অদ্বৈত ও তাঁহার পত্নী সীতাদেবীর জীবনী বর্ণনা করিয়া সংস্কৃত ও বাংলা ভাষায় কয়েকটি বই লেখা হইয়াছিল। বইগুলি অদ্বৈত ও সীতার সমসাময়িকত্ব দাবি করিলেও এগুলি অর্ব্বাচীন ও অপ্রামাণিক রচনা।
৮
বৈষ্ণব নিবন্ধ-সাহিত্য
বাংলার বৈষ্ণব সাহিত্যের একটি গৌণ শাখা নিবন্ধ-সাহিত্য। বৈষ্ণবদের পক্ষে প্রয়োজনীয় নানা বিষয় আলোচনা করিয়া ছোট বড় অনেকগুলি নিবন্ধ-গ্রন্থ বাংলায় রচিত হইয়াছিল।
ইহাদের মধ্যে এক শ্রেণীর নিবন্ধ-গ্রন্থে বৈষ্ণব ধর্ম, দর্শন ও রসশাস্ত্র সম্বন্ধীয় বিভিন্ন তত্ত্ব আলোচিত হইয়াছে। এই শ্রেণীর গ্রন্থগুলি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বৃন্দাবনের গোস্বামীদের রচনাবলী ও ‘‘চৈতন্যচরিতামৃত’কে অনুসরণ করিয়াছে, মাত্র অল্প কয়েকটি ক্ষেত্রে রচয়িতারা নিজেদের স্বাতন্ত্র্য দেখাইয়াছেন। এই শ্রেণীর নিবন্ধ-গ্রন্থের মধ্যে প্রধান কবিবল্লভের ‘রসকদম্ব’ (রচনাকাল ১৫৯৯ খ্রীষ্টাব্দ), রামগোপাল দাসের ‘রসকল্পবল্লী’ (রচনাকাল ১৬৭৩ খ্রীষ্টাব্দ) এবং রামগোপাল দাসের পুত্র পীতাম্বর দাসের ‘রসমঞ্জরী’ ও ‘অষ্টরসব্যাখ্যা’ (রচনাকাল সপ্তদশ শতকের শেষ ভাগ)।
আর এক শ্রেণীর নিবন্ধ-গ্রন্থে বৈষ্ণব ভক্তদের নামের তালিকা এবং গুরুশিষ্য পরম্পরা বর্ণিত হইয়াছে। এই জাতীয় রচনার মধ্যে দৈবকীনন্দনের ‘বৈষ্ণববন্দনা’ (রচনাকাল সোড়শ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ) এবং রামগোপালদাসের শাখানির্ণয়’ (রচনাকাল সপ্তদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ) উল্লেখ করা যাইতে পারে।
৯
বৈষ্ণব আখ্যানকাব্য
কৃষ্ণলীলা অবলম্বনে যে সমস্ত আখ্যানকাব্য রচিত হইয়াছিল সেগুলিও বৈষ্ণব সাহিত্যের অন্তর্গত। এই আখ্যানকাব্যগুলিকে ‘কৃষ্ণমঙ্গল’ বলা হয়।
চৈতন্য-পরবর্তী যুগের সর্বপ্রথম ও সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় ‘কৃষ্ণমঙ্গল কাব্যের রচয়িতা মাধবাচার্য। ইনি সম্ভবত চৈতন্যদেবের সমসাময়িক ছিলেন। কাহারও কাহারও মতে ইনি চৈতন্যদেবের শ্যালক ছিলেন; কিন্তু এই মতের সত্যতা সম্বন্ধে কোন প্রমাণ নাই।
মাধবাচার্যের শিষ্য কৃষ্ণদাসও একখানি ‘কৃষ্ণমঙ্গল’, রচনা করিয়াছিলেন। ইহার মধ্যে দানখণ্ড, নৌকাখণ্ড প্রভৃতি ভাগবতবহির্ভূত লীলা বর্ণিত হইয়াছে। কৃষ্ণদাস বলিয়াছেন যে তিনি ‘হরিবংশ’ হইতে এগুলি সগ্রহ করিয়াছেন। কিন্তু হরিবংশ’ পুরাণের বর্তমান-প্রচলিত সংস্করণে এগুলি পাওয়া যায় না। সম্ভবত সে যুগে ‘হরিবংশ’ নামে অন্য কোন সংস্কৃত গ্রন্থ ছিল এবং তাঁহার মধ্যে দানখণ্ড প্রভৃতি লীলা বর্ণিত ছিল।
কবিশেখরের ‘গোপালবিজয়’-ও ‘কৃষ্ণমঙ্গল’ কাব্য। এই বইটি ১৬০০ খ্রীষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে রচিত হইয়াছিল। গোপালবিজয়’ বৃহদায়তন গ্রন্থ এবং শক্তিশালী রচনা।
সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ভবানন্দ নামক জনৈক পূর্ববঙ্গীয় কবি ‘হরিবংশ’ নামে একখানি ‘কৃষ্ণমঙ্গল কাব্য রচনা করিয়াছিলেন। এই কাব্যটিতেও দানখণ্ড, নৌকাখণ্ড প্রভৃতি বর্ণিত হইয়াছে এবং কৃষ্ণদাসের মত ভবানন্দও বলিয়াছেন যে তিনি ব্যাসের ‘হরিবংশ’ হইতে এগুলি সংগ্রহ করিয়াছেন। কাব্যটি রচনা হিসাবে প্রশংসনীয়, তবে ইহাতে আদিরসের কিছু আধিক্য দেখা যায়।
এইসব ‘কৃষ্ণমঙ্গল’ ব্যতীত গোবিন্দ আচার্য, পরমানন্দ এবং দুঃখী শ্যামদাস রচিত ‘কৃষ্ণমঙ্গল’ গ্রন্থগুলিও উল্লেখযোগ্য। এই বইগুলি ষোড়শ শতাব্দীর রচনা। সপ্তদশ শতাব্দীর ‘কৃষ্ণমঙ্গল কাব্যগুলির মধ্যে পরশুরাম চক্রবর্তী রচিত ‘কৃষ্ণমঙ্গল’ ও পরশুরাম রায় রচিত “মাধবসঙ্গীত’-এর নামও উল্লেখ করা যাইতে পারে। অষ্টাদশ শতাব্দীর বিশিষ্টতম ‘কৃষ্ণমঙ্গল-রচয়িতা হইতেছেন “কবিচন্দ্র” উপাধিধারী শঙ্কর চক্রবর্তী; ইনি বিষ্ণুপুরের মল্লবংশীয় রাজা গোপালসিংহের (রাজত্বকাল ১৭১২-৪৮ খ্রীষ্টাব্দ) সভাকবি ছিলেন; ইহার ‘কৃষ্ণমঙ্গল কাব্য অনেকগুলি খণ্ডে বিভক্ত; প্রতি খণ্ডের অজস্র পুঁথি পাওয়া গিয়াছে; শঙ্কর চক্রবর্তী কবিচন্দ্র রামায়ণ, মহাভারত, ধর্মমঙ্গল ও শিবায়নও রচনা করিয়াছিলেন; ইঁহার লেখা কাব্যগুলির যত পুঁথি এ পর্যন্ত পাওয়া গিয়াছে, তত পুঁথি আর কোন বাংলা গ্রন্থে মিলে নাই।
১০
সহজিয়া সাহিত্য
“সহজিয়া” নামে (নামটি আধুনিককালের সৃষ্টি) পরিচিত সম্প্রদায়ের লোকেরা বাহ্যত বৈষ্ণব ছিলেন, কিন্তু ইহাদের দার্শনিক মত ও সাধন-পদ্ধতি দুইই গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের তুলনায় স্বতন্ত্র। ইহারা বিশ্বাস করিতেন যাহা কিছু তত্ত্ব ও দর্শন সবই মানুষের দেহে আছে। গৌড়ীয় বৈষ্ণবেরা পরকীয়া প্রেমকে সাধনার রূপক হিসাবে গ্রহণ করিয়াছেন, বাস্তব জীবনে গ্রহণ করেন নাই। কিন্তু সহজিয়া সাধকেরা বাস্তব জীবনেও পরকীয়া প্রেমের চর্চ্চা করিতেন, ইঁহাদের বিশ্বাস ছিল যে ইহারই মধ্য দিয়া সাধনায় সিদ্ধি লাভ করা সম্ভব। সহজিয়ারা মনে করিতেন যে, বিল্বমঙ্গল, জয়দেব, বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, রূপ, সনাতন, কৃষ্ণদাস কবিরাজ প্রভৃতি প্রাচীন সাধক ও কবিরা সকলেই পরকীয়া-সাধন করিতেন।
সহজিয়াদেরও একটি নিজস্ব সাহিত্য ছিল এবং তাঁহার পরিমাণ সুবিশাল। সহজিয়া-সাহিত্যকে দুইভাগে ভাগ করা যাইতে পারে-পদাবলী ও নিবন্ধ সাহিত্য। এ পর্যন্ত বহু সহজিয়া পদ ও সহজিয়া নিবন্ধ পাওয়া গিয়াছে। ইহাদের মধ্যে কিছু উৎকৃষ্ট রচনা থাকিলেও অধিকাংশই নিতান্ত অকিঞ্চিত্বর রচনা। অনেক রচনায় অশ্লীল ও রুচিবিগর্হিত উপাদানও দেখিতে পাওয়া যায়। সহজিয়া লেখকেরা নিজেদের রচনায় প্রায়ই রচয়িতা হিসাবে নিজেদের নাম না দিয়া বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, নরহরি সরকার, রঘুনাথ দাস, কৃষ্ণদাস কবিরাজ, নরোত্তম দাস প্রভৃতি প্রাচীন কবি ও গ্রন্থকারদের নাম দিতেন। নিজেদের নামে যাহারা সহজিয়া পদ ও নিবন্ধ লিখিয়াছেন, তাঁহাদের মধ্যে মুকুন্দদাস, তরুণীরমণ, বংশীদাস প্রভৃতির নাম উল্লেখ করা যাইতে পারে।
