জয়ানন্দের প্রায় সমসাময়িক কালেই লোচনদাস নামে জনৈক গ্রন্থকার ‘চৈতন্যমঙ্গল’ নামে আর একটি বাংলা চরিগ্রন্থ রচনা করেন। লোচনদাস ছিলেন চৈতন্যদেবের পার্ষদ নরহরি সরকারের শিষ্য। নরহরি সরকার ‘গৌরনগরবাদ’ নামে একটি নূতন মতবাদ প্রচার করিয়াছিলেন, এই মতবাদ অনুসারে চৈতন্যদেব শ্রীকৃষ্ণের অন্যান্য ভাবের মত নাগরভাবেও ভাবিত হইতেন। লোচনদাসের ‘চৈতন্যমঙ্গলে’ এই গৌরনগরবাদের প্রতিফলন দেখা যায়। লোচনদাস প্রধানত মুরারি গুপ্তের গ্রন্থ অনুসরণ করিয়া চৈতন্যচরিত বর্ণনা করিয়াছেন। মুরারি গুপ্তের গ্রন্থের বহির্ভূত যে সমস্ত সংবাদ লোচনদাস তাঁহার গ্রন্থে দিয়াছেন, সেগুলির ঐতিহাসিক মূল্য সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া যায় না। লোচনদাস প্রথম শ্রেণীর কবি ছিলেন, সেই জন্য তাঁহার ‘চৈতন্যমঙ্গলের’ কাব্যমূল্য অসামান্য।
ষোড়শ শতাব্দীতে চূড়ামণিদাস নামে আর একজন গ্রন্থকার ‘গৌরাঙ্গবিজয়’ নামে একখানি বাংলা চরিগ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন। এই গ্রন্থে তথ্যের তুলনায় কল্পনা প্রাধান্য লাভ করিয়াছে। বইটির মধ্যে অলৌকিক বর্ণনার খুব বেশি নিদর্শন পাওয়া যায়।
এইসব গ্রন্থকারের পরে কৃষ্ণদাস কবিরাজ ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ নামক বিখ্যাত বাংলা চরিগ্রন্থ রচনা করেন। কৃষ্ণদাস কবিরাজের নিবাস ছিল কাটোয়ার নিকটবর্তী ঝামটপুর গ্রামে। যৌবনে তিনি সংসার ত্যাগ করিয়া বৃন্দাবনে চলিয়া যান এবং ছয় গোস্বামী–অর্থাৎ রূপ, সনাতন, জীব, রঘুনাথ দাস, রঘুনাথ ভট্ট ও গোপাল ভট্টের নিকটে শিক্ষা গ্রহণ করেন। কৃষ্ণদাস সংস্কৃত ভাষায় কৃষ্ণলীলা অবলম্বনে ‘গোবিন্দলীলামৃত’ নামক মহাকাব্য এবং বিল্বমঙ্গলের ‘কৃষ্ণকৰ্ণামৃতের টীকা ‘সারঙ্গরঙ্গদা’ রচনা করেন। বৃদ্ধ বয়সে তিনি বৃন্দাবনের মহান্তদের অনুরোধে ‘‘চৈতন্যচরিতামৃত’ রচনা করেন। ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ তিনটি খণ্ডে বিভক্ত আদিলীলা, মধ্যলীলা ও অন্ত্যলীলা; ইহার মধ্যে ‘আদিলীলা’য় চৈতন্যদেবের সন্ন্যাসগ্রহণ অবধি জীবনকাহিনী, ‘মধ্যলীলা’য় সন্ন্যাসগ্রহণের পরবর্তী ছয় বৎসরের তীর্থপর্যটন এবং অন্ত্যলীলা’য় অবশিষ্ট জীবন বর্ণিত হইয়াছে, তবে চৈতন্যদেবের মৃত্যুর বর্ণনা ইহাতে নাই। কৃষ্ণদাস কবিরাজ মুরারি গুপ্তের কড়চা, স্বরূপদামোদরের কড়চা (বর্তমানে পাওয়া যায় না) এবং বৃন্দাবনদাসের ‘চৈতন্যভাগবত’ হইতে তাঁহার গ্রন্থের উপকরণ সংগ্রহ করিয়াছেন। বৃন্দাবনদাসের ‘চৈতন্যভাগবতে’ যে সমস্ত বিষয় বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হইয়াছে, তাহাদের অধিকাংশই কৃষ্ণদাস সংক্ষেপে উল্লেখ করিয়া কর্তব্য শেষ করিয়াছেন। অন্য বিষয়গুলি তিনি বিশদভাবে বর্ণনা করিয়াছেন। ‘চৈতন্যচরিতামৃতে’র আর একটি বৈশিষ্ট্য এই যে গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম্মের সমস্ত মূল তত্ত্ব ইহার মধ্যে সংক্ষেপে বর্ণিত হইয়াছে। এইজন্য এই গ্রন্থ শুধু চৈতন্যদেবের জীবনচরিত-গ্রন্থ হিসাবেই উল্লেখযোগ্য নহে, দর্শন-গ্রন্থ। হিসাবেও ইহার একটি বিশিষ্ট মূল্য আছে। এই গ্রন্থের কাব্যমূল্যও অপরিসীম। নীলাচলে বাসের সময়ে চৈতন্যদেবের ‘দিব্যোন্মাদ’ অবস্থার যে বর্ণনা কৃষ্ণদাস দিয়াছেন, তাহা প্রথম শ্রেণীর কাব্য। ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ গ্রন্থের আর একটি বৈশিষ্ট্য এই যে, ইহার মধ্যে লেখক অত্যন্ত সহজ সরল ভাষায় অত্যন্ত জটিল দার্শনিক তত্ত্বকে অবলীলাক্রমে বর্ণনা করিয়াছেন। ইহা তাঁহার অসামান্য কৃতিত্বের পরিচয়। ‘চৈতন্যচরিতামৃতের ভাষায় স্থানে স্থানে হিন্দী ভাষার প্রভাব দেখা যায়, লেখক দীর্ঘকাল বৃন্দাবনে বাস করিয়াছিলেন বলিয়াই এইরূপ হইয়াছে। কৃষ্ণদাস কবিরাজ অসাধারণ বিনয়ী লোক ছিলেন, ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ গ্রন্থে নানাভাবে তিনি নিজের দৈন্য প্রকাশ করিয়াছেন। চৈতন্যচরিগ্রন্থগুলির মধ্যে ‘চৈতন্যচরিতামৃত নানা দিক দিয়াই শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করিতে পারে। তবে ইহার একমাত্র ত্রুটি এই যে, ইহার মধ্যে অলৌকিক বর্ণনার কিছু আধিক্য দেখা যায়।
‘চৈতন্যচরিতামৃতে’র পরেও আরও কয়েকটি চৈতন্যচরিতগ্রন্থ রচিত হইয়াছিল, কিন্তু সেগুলি তেমন উল্লেখযোগ্য নহে। তবে ব্রজমোহন দাসের ‘চৈতন্যতত্ত্ব-প্রদীপ’, নিত্যানন্দদাসের ‘প্রেমবিলাস’, মনোহর দাসের অনুরাগবল্লী’, নরহরি চক্রবর্তীর ‘ভক্তিরত্নাকর’ ও ‘নরোত্তমা বিলাস’ প্রভৃতি গ্রন্থের নাম এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যাইতে পারে। শেষ চারখানি গ্রন্থে অনেক বৈষ্ণব মহান্তের জীবনী এবং বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের ইতিহাস বর্ণিত হইয়াছে। ‘প্রেমবিলাস’-রচয়িতা নিত্যানন্দদাস ছিলেন নিত্যানন্দের স্ত্রী জাহ্নবী দেবীর শিষ্য; এই বইটি সপ্তদশ শতকের গোড়ার দিকেই রচিত হইয়াছিল, তবে ইহার মধ্যে পরবর্তীকালে অনেক প্রক্ষিপ্ত উপাদান প্রবেশ করিয়াছে। মনোহর দাসের ‘অনুরাগবল্লী’ ১৬৯৬ খ্রীষ্টাব্দে রচিত হয়; ইহার মধ্যে মুখ্যত শ্রীনিবাস আচার্যের জীবনী বর্ণিত হইয়াছে। নরহরি চক্রবর্তীর ‘ভক্তিরত্নাকর’ সুবিশাল গ্রন্থ; ইহার মধ্যে প্রমাণ সহযোগে শ্রীনিবাস আচার্য প্রমুখ বৈষ্ণব আচার্যদের জীবনী ও বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের ইতিহাস বর্ণিত হইয়াছে, অধুনালুপ্ত কয়েকটি গ্রন্থ সমেত বহু গ্রন্থ হইতে উদ্ধৃতি দেওয়া হইয়াছে, জীব গোস্বামী ও নিত্যানন্দের পুত্র বীরভদ্র গোস্বামীর লেখা কয়েকটি পত্র অবিকলভাবে উদ্ধৃত করা হইয়াছে এবং নবদ্বীপ ও বৃন্দাবনের বিশদ ও উজ্জ্বল বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে। এই সমস্ত কারণে ‘ভক্তিরত্নাকর’-এর মূল্য অপরিসীম। নরহরি চক্রবর্তীর অপর গ্রন্থ ‘নরোত্তমবিলাস’ ক্ষুদ্রতর গ্রন্থ, ইহার মধ্যে নরোত্তম দাসের জীবনী বর্ণিত হইয়াছে। নরহরি চক্রবর্তীর দুইটি গ্রন্থই অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে রচিত হইয়াছিল। তিনি ‘শ্রীনিবাসচরিত্র’ নামে অধুনালুপ্ত আর একটি গ্রন্থ লিখিয়াছিলেন।
