব্যের সূচনায় বিভিন্ন দেবদেবীর বন্দনা, শাপভ্রষ্ট দেবদেবীর কাব্যের নায়ক-নায়িকারূপে জন্মগ্রহণ করা, নারীদের পতিনিন্দা, অন্তঃসত্ত্বা রমণীদের গর্ভের বর্ণনা, খাদ্যের বর্ণনা, বিবাহের বর্ণনা, চিত্রলিখিত কাঁচুলীর বর্ণনা, ‘বারমাস্যা’ অর্থাৎ বার মাসের সুখ বা দুঃখের বর্ণনা। মঙ্গলকাব্যগুলির গান এক মঙ্গলবার রাত্রিতে সুরু হইয়া পরের মঙ্গলবার রাত্রিতে শেষ হইত।
মনসামঙ্গল
সমস্ত মঙ্গলকাব্যের মধ্যে মনসামঙ্গলের ধারাতেই এ পর্যন্ত সর্বাপেক্ষা প্রাচীন রচনার নিদর্শন মিলিয়াছে। মনসামঙ্গল কাব্যে সর্পের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মনসার মাহাত্ম বর্ণিত হইয়াছে। মনসার পূজা করিলে সর্পের কবল হইতে রক্ষা পাওয়া যায় বলিয়া লোকের বিশ্বাস। এই মনসা দেবীর ঐতিহ্য খুব প্রাচীন। কোন কোন পণ্ডিতের মতে ঋগ্বেদে মনসার প্রচ্ছন্ন উল্লেখ আছে। লৌকিক ঐতিহ্যমতে মনসা শিবের কন্যা, চণ্ডী ইহার বিমাতা, ঈর্ষার বশে চণ্ডী ইঁহার এক চক্ষু নষ্ট করিয়া দিয়াছিলেন; এইজন্য ইহাকে অভক্তেরা “কাণী” বলিয়া অভিহিত করিত। ইহা ভিন্ন লৌকিক ঐতিহ্যে মনসা আস্তিক-জননী জরৎকারুর সহিত অভিন্না।
মনসামঙ্গল কাব্যের কাহিনী সংক্ষেপে এই : মনসা বণিক চন্দ্রধর বা চাঁদ সদাগরকে দিয়া তাঁহার পূজা করাইবার জন্য অনেক চেষ্টা করেন, কিন্তু চাঁদ সদাগর শিবের ভক্ত বলিয়া তাহাতে রাজী হন নাই; ইহাতে ক্রুদ্ধ হইয়া মনসা চাঁদ সদাগরের ছয় পুত্রের জীবন নাশ করেন। চাঁদের হতাবশিষ্ট একমাত্র পুত্র লখিন্দরের বিবাহের রাত্রে মনসার প্রেরিতা সর্পিণী কালনাগিনী লখিন্দরকে দংশন করিয়া সংহার করে। লখিন্দরের সদ্যোপরিণীতা স্ত্রী বেহুলা স্বামীর শব লইয়া একটি ভেলায় চড়িয়া ভাসিয়া যায় এবং স্বর্গে পৌঁছিয়া নৃত্যগীত প্রভৃতির দ্বারা দেবতাদের সন্তুষ্ট করিয়া–শেষ পর্যন্ত মনসারও ক্রোধ শান্ত করিয়া স্বামীর ও মৃত ভাশুরদের প্রাণ ফিরাইয়া আনে। অতঃপর দেশে ফিরিয়া বেহুলা চাঁদ সদাগরকে সনির্বন্ধ অনুরোধ করিয়া তাহাকে দিয়া মনসার পূজা করায়।
মনসামঙ্গল কাব্যের প্রথম রচয়িতা কানা হরি দত্ত। ইহার কাব্য অনেকদিন বিলুপ্ত হইয়াছে, তবে সেই কাব্যের দুই একটি পদ পরবর্তী কোন কোন কবির কাব্যের মধ্যে দেখা যায়।
যাহাদের লেখা ‘মনসামঙ্গল’ পাওয়া গিয়াছে, তাহাদের মধ্যে প্রাচীনতম কবি বৈদ্যজাতীয় বিজয় গুপ্ত। ইঁহার নিবাস ছিল বর্তমান বাখরগঞ্জ জেলার অন্তর্গত ফুল্লশ্রী গ্রামে। “ঋতু শূন্য বেদ শশী” অর্থাৎ ১৪০৬ শকে (১৪৮৪-৮৫ খ্রীষ্টাব্দে) “হোসেন শাহ” অর্থাৎ জলালুদ্দীন ফতেহ্ শাহের (ইহার দ্বিতীয় নাম ছিল ‘হোসেন শাহ’) রাজত্বকালে বিজয় গুপ্ত মনসামঙ্গল রচনা করেন–এই কথা তাঁহার মনসামঙ্গলের উপক্রম হইতে জানা যায়। বিজয় গুপ্ত লিখিয়াছেন যে দেবী মনসার কাছে হরি দত্তের ‘মনসামঙ্গল’ প্রীতিকর না হওয়াতে এবং ঐ মনসামঙ্গল লুপ্তপ্রায় হওয়াতে তিনি বিজয় গুপ্তকে স্বপ্নে দেখা দিয়া মনসামঙ্গল’ রচনা করিতে বলিয়াছিলেন। বিজয় গুপ্তের মনসামঙ্গল’ শক্তিশালী হাতের রচনা। চাঁদ সদাগরের পত্নী সনকার মমতা-করুণ মাতৃমূর্ত্তিটি ইহাতে খুব উজ্জ্বলভাবে ফুটিয়াছে। বিজয় গুপ্তের রচনা খুব বেশী জনপ্রিয়তা অর্জন করিয়াছিল। এই কারণে তাহাতে অনেক প্রক্ষিপ্ত উপাদান প্রবেশ করিয়াছে এবং তাঁহার ভাষাও আধুনিকতাপ্রাপ্ত হইয়াছে।
