১৪
নাথ-সাহিত্য
বাংলার নাথ সম্প্রদায়ের ধর্ম ও সাধনতত্ত্ব এবং ঐ সম্প্রদায়ের আদি গুরুদের কাহিনী অবলম্বনে বাংলা ভাষায় কয়েকটি গ্রন্থ রচিত হইয়াছিল। নাথ সম্প্রদায়ের সাধন-প্রণালী অত্যন্ত বিচিত্র। অন্য সমস্ত সম্প্রদায় সাধনা করেন মৃত্যুর পরে মুক্তি লাভের জন্য; আর নাথদের সাধনার লক্ষ্য নরদেহের অমরত্ব অর্জন করিয়া জীবদ্দশাতেই মুক্তিলাভ করা; এই সাধনার মূল অঙ্গ সংযম, ব্রহ্মচর্য এবং কায়া সাধন’ নামক যৌগিক প্রক্রিয়া; নাথদের মতে প্রতি মানুষের মস্তকে অমৃতক্ষরণকারী চন্দ্র এবং নাভিদেশে অমৃগ্রাসী সূর্য থাকে, কায়া-সাধন’ নামক যৌগিক প্রক্রিয়ার দ্বারা চন্দ্রের অমৃতকে ক্ষরিত হইতে না দিয়া সূর্যের গ্রাস হইতে রক্ষা করা যায় এবং তাহা করিলেই অমরত্ব লাভ করা যায়। নাথদের আদি গুরু বা আদি সিদ্ধা চারজন–মীননাথ, গোরক্ষনাথ, হাড়িপা ও কানুপা। গোরক্ষনাথ মীননাথের শিষ্য এবং কানুপা হাড়িপার শিষ্যা। ইঁহারা সকলেই ঐতিহাসিক ব্যক্তি বলিয়া মনে হয়, তবে ইঁহাদের সম্বন্ধে যে কাহিনীগুলি প্রচলিত আছে, সেগুলির মধ্যে অলৌকিক উপাদান এত অধিক যে, তাহা হইতে সত্য নির্ধারণের কোন উপায় নাই।
বাংলার নাথ-সাহিত্যের কাহিনী মূলত দুইটি-–গোরক্ষনাথ-মীননাথের কাহিনী এবং হাড়িপা-কানুপা-ময়নামতী-গোপীচাঁদের কাহিনী। প্রথম কাহিনীতে দেবী গৌরীর ছলনায় গোরক্ষনাথ ব্যতীত আর তিনজন আদি সিদ্ধা অর্থাৎ মীননাথ, হাড়িপা ও কানুপার প্রবঞ্চিত ও শাপগ্রস্ত হওয়া, শাপগ্রস্ত মীননাথের কদলী দেশে নারীদের রাজ্যে রাজা হওয়া এবং গোরক্ষনাথের নর্তকী-বেশে মীননাথের সভায় গমন করিয়া তত্ত্বোপদেশ দ্বারা তাঁহার চৈতন্য-সম্পাদন বর্ণিত হইয়াছে। দ্বিতীয় কাহিনীতে শাপগ্রস্ত হাড়িপার হাড়ি (মেথর) হইয়া রানী ময়নামতীর রাজ্যে যাওয়া, তাঁহার পরিচয় পাইয়া রানী ময়নামতীর নিজ পুত্র গোবিন্দ্রচন্দ্রকে বা গোপীচাঁদকে তাঁহার নিকট দীক্ষা লওয়াইবার চেষ্টা, গোপীচাঁদের দীক্ষা লইতে অনিচ্ছা, তাহাকে ঘরে রাখিতে তাঁহার রানীদের প্রয়াস, গোপীচাঁদ কর্ত্তৃক হাড়িপাকে মাটির নিচে পুঁতিয়া রাখা, কানুপা কর্ত্তৃক হাড়িপার উদ্ধার সাধন এবং শেষ পর্যন্ত হাড়িপার কাছে গোপীচাঁদের দীক্ষাগ্রহণ বর্ণিত হইয়াছে। এই দুইটি কাহিনী অবলম্বনে যেসব লেখক গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন তাঁহাদের সকলেই নাথ সম্প্রদায়ের লোক নহেন, এমন কি সকলে হিন্দুও ননে। কেহ কেহ মুসলমান সম্প্রদায়ের লোক। তবে ইহাদের রচনাগুলি নাথ সম্প্রদায়ের মধ্যেই বিশেষভাবে পঠিত ও আদৃত হইত। প্রথম কাহিনী লইয়া যে কাব্যটি রচিত হইয়াছিল, তাঁহার নাম ‘গোরক্ষবিজয়। ‘গোরক্ষবিজয়’ কাব্যের বিভিন্ন পুঁথিতে ফয়জুল্লা, কবীন্দ্র দাস, শ্যামাদাস সেন, ভীমদাস, ভীমসেন রায় প্রভৃতির ভণিতা পাওয়া যায়। তবে অধিকাংশ পুঁথিতেই ফয়জুল্লার ভণিতা পাওয়া যায় বলিয়া এবং আরও কয়েকটি বিষয় হইতে মনে হয়, ফয়জুল্লাই ‘গোরক্ষবিজয়’ কাব্যের রচয়িতা। গোরক্ষবিজয়’ কাব্যের রচনাকাল ১৭০০ খ্রীষ্টাব্দের কাছাকাছি বলিয়া মনে হয়। অবশ্য, এই কাব্যের কাহিনীটি সংক্ষিপ্ত আকারে কোন কোন প্রাচীনতর বাংলা রচনার মধ্যে পাওয়া যায়। মিথিলাতে বহু পূর্বে-পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে–বিদ্যাপতি