পীর ও গাজীর মাহাত্মবর্ণনামূলক কাহিনী
‘পীর’ অর্থাৎ অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন ধর্মগুরু এবং ‘গাজী’ অর্থাৎ ধর্মযুদ্ধের যোদ্ধাদের লইয়া বঙ্গীয় মুসলমান কবিরা অনেক কাব্য লিখিয়াছিলেন। এই শ্রেণীর কাব্যের মধ্যে “গরীব ফকীর”-এর ‘মাণিকপীরের গীত’ এবং ফয়জুল্লার ‘গাজীবিজয়’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
পীর-মাহাত্মমূলক কাব্যগুলির মধ্যে সত্যপীরের পাঁচালী’র নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে ইহার মধ্যে একটু বৈশিষ্ট্য আছে বলিয়া পরবর্তী প্রসঙ্গে ইহার সম্বন্ধে স্বতন্ত্রভাবে আলোচনা করা হইবে।
পদাবলী
বাংলার মুসলমান কবিরা হিন্দু কবিদের অনুসরণে কৃষ্ণলীলা বিষয়ক অনেক পদ রচনা করিয়াছেন। তন্মধ্যে বলা বাহুল্য, রাধাকৃষ্ণের প্রেম সম্বন্ধীয় পদই সংখ্যায় অধিক। রাধাকৃষ্ণের প্রেমের মাধুর্য ঘঁহাদের কবি-অনুভূতিকে দোলা দিয়াছিল বলিয়াই ইহারা এই সমস্ত পদ রচনা করিয়াছিলেন, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। অবশ্য দুই একজনের পদে ভাবের যে আন্তরিকতা দেখা যায়, তাহা হইতে মনে হয় ইঁহাদের অন্তরে প্রকৃত ভক্তিও ছিল। যে সমস্ত মুসলমান কবি পদাবলী রচনা করিয়াছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে সৈয়দ মূর্তজার নাম সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য। ইহার একটি পদে (‘শ্যাম বঁধু আমার পরাণ তুমি’) ভাবের যে গভীরতা দেখা যায়, তাহা চণ্ডীদাস ও জ্ঞানদাসের পদকে স্মরণ করায়। অন্যান্য মুসলমান পদকর্ত্তাদের মধ্যে নাসির মামুদ, শাহা আকবর, গরীবুল্লা, গরীব খা, আলী রাজা প্রভৃতির নাম। উল্লেখযোগ্য। চৈতন্যদেবের রূপ ও মাহাত্ম বর্ণনা করিয়াও কোন কোন বাঙালী মুসলমান কবি পদ রচনা করিয়াছিলেন।
গাথা
বাংলার মুসলমান কবিদের লেখা গাথা-কাব্য বেশ কয়েকখানি পাওয়া গিয়াছে। এই গাথা-কাব্যগুলির অধিকাংশই প্রণয়বিষয়ক। ইহাদের মধ্যে সরূফের ‘দামিনী চরিত্র’, কোরেশী মাগনের ‘চন্দ্রাবতী’ এবং খলিলের ‘চন্দ্রমুখী-পুথি’র উল্লেখ করা যাইতে পারে। এইসব গাথা-কাব্যের কাহিনী এ দেশে লোকমুখে প্রচলিত ছিল বলিয়া মনে হয়।
সাধনতত্ত্বসম্বন্ধীয় নিবন্ধ
কোন কোন বঙ্গীয় মুসলমান কবি সাধনতত্ত্ব বিষয়ক নিবন্ধও রচনা করিয়াছিলেন। এই জাতীয় গ্রন্থের মধ্যে কয়েকটি বাউল-দরবেশী সাধনতত্ত্ব সম্বন্ধীয় গ্রন্থ উল্লেখযোগ্য; যেমন, আলী রাজা বিরচিত ‘জ্ঞানসাগর’ ও ‘সিরাজকুলুপ’।
১৩
সত্যনারায়ণ ও সত্যপীরের পাঁচালী
