অন্যান্য অনুবাদগ্রন্থ
রামায়ণ, মহাভারত এবং ভাগবত ভিন্ন অন্যান্য কোন কোন সংস্কৃত গ্রন্থও বাংলায় অনূদিত হইয়াছিল। তবে সেগুলি সাহিত্য-সৃষ্টি হিসাবে উল্লেখযোগ্য কিছু হয় নাই। হিন্দী এবং ফার্সী ভাষায় যে সমস্ত গ্রন্থ বাংলায় অনূদিত হইয়াছিল, তাহাদের অধিকাংশেরই অনুবাদক মুসলমান। পরবর্তী প্রসঙ্গে সেগুলি সম্বন্ধে আলোচনা করা হইতেছে।
১২
বাংলা সাহিত্যে মুসলমানের দান
বাংলা সাহিত্যের মুসলমান লেখকেরা হিন্দু লেখকদের অপেক্ষাকৃত পরে অংশগ্রহণ করিতে আরম্ভ করেন। কারণ, বাঙালী মুসলমানদের মাতৃভাষা যে আরবী ও ফার্সী নহে–বাংলা, ইহা উপলব্ধি করিতে তাঁহাদের কয়েক শতাব্দী লাগিয়াছিল। সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম দিকেও বাঙালী মুসলমানরা বাংলা ভাষাকে “হিন্দুয়ানি ভাষা” বলিতেন; কবি সৈয়দ সুলতানের লেখা হইতে তাঁহার প্রমাণ মিলে।
বাংলা সাহিত্যে মুসলমান লেখকেরা এমন একটি নূতন বস্তু দিয়াছেন, যাহা হিন্দু লেখকেরা দিতে পারেন নাই। ধর্মনিরপেক্ষ বা লৌকিক কাব্য এবং বিশুদ্ধ প্রণয়মূলক কাব্য প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে তাঁহারাই প্রবর্তন করিয়াছেন। হিন্দুরা প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের যে সমস্ত ধারায় আত্মনিয়োগ করিয়াছিলেন, তাহাদের প্রায় সবই ধর্মমূলক, কারণ হিন্দুরা সাহিত্যকে ধর্মচর্চ্চার মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করিতেন। কিন্তু মুসলমানরা সাহিত্যচর্চ্চার মধ্য দিয়া ধর্মচর্চ্চার বিশেষ প্রয়োজন অনুভব করেন নাই; এইজন্য তাঁহারা ধর্মনিরপেক্ষ বা বিশুদ্ধ প্রণয়মূলক বিষয় অবলম্বনে বহু কাব্য রচনা করিয়াছেন। অবশ্য ধর্মমূলক বিষয় অবলম্বনেও তাঁহারা লিখিয়াছেন।
প্রথম যুগের লেখকগণ
ষোড়শ শতাব্দী হইতে মুসলমান লেখকদের বাংলা রচনার সাক্ষাৎ পাই। এই শতাব্দীতে সাবিরিদ খান নামে একজন মুসলমান কবি দ্বিজ শ্রীধর কবিরাজের ‘বিদ্যাসুন্দর’-এর অনুকরণে একখানি ‘বিদ্যাসুন্দর’ কাব্য রচনা করেন।
সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম দিকের একজন বিশিষ্ট বাঙালী মুসলমান কবি চট্টগ্রামের পরাগলপুর-নিবাসী কবি সৈয়দ সুলতান। ইনি জ্ঞানপ্রদীপ’, নবীবংশ এবং শবে মেরাজ’ নামে তিনখানি গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন; প্রথম গ্রন্থটিতে যোগসাধনার তত্ত্ব, দ্বিতীয়টিতে বারজন নবীর জীবনকাহিনী এবং তৃতীয়টিতে হজরত মুহম্মদের জীবনকাহিনী বর্ণিত হইয়াছে। নবীবংশ বইখানি আয়তনে খুব বিরাট। শবে মেরাজ’ প্রকৃতপক্ষে ‘নবীবংশেরই সূচনাংশ।
জৈনুদ্দীন নামে আর একজন কবি ‘রসুলবিজয়’ নাম দিয়া হজরত মুহম্মদের জীবনকাহিনী বর্ণনা করিয়া একটি কাব্য লিখিয়াছিলেন। ইনি সম্ভবত সৈয়দ সুলতানের পরবর্তী। “ইছপ খান” অর্থাৎ য়ুসুফ খান নামে একজন ব্যক্তি জৈনুদ্দীনের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।
সৈয়দ সুলতানের শিষ্য মোহাম্মদ খান একজন শ্রেষ্ঠ কবি ছিলেন। ইনি ১০৫৬ হিজরা বা ১৬৪৬ খ্রীষ্টাব্দে মকুল হোসেন নামে একখানি কাব্য লিখিয়াছিলেন। এই কাব্যটিতে কারবালার করুণ কাহিনী বর্ণিত হইয়াছে। মোহাম্মদ খান সংস্কৃত ভাষা যে খুব ভাল জানিতেন এবং হিন্দু পুরাণসমূহ যে তাঁহার ভাল করিয়া পড়া ছিল, তাঁহার পরিচয় তাঁহার এই কাব্য হইতে পাওয়া যায়। তাঁহার রচনা-রীতি অত্যন্ত পরিশুদ্ধ। মোহাম্মদ খান ১৬৩৫ খ্রীষ্টাব্দে ‘সত্য-কলি-বিবাদ-সংবাদ’ বা যুগ-সংবাদ’ নামে আর একটি কাব্য লিখিয়াছিলেন; ইহাতে সত্যযুগ ও কলিযুগের কাল্পনিক বিবাদের বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে। মঙুল হোসেন কাব্যে মোহাম্মদ খান নিজের মাতৃকুল ও পিতৃকুলের যে পরিচয় দিয়াছেন, তাহা হইতে দেখা যায় যে, উভয় কুলেই অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন; তাঁহার পিতৃকুলের লোকেরা বহু পুরুষ ধরিয়া চট্টগ্রামের শাসনকর্ত্তার পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
