‘পদ্মাবতী’র পরে আলাওল মাগন ঠাকুরের অনুরোধে ‘সৈফুলমুলুদি উজ্জামাল’ নামে একটি কাব্য লিখিতে আরম্ভ করেন। এটি ঐ নামের একটি ফার্সী কাব্যের বঙ্গানুবাদ। মাগন ঠাকুরের আকস্মিক মৃত্যুর ফলে এই কাব্যের রচনায় ছেদ পড়ে। কয়েক বৎসর পরে সৈয়দ মুসা নামে একজন সদাশয় ব্যক্তির আজ্ঞায় আলাওল কাব্যটি শেষ করেন। আলাওল আরাকানরাজের মহাপাত্র সোলেমানেরও পৃষ্ঠপোষণ লাভ করিয়াছিলেন। সোলেমানের অনুরোধে আলাওল ১৬৫৯ খ্রীষ্টাব্দে দৌলৎ কাজীর অসম্পূর্ণ কাব্য ‘সতী ময়নামতী’ সম্পূর্ণ করিয়া দিয়াছিলেন। কবি হিসাবে দৌলৎ কাজী আলাওলের তুলনায় শ্রেষ্ঠ ছিলেন; তাঁহার উপর ফরমায়েসী রচনার মধ্যে আলাওলের নিজস্ব কবিত্বশক্তিও তেমন স্ফুর্তি পায় নাই; সেইজন্য এই কাব্যের আলাওল-রচিত অংশ দৌলৎ কাজীর রচনার তুলনায় নিকৃষ্ট হইয়াছে। সোলেমানের অনুরোধে আলাওল য়ুসুফ গদার আরবী গ্রন্থ ‘তোহফা’র বঙ্গানুবাদ করেন; এই বইটি ইসলাম ধর্ম্মের অনুষ্ঠান ও কৃত্য বিষয়ক নিবন্ধ। আলাওলের ‘তোহফা’র রচনা ১৬৬৩-৬৪ খ্রীষ্টাব্দে আরম্ভ ও ১৬৬৫ খ্রীষ্টাব্দে শেষ হয়।
কিন্তু ঘটনাচক্রে আলাওল এক বিপদে পড়েন; শাহজাহানের দ্বিতীয় পুত্র শুজা ঔরঙ্গজেবের নিকট পরাজিত হইয়া আরাকানরাজের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন। ১৬৬১ খ্রীষ্টাব্দে তিনি আরাকানরাজ শ্রীচন্দ্ৰসুধর্ম্মার সহিত বিবাদ করিতে গিয়া আরাকানরাজের আজ্ঞায় সপরিজনে নিহত হন। শুজার সহিত আলাওলের মেলামেশা ছিল। তাই আলাওলের জনৈক শত্রু আলাওলের নামে রাজার মন বিষাক্ত করিয়া দিয়া আলাওলকে কারাগারে নিক্ষিপ্ত করাইল। পঞ্চাশ দিন পরে রাজা আলাওলের নির্দোষিতার প্রমাণ পাইয়া তাহাকে মুক্তি দিলেন এবং তাঁহার শত্রুর প্রাণদণ্ড বিধান করিলেন। কিন্তু মুক্তি পাইয়া আলাওল অপরিসীম দারিদ্র্য ও দুঃখকষ্টের সম্মুখীন হইলেন। এগারো বৎসর এইভাবে কাটিবার পর আলাওল মজলিস নবরাজ নামে একজন রাজ অমাত্যের পৃষ্ঠপোষণ লাভ করিলেন। ইহার আদেশে আলাওল ‘সেকেন্দারনামা’ নামে একটি কাব্য রচনা করিলেন; এটি নিজামীর লেখা ফার্সী কাব্য ‘সেকেন্দারনামা’র বঙ্গানুবাদ। আলাওল আরাকানরাজের সেনাপতি সৈয়দ মোহাম্মদের পৃষ্ঠপোষণও লাভ করিয়াছিলেন এবং তাঁহার অনুরোধে ‘সপ্তপয়কর’ নামে একটি কাব্য লেখেন; বইটি নিজামীর ‘হপ্তপয়কর’ নামক সপ্ত-কাহিনী বর্ণনামূলক ফার্সী কাব্যের অনুবাদ।
আলাওল রাগনামা’ নামক একটি সঙ্গীতশাস্ত্র বিষয়ক গ্রন্থও লিখিয়াছিলেন। কিছু রাধাকৃষ্ণ-বিষয়ক পদও তিনি রচনা করিয়াছিলেন।
‘পদ্মাবতী’ ভিন্ন অন্য কোন রচনায় আলাওল উল্লেখযোগ্য দক্ষতার পরিচয় দিতে পারেন নাই।
অন্যান্য মুসলমান কবিরা নানা ধারা অবলম্বনে কাব্য রচনা করিয়াছিলেন। এখানে কয়েকটি প্রধান ধারা এবং ঐ সব ধারার প্রধান প্রধান কবিদের নাম উল্লিখিত হইল।
হিন্দী রোমান্টিক কাব্যের অনুবাদ বা অনুসরণ