বহু শতাব্দী ধরিয়া বাংলার হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায় পাশাপাশি বাস করিয়া আসিলেও ধর্ম ও সংস্কৃতির দিক দিয়া উভয় সম্প্রদায়ের মিলন-সেতু রচনার প্রচেষ্টা খুব বেশি হয় নাই। সত্যনারায়ণ বা সত্যপীরের উপাসনা উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত হওয়া এ দিক দিয়া একটি উজ্জ্বল ও বলিষ্ঠ ব্যতিক্রম। ‘সত্যপীর’ ও ‘সত্যনারায়ণ’ আসলে একই উপাস্যের দুইটি রূপ। এই দুইটি রূপের মধ্যে কোটি প্রাচীনতর, তাহা বলা দুরূহ। সত্যনারায়ণ প্রাচীনতর হইলে বলিতে হইবে হিন্দু দেবতা পরবর্তী কালে মুসলমানী প্রভাবে ‘পীর’-এ পরিণত হইয়াছেন, সত্যপীর’ প্রাচীনতর হইলে বলিতে হইবে ‘পীর’ হিন্দুপ্রভাবে দেবতা বনিয়াছেন (এ সম্বন্ধে ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদের ষষ্ঠ ভাগে বিশদভাবে আলোচনা করা হইয়াছে)। যাহা হউক, ‘সত্যনারায়ণ’-এর পূজা কেবলমাত্র হিন্দুদের মধ্যে প্রচলিত, সত্যপীর’-এর উপাসনা হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত। সত্যপীরের উপাসনার সময়ে মুসলমানী রীতি অনুযায়ী সিনি’ নিবেদন করা হইয়া থাকে। ‘সত্যনারায়ণ’-এর হিন্দুমতে পূজার সময়েও ‘সিনি’ নিবেদন করা হয়।
‘সত্যনারায়ণের পাঁচালী’ ব্রতকথা এবং পূজার সময়ে ইহা পঠিত হয়। ইহার কাহিনী দুইটি–প্রথমটি ধর্মমঙ্গলের ধর্মঠাকুরের আবির্ভাবের কাহিনীর মত, দ্বিতীয়টি চণ্ডীমঙ্গলের ধনপতির কাহিনীর মত। ‘সত্যনারায়ণের পাঁচালী’-রচয়িতাদের মধ্যে ঘনরাম চক্রবর্তী, রামেশ্বর, রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র, কবিবল্লভ, জয়নারায়ণ সেন, দৈবকীনন্দন, গঙ্গারাম প্রভৃতি কবির নাম উল্লেখযোগ্য। আরও বহু কবি এই পাঁচালী লিখিয়াছিলেন।
‘সত্যপীরের পাঁচালী’ও অনেকগুলি রচিত হইয়াছিল। বিভিন্ন পাঁচালীতে বিভিন্ন ধরনের কাহিনী দেখা যায়। কোন কাহিনীতে দেখা যায় যে, সত্যপীর “আলা বাদশা” নামক জনৈক নৃপতির কন্যার কানীন-পুত্ররূপে অবতীর্ণ, কোন কাহিনীতে দেখি তিনি নারীরূপে “হোসেন শাহা বাদশা”র কামনা নিবৃত্ত করিতেছেন, আবার কোন কাহিনীতে অন্য কিছু। সবগুলি কাহিনীতেই দেখা যায় সত্যপীর তাঁহার কৃপাভাজন ব্যক্তিদের দিয়া পৃথিবীতে তাঁহার উপাসনা প্রবর্তন করাইতেছেন। ‘সত্যপীরের পাঁচালী’-রচয়িতাদের মধ্যে কৃষ্ণহরি দাস, শঙ্কর, কবি কর্ণ, নায়েক ময়াজ গাজী, আরিফ, ফয়জুল্লা প্রভৃতির নাম উল্লেখযোগ্য।
কোন কোন পণ্ডিত এই মত ব্যক্ত করিয়াছেন যে বাংলার সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহ (১৪৯৩-১৫১৯ খ্রীষ্টাব্দ) সত্যপীরের উপাসনা প্রবর্তন করিয়াছিলেন। এই মত সম্পূর্ণ কাল্পনিক। উপরের অনুচ্ছেদে উল্লিখিত “আলা বাদশা” ও “হোসেন শাহা বাদশা”র নাম একত্র মিলাইয়া এই পণ্ডিতেরা আলাউদ্দীন হোসেন শাহকে আবিষ্কার করিয়াছেন।
এখানে উল্লেখযোগ্য, সত্যপীর’ ভিন্ন আরও কয়েকটি উপাস্যের উপাসনা হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে দেখিতে পাওয়া যায়। হিন্দুরা বনদুর্গা, ওলাই চণ্ডী, কালু রায় (কুমীরের দেবতা), সিদ্ধা মৎস্যন্দ্রনাথের পূজা করে; এই সব দেবতাই মুসলমানদের কাছে যথাক্রমে বনবিবি, ওলাবিবি, কালু শাহ এবং মোছরা পীর রূপে উপাসিত হইয়াছেন। এই সব উপাস্যের প্রশস্তি-বর্ণনামূলক পাঁচালীও উভয় সম্প্রদায়ের কবিরাই রচনা করিয়াছেন। তবে সেগুলির সাহিত্যিক মূল্য বেশি নয়।