এই কাহিনী অবলম্বনে ‘গোরক্ষবিজয়’ নাটক রচনা করিয়াছিলেন। গোরক্ষবিজয়’ কাব্যের মধ্যে নাথধর্ম্মের সাধনতত্ত্ব সম্বন্ধীয় কথা প্রাধান্য প্রাপ্ত হওয়ায় ইহার কাব্যরস কতকটা মন্দীভূত হইয়াছে। তবে এই কাব্যে গোরক্ষনাথ তাঁহার উন্নত চরিত্র, দৃপ্ত পুরুষকার, অটল অধ্যবসায় ও অবিচলিত গুরুভক্তির মধ্য দিয়া এবং মীননাথ ভোগলিপ্সা ও কৃচ্ছসাধন-বিমুখতার মধ্য দিয়া জীবন্ত চরিত্র হইয়া উঠিয়াছেন। কাব্যটির মধ্যে শিষ্য কর্ত্তৃক গুরুর উদ্ধার বর্ণিত হইয়াছে–বিষয়বস্তু হিসাবে ইহা খুবই অভিনব ও মধুর। এই কাব্যের ভাষা ও প্রকাশভঙ্গীতে একটা প্রশংসনীয় সংযমের পরিচয় পাওয়া যায়। গোরক্ষবিজয়ে’ নারী জাতিকে খুব হেয় করিয়া দেখান হইয়াছে।
নাথ-সাহিত্যের দ্বিতীয় কাহিনীটি অর্থাৎ গোপীচাঁদ-ময়নামতীর কাহিনী লইয়া অনেক গ্রন্থ রচিত হইয়াছে। সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে নেপালে এই কাহিনী অবলম্বনে একটি নাটক রচিত হয়, তাঁহার সংলাপ নেওয়ারী ভাষায় রচিত হইলেও গানগুলি বাংলায় রচিত; রচনা হিসাবে ইহার অভিনবত্ব থাকিলেও ইহার সাহিত্যিক মূল্য খুব বেশি নয়। এই কাহিনী অবলম্বনে রচিত তিনটি বাংলা কাব্য পাওয়া গিয়াছে–ইহাদের রচয়িতাদের নাম দুর্লভ মল্লিক, ভবানী দাস ও সুকুর মুহম্মদ। দুর্লভ মল্লিকের কাব্য অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের রচনা, ভবানী দাস ও সুকুরের কাব্যও অষ্টাদশ শতাব্দীতে রচিত বলিয়া মনে হয়। তিনটি কাব্যের মধ্যে দুর্লভ মল্লিকের রচনাটিই শ্রেষ্ঠ; ভবানী দাসের রচনা কতকটা বৈষ্ণবপদাবলী-প্রভাবিত ও মধ্যে মধ্যে কৌতুকরসোদ্দীপক; সুকুরের রচনা স্থানে স্থানে বেশ সুখপাঠ্য, তবে ইহাতে ময়নামতী, হাড়িপা, গোরক্ষনাথ প্রভৃতি চরিত্রগুলিকে কতকটা হেয় করিয়া দেখানো হইয়াছে। ইহা ভিন্ন গোপীচাঁদ-ময়নামতীর কাহিনী লইয়া একটি ছড়াও রচিত হইয়াছিল, সেটি রংপুর অঞ্চলে লোকের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল; এই ছড়াটির সংক্ষিপ্ত ও বিস্তৃত উভয় রূপই পাওয়া গিয়াছে; ছড়াটি বাংলার লোক সাহিত্যের একটি বিশিষ্ট নিদর্শন; এটির পরিণতি মিলনান্ত। গোপীচাঁদ-ময়নামতীর কাহিনী অবলম্বনে রচিত সমস্ত রচনাতেই মানবিক রসের আধিক্য দেখিতে পাওয়া যায় এবং গোপীচাঁদের সন্ন্যাসে তাঁহার রানীদের বিরহ-বেদনা সব রচনাতেই মর্মস্পর্শিরূপে বর্ণিত হইয়াছে। গোপীচাঁদ-ময়নামতীর কাহিনীর উদ্ভব সম্ভবত বাংলা দেশেই, কারণ সর্বত্রই গোপীচাঁদকে বঙ্গের রাজা বলা হইয়াছে। কিন্তু এই কাহিনী বঙ্গের বাহিরেও ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে-বিহার, উড়িষ্যা, উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাব, এমন কি সুদূর মহারাষ্ট্রেও প্রচলিত ছিল ও আছে, এইসব রাজ্যের মধ্যে কোন কোনটিতে বাংলা দেশের রচনাগুলির তুলনায় প্রাচীনতর গোপীচাঁদ-বিষয়ক রচনা পাওয়া গিয়াছে, এখনও এইসব স্থানে কোথাও কোথাও যোগী সন্ন্যাসীরা গোপীচাঁদের গাথা-গান গাহিয়া ভিক্ষা করে; কিন্তু বাংলা দেশে আধুনিককালে এক উত্তরবঙ্গ ভিন্ন আর কোথাও জনসমাজে এই কাহিনীর প্রচলন নাই। গোপীচাঁদ ময়নামতীর কাহিনীর মত বাংলার আর কোন কাহিনীই বাংলার বাহিরে এতখানি ব্যাপ্তি লাভ করিতে পারে নাই।
