আর একজন বিশিষ্ট মহাভারত-রচয়িতা নিত্যানন্দ ঘোষ। ইনি সম্ভবত ষোড়শ শতাব্দীর লোক। ইহার মহাভারত আকারে বৃহৎ এবং ইহার প্রচার পশ্চিম বঙ্গেই সমধিক ছিল।
ষোড়শ শতাব্দীতে রচিত অন্যান্য বাংলা মহাভারতের মধ্যে উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন হিন্দু রাজা মুকুন্দদেবের বাঙালী সভাকবি দ্বিজ রঘুনাথ রচিত ‘অশ্বমেধপর্ব’, উত্তর রাঢ়ের কবি রামচন্দ্র খান রচিত ‘অশ্বমেধপর্ব’ এবং কোচবিহারের রাজসভার আশ্রিত দুইজন কবির রচনা-রামসরস্বতীর ‘বনপর্ব’ ও পীতাম্বর দাসের ‘নলদময়ন্তী উপাখ্যান’-এর উল্লেখ করা যাইতে পারে।
ইঁহাদের পরে কাশীরাম দাস আবির্ভূত হন। কাশীরামের আসল নাম কাশীরাম দেব। তাঁহার পিতার নাম কমলাকান্ত দেব। তাঁহার তিন পুত্র-জ্যেষ্ঠ কৃষ্ণ, মধ্যম কাশীরাম, কনিষ্ঠ গদাধর। জাতিতে কায়স্ত বলিয়া ইঁহারা নামের সহিত দাস’ শব্দ যোগ করিতেন। ইঁহাদের আদি নিবাস ছিল বর্ধমান জেলার কাটোয়া মহকুমার অন্ত গত ইন্দ্রাবনী বা ইন্দ্রাণী পরগণার কোন এক গ্রামে। গ্রামটির নাম কোন পুঁথিতে ‘সিঙ্গি’, কোন পুঁথিতে সিদ্ধি পাওয়া যায়। ঐ অঞ্চলে এই দুই নামেরই দুটি গ্রাম আছে। ‘সিদ্ধি’র দাবির পক্ষেই যুক্তি অধিক। তবে কমলাকান্ত দেব দেশত্যাগ করিয়া উড়িষ্যায় বসতি স্থাপন করিয়াছিলেন। সেখানেই কাশীরাম দাসের মহাভারত রচিত হয়।
বর্তমানে যে অষ্টাদশ-পর্ব মহাভারত কাশীরাম দাসের নামে প্রচলিত, তাঁহার সবখানিই কাশীরাম দাসের রচনা নহে। ইহার সমগ্র আদিপর্ব, সভাপর্ব ও বিরাটপর্ব এবং বনপর্বের কিয়দংশ কাশীরামের লেখনীনিঃসৃত। এই সাড়ে তিনটি পর্ব রচনা করিয়া কাশীরাম দাস পরলোকগমন করেন। তাঁহার সম্পর্কিত ভ্রাতুষ্পুত্র নন্দরাম দাস দাবি করিয়াছেন যে, কাশীরাম মৃত্যুকালে তাঁহার আরব্ধ কার্য শেষ করিবার ভার নন্দরামকেই দিয়া যান। নন্দরাম মহাভারতের আর কয়েকটি পর্ব রচনা করেন, কিন্তু তিনিও মহাভারত শেষ করিতে পারেন নাই। নন্দরাম ও অন্যান্য অনেক কবির রচনা হইতে খুশিমত অংশ নির্বাচন করিয়া কাশীরামের রচিত সাড়ে তিনটি পর্বের সহিত তাহা যোগ করিয়া গায়েনরা একটি অষ্টাদশ-পর্ব মহাভারত গড়িয়া তুলে। ইহাই “কাশীদাসী মহাভারত”। ইহার যে সমস্ত পর্ব কাশীরাম দাস লিখেন নাই, সেগুলিতে তাহাদের প্রকৃত রচয়িতাদেরই ভণিতা আদিতে ছিল, কিন্তু পরবর্তীকালে এই মহাভারতের লিপিকর, গায়ন ও প্রকাশকরা ঐসব কবির ভণিতা তুলিয়া দিয়া সর্বত্র কাশীরাম দাসের ভণিতা বসাইয়া দিয়াছেন। ফলে এখন সমগ্র মহাভারতখানিই কাশীরাম দাসের নামে চলিয়া যাইতেছে।
কাশীরাম দাসের মহাভারতের বিরাটপর্বের কোন কোন পুঁথিতে যে রচনাকালবাচক শ্লোক পাওয়া যায়, তাহা হইতে জানা যায় যে ঐ পর্বের রচনা ১৬০৪-০৫ খ্রীষ্টাব্দে সম্পূর্ণ হয়। কাশীরাম দাসের লেখা অন্যান্য পর্বগুলি ইহার কিছু আগে পরে রচিত হইয়াছিল বলিয়া ধরিয়া লওয়া যাইতে পারে। কাশীরাম দাসের অনুজ গদাধর দাস ১৬৪২ খ্রীষ্টাব্দে ‘জগন্নাথমঙ্গল’ নামে একটি কাব্য লিখিয়াছিলেন, এই কাব্যে তিনি কাশীরাম দাসের মহাভারত রচনার উল্লেখ করিয়াছেন। সুতরাং কাশীরাম দাসের রচিত পর্বগুলির রচনাকালের অধস্তন সীমা ১৬৪২ খ্রীষ্টাব্দ।
