ষোড়শ শতকের আর একজন বিখ্যাত পদকর্ত্তা বলরাম দাস। ইনি ব্রজবুলী ও বাংলা উভয় ভাষাতেই পদ রচনা করিতেন, কিন্তু ইহার বাংলা পদগুলিই উৎকৃষ্ট। বলরাম দাস বিশেষভাবে বাৎসল্য-রসাত্মক পদ রচনায় দক্ষতার পরিচয় দিয়াছেন। এই পদগুলিতে শিশু-কৃষ্ণের জন্য যশোদার মাতৃহৃদয়ের আর্তিকে বলরাম দাস অপূর্বভাবে রূপায়িত করিয়াছেন।
সপ্তদশ শতকের পদকর্ত্তাদের মধ্যে রামগোপালদাস বা গোপালদাসের নাম উল্লেখ করা যাইতে পারে। ইহার পদগুলি ভাষার সারল্য ও ভাবের গভীরতার দিক দিয়া চণ্ডীদাসের পদকে স্মরণ করায়। গোপালদাসের কোন কোন পদ চণ্ডীদাসের নামেই চলিয়া গিয়াছে। গোপালদাস ‘রসকল্পবল্লী’ নামে একটি বৈষ্ণব রসতত্ত্ব বিষয়ক গ্রন্থ এবং বৈষ্ণবদের শাখানির্ণয়’ অর্থাৎ গুরুশিষ্যপরম্পরা-বর্ণন-গ্রন্থও রচনা করিয়াছিলেন।
অষ্টাদশ শতকের পদকর্ত্তাদের মধ্যে দুইজনের নাম উল্লেখযোগ্য নরহরি চক্রবর্তী এবং জগদানন্দ। নরহরি চক্রবর্তীর নামান্তর ঘনশ্যাম। ইনি ভক্তি রত্নাকর’ প্রভৃতি বিখ্যাত চরিতগ্রন্থের রচয়িতা। নরহরির পদে ভাষা ও ছন্দের ঝঙ্কার প্রাধান্য লাভ করিলেও ভাবগভীরতার পরিচয়ও স্থানে স্থানে পাওয়া যায়। জগদানন্দ একজন অসাধারণ শব্দকুশলী কবি। ইহার পদগুলি শব্দের ঝঙ্কার এবং অনুপ্রাসের চমৎকারিত্বের জন্য মনোহরণ করে। জগদানন্দের অধিকাংশ পদই ব্রজবুলী ভাষায় রচিত।
যাঁহাদের কথা বলা হইল, ইঁহারা ভিন্ন আরও অসংখ্য কবি পদাবলী রচনা করিয়াছিলেন। তাঁহাদের মধ্যে অনন্তদাস, বংশীবদন, যাদবেন্দ্র, দীনবন্ধুদাস, যদুনন্দনদাস, গোবিন্দদাস চক্রবর্তী প্রভৃতি কবিদের রচনায় বৈশিষ্ট্যের পরিচয় পাওয়া যায়।
সপ্তদশ শতকের শেষভাগ হইতে পদাবলী চয়ন-গ্রন্থের মধ্যে সঙ্কলিত হইতে থাকে। চারিটি পদসঙ্কলন-গ্রন্থের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য–(১) বিশ্বনাথ কবিরাজের ‘ক্ষণদাগীতচিন্তামণি’ (সঙ্কলনকাল সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ দশক), (২) নরহরি চক্রবর্তীর ‘গীতচন্দ্রোদয়’ (সঙ্কলনকাল অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম পাদ), (৩) রাধামোহন ঠাকুরের ‘পদসমুদ্র’ এবং (৪) বৈষ্ণবদাস অর্থাৎ গোকুলানন্দ সেনের ‘পদকল্পতরু’ (সঙ্কলনকাল অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ) ইহাদের মধ্যে ‘পদকল্পতরু সর্বাপেক্ষা বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কলনগ্রন্থ।
অষ্টাদশ শতাব্দী হইতেই পদাবলী-সাহিত্যের অবনতি দেখা দেয়। ভাব এবং আঙ্গিক উভয় ক্ষেত্রে ক্রমাগত পুনরাবৃত্তি হইতে থাকায় এই শতকের শেষে পদাবলী-সাহিত্য একেবারে নিষ্প্রাণ ও কৃত্রিম হইয়া পড়ে।
পদাবলী-সাহিত্য বাংলা সাহিত্যের অপূর্ব গৌরবের সামগ্রী। ইহার মধ্যে মানব-জীবনের প্রেম ও কেদনার সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্যগুলি অপার্থিব আধ্যাত্মিকতায় মণ্ডিত হইয়া যেভাবে অপূর্ব শিল্পসুষমার মধ্য দিয়া অভিব্যক্তি লাভ করিয়াছে, তাঁহার তুলনা বিরল। শতাব্দীর পর শতাব্দী চলিয়া গিয়াছে, কিন্তু এই অমৃতনিস্যন্দী পদগুলির আকর্ষণ প্রথম রচনার সময়ে যেমন ছিল, আজও প্রায় তেমনই আছে।