অন্তত দুইটি হিন্দী রোমান্টিক কাব্য একাধিক কবি কর্ত্তৃক বাংলায় অনূদিত বা অনুসৃত হইয়াছিল। প্রথম—কুৎত্তনের ‘মৃগাবতী’ (রচনাকাল ৯০৯ হিজরা বা ১৫০৩ খ্রীষ্টাব্দ); এই কাব্য অবলম্বনে কয়েকজন মুসলমান কবি বাংলা কাব্য রচনা করিয়াছিলেন; তাঁহাদের মধ্যে মুহম্মদ খাতের ও করিমুল্লার নাম উল্লেখযোগ্য। তারপর, মনোহর ও মধুমালতীর প্রণয়কাহিনী অবলম্বনে হিন্দীতে কয়েকটি কাব্য রচিত হইয়াছিল। এই সব কাব্য অবলম্বনে বাংলা কাব্য রচনা করিয়াছিলেন মুহম্মদ কবীর, সৈয়দ হামজা ও সাকের মামুদ।
ফার্সী রোমান্টিক কাব্যের অনুবাদ বা অনুসরণ
ফার্সী ভাষায় রচিত রোমান্টিক কাব্যগুলির এক বৃহদংশই ‘লায়লি-মজনু’ এবং ‘ইউসুফ-জোলেখা’র প্রেমোপাখ্যান অবলম্বনে রচিত হইয়াছিল। কয়েকজন মুসলমান কবি এইসব কাব্যের অনুবাদ বা অনুসরণ করিয়া বাংলা কাব্য রচনা করিয়াছিলেন। বাংলা ‘লায়লি-মজনু’-রচয়িতাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ চট্টগ্রাম-নিবাসী কবি বাহরাম খান। ইনি “নিজাম-শাহ” উপাধিধারী “ধবল অরুণ গজেশ্বর” অর্থাৎ আরাকান ও চট্টগ্রামের অধিপতির “দৌলত-উজীর” ছিলেন এবং ঔরঙ্গদেবের রাজত্বকালে (১৬৫৮-১৭৮৭ খ্রীষ্টাব্দ) কাব্য রচনা করিয়াছিলেন। বাংলা ইউসুফ জোলেখা’র রচয়িতাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ শাহ মোহাম্মদ সগীর (বা “সগিরি”)। ইঁহার কাব্যের ভাষা হইছে এবং কাব্যের উপর জামীর (১৪১৪-৯২ খ্রীষ্টাব্দে) ফার্সী। ইউসুফ-জোলেখা’র প্রভাব হইতে মনে হয়, ইনি ষোড়শ শতাব্দীর শেষার্ধের লোক। কেহ কেহ শাহ মোহাম্মদ সগীরকে বাংলার সুলতান গিয়াসুদ্দীন আজম শাহের (রাজত্বকাল ১৩৯০-১৪১০ খ্রীষ্টাব্দ) সমসাময়িক মনে করেন, কিন্তু এই মত কোনমতেই সমর্থন করা যায় না।
নবীবংশ, রসুলবিজয় ও জঙ্গনামা
‘নবীবংশ’ পয়গম্বরদের কাহিনী, ‘রসুলবিজয়’ হজরত মুহম্মদের কাহিনী ও ‘জঙ্গনামা’ যুদ্ধের (বিশেষত ইসলাম-ধর্ম-প্রচারকদের ধর্মযুদ্ধের) কাহিনী অবলম্বনে লেখা কাব্য। এই শ্রেণীর কাব্যগুলি হরিবংশ ও মহাভারতের অনুসরণে রচিত। যাহারা এই জাতীয় কাব্য রচনা করিয়াছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে কয়েকজনের কথা পূর্বেই বলা হইয়াছে। অন্যান্য রচয়িতাদের মধ্যে হায়াৎ মামুদ, শাহা বদিউদ্দীন, শেখ চাঁদ, নসরুল্লা খান ও মনসুরের নাম উল্লেখ করা যাইতে পারে। ইহাদের মধ্যে অষ্টাদশ শতাব্দীর কবি হায়াৎ মামুদই শ্রেষ্ঠ। ইনি ‘মহরমপর্ব’ নামে যে বইটি লিখিয়াছিলেন, তাঁহার মধ্যে কারবালা-কাহিনীর সঙ্গে মহাভারতের মিল দেখানোর চেষ্টা করা হইয়াছে। ইহা ভিন্ন হায়াৎ মামুদ ‘চিত্ত-উত্থান’, ‘হিতজ্ঞান-বাণী’ ও ‘আম্বিয়া-বাণী’ নামে তিনটি কাব্য রচনা করিয়াছিলেন; তন্মধ্যে চিত্ত-উত্থান’ কাব্য হিতোপদেশের ফার্সী অনুবাদ অবলম্বনে রচিত।
