১১
অনুবাদ-সাহিত্য
রামায়ণ, মহাভারত, ভাগবত এবং অন্যান্য বহু সংস্কৃত গ্রন্থ বাংলায় অনূদিত হইয়াছিল। কিছু কিছু ফার্সী এবং হিন্দী বইও অনূদিত হইয়াছিল। তবে এই অনুবাদ প্রায়ই আক্ষরিক অনুবাদ নয়, ভাবানুবাদ। ইহাদের মধ্যে কবির স্বাধীন রচনা এবং বাংলা দেশের ঐতিহ্য অনুসারী মূলাতিরিক্ত বিষয় প্রায়ই দেখিতে পাওয়া যায়।
রামায়ণ
বাংলার অনুবাদ-সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার মধ্যে রামায়ণের কথাই প্রথমে বলিতে হয়। প্রথম বাংলা রামায়ণ-রচয়িতা কৃত্তিবাস সম্বন্ধে পূর্বেই আলোচনা করা হইয়াছে। ইহার পরে ষোড়শ শতকে রচিত শঙ্করদেব ও মাধব কন্দলীর রামায়ণের নাম উল্লেখ করা যাইতে পারে। শঙ্করদেব আসামের বিখ্যাত বৈষ্ণব ধর্মপ্রচারক। শূদ্র হইয়াও তিনি ব্রাহ্মণদের দীক্ষা দিতেন, এই অপরাধে তাঁহাকে স্বদেশে নিগৃহীত হইতে হয়। তখন তিনি কামতা (কোচবিহার) রাজ্যে পলাইয়া আসেন এবং কামতা-রাজের আশ্রয়ে অবশিষ্ট জীবন কাটাইয়া পরলোকগমন করেন। মাধব কন্দলী শঙ্করদেবের পূর্ববর্তী কবি। মহামাণিক্য বরাহ রাজার অনুরোধে তিনি ছয় কাণ্ড রামায়ণ রচনা করেন উত্তরকাণ্ডটি লেখেন শঙ্করদেব। প্রাচীন বাংলা ও প্রাচীন অসমীয়া ভাষার মধ্যে প্রায় কিছুই পার্থক্য ছিল না। এই কারণে, মাধব কন্দলী ও শঙ্করদেব আসামের অধিবাসী হইলেও ইঁহাদের রচিত রামায়ণকে প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত করা যাইতে পারে।
সপ্তদশ শতাব্দীর বাংলা রামায়ণ-রচয়িতাদের মধ্যে “অদ্ভুত আচার্য” নামে পরিচিত জনৈক কবির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইহার প্রকৃত নাম নিত্যানন্দ। প্রবাদ এই যে, সাত বৎসর বয়সে অক্ষরপরিচয়হীন অবস্থায় ইনি মুখে মুখে রামায়ণ রচনা করিয়াছিলেন; এই অদ্ভুত কাজ করিয়াছিলেন বলিয়া ইনি “অদ্ভুত আচার্য” নাম পাইয়াছিলেন; মতান্তরে, ইনি সংস্কৃত অদ্ভুত রামায়ণ অবলম্বনে বাংলা রামায়ণ লিখিয়াছিলেন বলিয়া ইহার নাম “অদ্ভুত-আচার্য” হইয়াছিল; আর একটি মত এই যে, ইহার নাম “অদ্ভুত আচার্য” আদপে ছিল না, লিপিকর-প্রমাদে “অদ্ভুত আশ্চর্য রামায়ণ” কথাটিই “অদ্ভুত আচার্য রামায়ণ”-এ পরিণত হইয়াছে এবং তাহা হইতেই সকলে ধরিয়া লইয়াছে যে কবির নাম “অদ্ভুত আচার্য”। সে যাহা হউক, “অদ্ভুত আচার্য” রচিত রামায়ণটি বেশ প্রশংসনীয় রচনা। ইহাতে সপত্নী সুমিত্রার সমব্যথিনী স্নেহময়ী কৌশল্যার চরিত্রটি যেরূপ জীবন্ত হইয়াছে, তাঁহার তুলনা বিরল। “অদ্ভুত আচার্য”র রামায়ণ এক সময়ে উত্তরবঙ্গে খুব জনপ্রিয় ছিল, ঐ অঞ্চলে তখন কৃত্তিবাসী রামায়ণের তেমন প্রচার ছিল না। বর্তমানে “অদ্ভুত আচার্য”র রামায়ণ তাঁহার জনপ্রিয়তা হারাইয়াছে বটে, তবে ইহার অনেক অংশ কৃত্তিবাসী রামায়ণের মধ্যে প্রবেশ করিয়া এখন কৃত্তিবাসেরই নামে চলিয়া যাইতেছে।