দৌলৎ কাজী ও আলাওল
সপ্তদশ শতাব্দীতে বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ মুসলমান কবিদ্বয়-দৌলৎ কাজী ও আলাওল আবির্ভূত হন। ইহারা আরাকানের রাজধানী রোসাঙ্গ নগরে বসতি স্থাপন করিয়াছিলেন এবং আরাকানরাজের অমাত্যদের কাছে পৃষ্ঠপোষণ লাভ করিয়া কাব্য রচনা করিয়াছিলেন। দৌলৎ কাজী আরাকানরাজ শ্রীসুধর্ম্মার (রাজত্বকাল ১৬২২-৩৮ খ্রী) সেনাপতি লস্কর-উজীর আশরফ খানের পৃষ্ঠপোষণ লাভ
করিয়াছিলেন এবং তাঁহার আদেশে ‘সতী ময়নামতী’ নামে একখানি কাব্য রচনা করিয়াছিলেন। কাব্যটি সাধন নামে একজন উত্তর-ভারতীয় কবির লেখা ‘মৈনা সৎ নামে একটি ছোট হিন্দী কাব্যের আধারে রচিত। এই কাব্যের নায়িকা সতী ময়নামতী স্বামী লোর কর্ত্তৃক পরিত্যক্ত হইয়া যে বিরহ-যন্ত্রণা ভোগ করিয়াছিলেন, তাঁহার বর্ণনায় দৌলৎ কাজী অপরূপ দক্ষতার পরিচয় দিয়াছেন। সংহত স্বল্পপরিমিত ভাবঘন উক্তিসমূহের মধ্য দিয়া কাব্যরস সৃষ্টি করা দৌলৎ কাজীর প্রধান বৈশিষ্ট্য। এই কাব্যে ময়নামতীর বারমাস্যা অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ও কাব্যরসপূর্ণ রচনা। তবে দৌলৎ কাজীর আকস্মিক মৃত্যু হওয়ার ফলে ‘সতী ময়নামতী’ কাব্য অসম্পূর্ণ থাকিয়া যায়। দীর্ঘকাল পরে আলাওল এই কাব্যকে সম্পূর্ণ করেন।
আলাওল তাঁহার বিভিন্ন কাব্যে নিজের জীবনকাহিনী বিস্তৃতভাবে লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। তিনি ১৬০০ খ্রী কাছাকাছি সময়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার পিতা ফতেহাবাদের (আধুনিক ফরিদপুর অঞ্চল) স্বাধীন ভূস্বামী মজলিস কুতুবের অমাত্য ছিলেন। একদিন জলপথ দিয়া যাইবার সময় আলাওল ও তাঁহার পিতা পর্তুগীজ জলদস্যগণ কর্ত্তৃক আক্রান্ত হন। আলাওলের পিতা পর্তুগীজদের সহিত যুদ্ধ করিয়া প্রাণ দেন। আলাওল কোনক্রমে অব্যাহতি লাভ করিয়া আরাকানের কুলে আসিয়া উঠেন। ইহার পর আলাওল আরাকান রাজ্যের অশ্বারোহী-বাহিনীতে নিযুক্ত হইলেন। আলাওলের উচ্চ কুল, পাণ্ডিত্য ও সঙ্গীতনৈপুণ্যের জন্য তাঁহার খ্যাতি চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িল। রাজ্যের প্রধান কর্ত্তা মুখ্য অমাত্য মাগন ঠাকুর আলাওলকে নিজের গুরুপদে অভিষিক্ত করিয়া তাঁহার পৃষ্ঠপোষণ করিতে লাগিলেন। মাগনের অনুরোধে আলাওল ‘পদ্মাবতী’ নামে একটি কাব্য লিখিলেন; কাব্যটি জায়সী নামক উত্তর-ভারতীয় সূফী মুসলমান কবির লেখা ‘পদমাবৎ’ নামক কাব্যের (রচনাকাল ষোড়শ শতকের মধ্যভাগ) স্বাধীন অনুবাদ। ‘পদ্মাবতী’ আরাকানরাজ থদো-মিনতারের রাজত্বকালে (১৬৪৫-৫২ খ্রীষ্টাব্দ) রচিত হয়। ‘পদ্মাবতী’র মধ্যে রোমান্টিক উপাদান এবং অধ্যাত্ম-অনুভূতির আশ্চর্য সমন্বয় সাধিত হওয়ায় কাব্যটি অভিনবত্ব ও উৎকর্ষ লাভ করিয়াছে। হিন্দু পুরাণ এবং সংস্কৃত সাহিত্য সম্বন্ধে আলাওলের প্রগাঢ় জ্ঞানের নিদর্শনও এই কাব্যে পাই। বৈষ্ণব পদাবলীর প্রভাবও এই কাব্যে দেখা যায়। মোটের উপর ‘পদ্মাবতী’ কাব্য হিসাবে সম্পূর্ণ সার্থক এবং এইটিই আলাওলের শ্রেষ্ঠ রচনা।