কাশীরাম দাসের রচিত পর্বগুলি হইতে বুঝা যায় যে, কাশীরাম একজন শ্রেষ্ঠ কবি ছিলেন। বিষ্ণুর মোহিনী-রূপ ধারণ, দ্রৌপদীর স্বয়ংবর-সভা প্রভৃতি বিষয়ের বর্ণনায় কাশীরাম অতুলনীয় দক্ষতার পরিচয় দিয়াছেন। কাশীরামের মহাভারত বাংলা দেশে অসামান্য জনপ্রিয়তা লাভ করিয়াছিল, এক কৃত্তিবাস ছাড়া আর কোন কবির রচনা অনুরূপ জনপ্রিয়তা লাভ করিতে পারে নাই। কৃত্তিবাসের রামায়ণের মত কাশীরাম দাসের মহাভারতও বাঙালীর জাতীয় কাব্য। কিন্তু কৃত্তিবাস শুধু বাংলা রামায়ণের শ্রেষ্ঠ রচয়িতা নহেন, সেই সঙ্গে আদি রচয়িতাও। পক্ষান্তরে কাশীরাম দাসের পূর্বেই অনেক কবি বাংলা মহাভারত রচনা করিয়া কাশীরামকে পথ প্রদর্শন করিয়াছিলেন। এই কারণে কাশীরাম দাসের অপেক্ষা কৃত্তিবাসের কৃতিত্ব অধিক।
কাশীরাম দাসের মহাভারত অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা লাভ করার ফলে তাঁহার পূর্ববর্তী কবিদের রচিত বাংলা মহাভারতগুলি অচিরে বিস্মৃতির জগতে চলিয়া গেল। কাশীরাম দাসের পরে সপ্তদশ শতকে ঘনশ্যাম দাস, অনন্ত মিশ্র, রাজেন্দ্র দাস, রামনারায়ণ দত্ত, রামকৃষ্ণ কবিশেখর, শ্রীনাথ ব্রাহ্মণ প্রভৃতি কবিগণ এবং অষ্টাদশ শতকে কবিচন্দ্র চক্রবর্তী, ষষ্ঠিবর সেন তৎপুত্র গঙ্গাদাস সেন, “জ্যোতিষ ব্রাহ্মণ” বাসুদেব, ত্রিলোচন চক্রবর্তী, দৈবকীনন্দন, কৃষ্ণরাম, রামনারায়ণ ঘোষ, লোকনাথ দত্ত প্রভৃতি কবিরা বাংলা মহাভারত রচনা করেন। অবশ্য সম্পূর্ণ মহাভারত খুব কম কবিই রচনা করিয়াছিলেন, অধিকাংশই মহাভারতের অংশবিশেষকে বাংলা রূপ দিয়া ক্ষান্ত হইয়াছেন। ইঁহাদের কাহারও রচনা বিশেষ জনপ্রিয় হইতে পারে নাই।
ভাগবত
রামায়ণ ও মহাভারতের মত ভাগবতেরও বাংলা অনুবাদ হইয়াছিল, তবে খুব বেশি হয় নাই। চৈতন্যদেবের সমসাময়িক এবং চৈতন্যদেবের দ্বারা ‘ভাগবতাচার্য’ উপাধিতে ভূষিত বরাহনগর-নিবাসী কবি রঘুনাথ পণ্ডিত ‘কৃষ্ণপ্রেমতরঙ্গিণী’ নাম দিয়া ভাগবতের অনুবাদ করেন; কিন্তু ভাগবতের বারটি স্কন্ধের মধ্যে প্রথম নয়টি স্কন্ধের তিনি সংক্ষিপ্ত ভাবানুবাদ করিয়াছিলেন এবং শেষ তিনটি স্কন্ধের আক্ষরিক অনুবাদ করিয়াছিলেন। ইহার পর আসামের ধর্মপ্রচারক শঙ্করদেব কামতারাজের আশ্রয়ে থাকিয়া ভাগবতের কয়েকটি স্কন্ধের অনুবাদ করিয়াছিলেন। সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগে সনাতন চক্রবর্তী নামে একজন কবি সমগ্র ভাগবতের বঙ্গানুবাদ করেন–১৬৫৯ খ্রীষ্টাব্দে তাঁহার অনুবাদ সম্পূর্ণ হয়। সপ্তদশ শতকের শেষ পাদে সনাতন ঘোষাল বিদ্যাবাগীশ নামে আর একজন কবি কটকে বসিয়া ভাগবতের প্রথম নয়টি স্কন্ধের আক্ষরিক অনুবাদ করেন; ইনি ছিলেন কলিকাতার ঘোষাল বংশের সন্তান।