ইঁহারা ভিন্ন আরও অনেক বাঙালী কবি রামায়ণ রচনা করিয়াছিলেন। কয়েকজনের নাম এখানে উল্লিখিত হইল–দ্বিজ লক্ষ্মণ, কৈলাস বসু, ভবানী দাস, কবিচন্দ্র চক্রবর্তী, মহানন্দ চক্রবর্তী, গঙ্গারাম দত্ত, কৃষ্ণদাস। ১৭৬২ খ্রীষ্টাব্দে রচিত রামানন্দ ঘোষের রামায়ণের কিছু বৈশিষ্ট্য আছে; এই রামায়ণে রামানন্দ নিজেকে বুদ্ধদেবের অবতার বলিয়াছেন। ১৭৯০ খ্রীষ্টাব্দে আর একটি বাংলা রামায়ণের রচনা সম্পূর্ণ হইয়াছিল। এটি বাঁকুড়া-নিবাসী জগত্রাম বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁহার পুত্র রামপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় দুইজনে মিলিয়া রচনা করেন।
মহাভারত-কাশীরাম দাস
বাংলা মহাভারত রচনা শুরু হয় আলাউদ্দীন হোসেন শাহের রাজত্বকালে (১৪৯৩ ১৫১৯ খ্রীষ্টাব্দ)। হোসেন শাহ কর্ত্তৃক নিযুক্ত চট্টগ্রামের শাসনকর্ত্তা পরাগল খান মহাভারত শুনিতে খুব ভালবাসিতেন, কিন্তু সংস্কৃত মহাভারতের মর্ম ভালভাবে গ্রহণ করিতে পারিতেন না। তাই তিনি তাঁহার সভাকবি কবীন্দ্র পরমেশ্বরকে দিয়া একখানি বাংলা মহাভারত রচনা করান। এইটিই প্রথম বাংলা মহাভারত এবং সম্ভবত উত্তর ভারতে প্রচলিত কোন আধুনিক ভারতীয় ভাষায় লেখা প্রথম মহাভারত। কবীন্দ্র পরমেশ্বরের মহাভারতখানি সুখপাঠ্য, তবে সংক্ষিপ্ত।
পরাগল খানের পুত্র ছুটি খান (প্রকৃত নাম নসরৎ খান) ত্রিপুরার বিরুদ্ধে অভিযানে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন এবং তিনি দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গে হোসেন শাহের অধিকৃত অঞ্চলবিশেষের শাসনকর্ত্তা নিযুক্ত হইয়াছিলেন। তিনি জৈমিনি রচিত মহাভারতের অশ্বমেধ-পর্বের বিশেষ অনুরাগী ছিলেন। তাই তিনি তাঁহার সভাকবি শ্রীকর নন্দীকে দিয়া জৈমিনির অশ্বমেধ-পর্বকে বাংলায় ভাবানুবাদ করান। শ্রীকর নন্দীর এই মহাভারত হোসেন শাহের রাজত্বের শেষ দিকে-নসরৎ শাহের যৌবরাজ্য প্রাপ্তির পরে–রচিত হয়।
পূর্ববঙ্গের যে মহাভারতটির প্রচার সর্বাপেক্ষা অধিক ছিল, সেটির প্রায় আগাগোড়াই সঞ্জয়ের ভণিতা পাওয়া যায়। ইহা হইতে অনেকে মনে করেন এই মহাভারতের রচয়িতার নাম সঞ্জয়। কিন্তু অন্যান্য পণ্ডিতদের মতে এই সঞ্জয় মহাভারতের অন্যতম চরিত্র সঞ্জয় ভিন্ন আর কেহই নহে, তাঁহারই নামে ইহাতে কবি ভণিতা দিয়াছেন। শেষোক্ত মতই সত্য বলিয়া মনে হয়। কোন কোন পুঁথিতে লেখা আছে যে, হরিনারায়ণ দেব নামে জনৈক ভরদ্বাজ বংশীয় ব্রাহ্মণ সঞ্জয়’ নামের অন্তরালে নিজেকে গোপন রাখিয়া এই মহাভারত রচনা করিয়াছিলেন। দীনেশচন্দ্র সেনের মতে সঞ্জয়ের মহাভারত কবীন্দ্র পরমেশ্বরের মহাভারতের পূর্বে রচিত হয় এবং ইহাই প্রথম বাংলা মহাভারত। কিন্তু এই মতের সমর্থনে কোন যুক্তি নাই। কবীন্দ্র পরমেশ্বরের মহাভারতে উহার রচনার যে ইতিহাস পাওয়া যায়, তাহা হইতে স্পষ্ট বুঝিতে পারা যায় যে উহার পূর্বে অন্তত পূর্ববঙ্গে কোন বাংলা মহাভারত রচিত হয় নাই।