৭
চরিত-সাহিত্য
চৈতন্যদেবের জীবন-চরিত বর্ণনা করিয়া সংস্কৃত ও বাংলা ভাষায় অনেকগুলি গ্রন্থ রচিত হইয়াছিল। এই গ্রন্থগুলি এদেশের সাহিত্যে এক নতুন দিগন্ত উদ্ঘাটন করিল। কেবল দেবদেবীকে লইয়া নহে, মানুষের বাস্তব জীবনকাহিনী লইয়াও যে গ্রন্থ রচনা করা যাইতে পারে, ইহাদের মধ্য দিয়া তাহাই প্রমাণিত হইল। অবশ্য জীবন-চরিত হিসাবে এই গ্রন্থগুলি আদর্শস্থানীয় নহে। কারণ ইহাদের লেখকেরা সকলেই ভক্ত ছিলেন, চৈতন্যদেবকে তাঁহারা মানুষ হিসাবে দেখেন নাই, দেখিয়াছেন ভগবান হিসাবে। তাঁহার ফলে চৈতন্যদেবের মানবতা ইহাদের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে ফোটে নাই। এই সব গ্রন্থের মধ্যে স্থানে স্থানে অলৌকিক বর্ণনার নিদর্শন পাওয়া যায়, তাঁহার ফলে বাস্তবতার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হইয়া পড়িয়াছে। তবে সে যুগের কবিদের রচনায়, বিশেষত ভক্ত কবিদের রচনায় এই সমস্ত বৈশিষ্ট্য থাকা অপরিহার্য। এগুলি উপেক্ষা করিয়া বিশ্লেষণী দৃষ্টি লইয়া অগ্রসর হইলে ইহাদের মধ্য হইতে অকৃত্রিম তথ্য আবিষ্কার করা দুরূহ নয়।
চৈতন্যদেবের সর্বপ্রথম জীবনচরিত-গ্রন্থ মুরারি গুপ্ত রচিত ‘শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য চরিতামৃতম্’। সংস্কৃত ভাষায় লেখা এই বইটি সাধারণের কাছে ‘মুরারি গুপ্তের কড়চা’ নামে পরিচিত। মুরারি গুপ্ত প্রথম জীবনে চৈতন্যদেবের সহপাঠী ছিলেন, পরে তাঁহার পার্ষদ হন। সুতরাং তাঁহার লেখা এই চৈতন্যজীবনী-গ্রন্থটির মূল্য স্বাভাবিকভাবেই খুব বেশি।…
ইহার পরবর্তী বাংলা চৈতন্যচরিতগ্রন্থ জয়ানন্দের ‘চৈতন্যমঙ্গল’। জয়ানন্দ ১৫১০ খ্রীষ্টাব্দের মত সময়ে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন এবং অতি শৈশবে চৈতন্যদেবের দর্শন ও আশীর্বাদ লাভ করিয়াছিলেন। তাঁহার ‘জয়ানন্দ’ নামও চৈতন্যদেবের দেওয়া। ১৫৪৮ হইতে ১৫৬০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে জয়ানন্দ ‘চৈতন্যমঙ্গল’ রচনা করেন। জয়ানন্দের ‘চৈতন্যমঙ্গলে’ চৈতন্যদেব সম্বন্ধে অনেক নূতন তথ্য পাওয়া যায়। চৈতন্যদেবের তিরোধান সম্বন্ধে অন্য চরিতগ্রন্থগুলি হয় নীরব নাহয় অলৌকিক উক্তিতে পূর্ণ; কেবল জয়ানন্দই এ সম্বন্ধে বিশ্বাসগ্রাহ্য বিবরণ লিপিবদ্ধ করিয়াছেন; তিনি লিখিয়াছেন যে চৈতন্যদেবের মৃত্যুর মূল কারণ কীর্তনের সময় পায়ে ইট লাগিয়া আহত হওয়া। অবশ্য এ কথা সত্য কিনা, তাহা বলা যায় না। জয়ানন্দ যে তাঁহার গ্রন্থে চৈতন্যদেব সম্বন্ধে অনেক ভুল সংবাদ দিয়াছেন, তাহাও অস্বীকার করা চলে না। জয়ানন্দের ‘চৈতন্যমঙ্গলেও সে যুগের সমাজ সম্বন্ধে অনেক তথ্য পাওয়া যায়।
