দ্বিতীয় কবিশেখর শ্রীকৃষ্ণের অষ্টকালীন লীলা বর্ণনা করিয়া দণ্ডাত্মিকা পদাবলী নামে একটি পদসমষ্টি গ্রন্থও রচনা করিয়াছিলেন। কবিশেখর’ ব্যতীত ‘শেখর’ ও রায়শেখর’ ভণিতাতেও ইনি পদ লিখিতেন। ইনি বাংলা ও ব্রজবুলী উভয় ভাষায় বহু সংখ্যক পদ রচনা করিয়াছিলেন। তন্মধ্যে ব্রজবুলী ভাষায় রচিত পদগুলিই উৎকৃষ্ট। কতকগুলি পদে কবিশেখর বর্ষার রাত্রির এবং রাধার অভিসার ও বিরহের বর্ণনা দিয়াছেন। এই পদগুলি খুব উচ্চাঙ্গের রচনা। এই কবিশেখরের কোন কোন পদ (যেমন ‘ভরা বাদর মাহ ভাদর’) ভ্রমবশত মৈথিল বিদ্যাপতির রচনা বলিয়া মনে করা হইয়া থাকে।
পদাবলী-সাহিত্যের আর একজন শ্রেষ্ঠ কবি জ্ঞানদাস। ইনি ১৫২০ খ্রীষ্টাব্দের মত সময়ে জন্মগ্রহণ করেন। ইনি নিত্যানন্দের শিষ্য। ভক্তিরত্নাকর’ নামক গ্রন্থের মতে জ্ঞানদাসের নিবাস ছিল বর্তমান বর্ধমান জেলার অন্তর্গত কাঁদড়া গ্রামে। জ্ঞানদাস বাংলা ও ব্রজবুলী দুই ভাষাতেই পদ লিখিয়াছিলেন, তবে তাঁহার বাংলা পদগুলিই উদ্ধৃষ্টতর। জ্ঞানদাস বিশেষভাবে ‘পূর্বরাগ’ ও ‘আক্ষেপানুরাগ’ বিষয়ক পদ রচনাতেই দক্ষতার পরিচয় দিয়াছেন। পূর্বরাগের পদে তিনি প্রেমাস্পদের জন্য রাধার অন্তরের তীব্র আর্তি ও ব্যাকুলতা অপরূপভাবে ফুটাইয়া তুলিয়াছেন। আক্ষেপানুরাগের পদে প্রেমের কণ্টকাকীর্ণ পথে পদার্পণ করার দরুণ রাধার আক্ষেপকে জ্ঞানদাস সুন্দরভাবে রূপায়িত করিয়াছেন। জ্ঞানদাসের পদগুলি রচনা-বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়া চণ্ডীদাস-নামাঙ্কিত পদগুলির সমধর্মী; ইহাদের ভাব অত্যন্ত গম্ভীর হইলেও ভাষা অত্যন্ত সরল ও প্রসাদগুণমণ্ডিত। জ্ঞানদাস নারীর হৃদয়ের কথাকে নারীর বাচনভঙ্গীর মধ্য দিয়া নিখুঁতভাবে রূপায়িত করিয়াছেন। জ্ঞানদাস একজন বিশিষ্ট বৈষ্ণব সাধক ছিলেন, চৈতন্যদেব ছিলেন তাঁহার উপাস্য দেবতা। এইজন্য চৈতন্যদেবের প্রভাব তাঁহার রচনার মধ্যে খুব বেশি পড়িয়াছে। জ্ঞানদাস তাঁহার পদের মধ্যে রাধার যে চিত্র আঁকিয়াছেন, তাঁহার উপরে বহু স্থানেই চৈতন্যদেবের মূর্ত্তির ছায়া পড়িয়াছে। জ্ঞানদাসের বহু উৎকৃষ্ট পদ পরবর্তীকালে চণ্ডীদাসের নামে চলিয়া গিয়াছে।
আর একজন শ্রেষ্ঠ পদকর্ত্তা–অনেকের মতে সর্বশ্রেষ্ঠ পদকর্ত্তা-গোবিন্দদাস কবিরাজ। ইহার জীবৎকাল আনুমানিক ১৫২৫-১৬১০ খ্রীষ্টাব্দ। ইনি শ্রীখণ্ডের বৈদ্য বংশে জন্মগ্রহণ করেন। ইঁহার পিতা চিরঞ্জীব সেন হোসেন শাহের “অধিপাত্র” এবং চৈতন্যদেবের অন্যতম পার্ষদ ছিলেন। অল্প বয়সে পিতৃবিয়োগ হওয়ার ফলে গোবিন্দদাস এবং তাঁহার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রামচন্দ্র শক্তিধর্ম্মাবলম্বী মাতামহের আশ্রয়ে মানুষ হন এবং মাতামহের প্রভাবে নিজেরাও শক্তিধর্ম গ্রহণ করেন। কিন্তু পরিণত বয়সে শ্রীনিবাস আচার্যের কাছে তাঁহারা বৈষ্ণব ধর্ম্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন। অতঃপর গোবিন্দদাস পদাবলী রচনায় ব্রতী হন। তাঁহার অপূর্ব সুন্দর পদ আস্বাদন করিয়া বৃন্দাবনের মহান্তরা তাঁহাকে কবিরাজ’ উপাধি দেন। জীব গোস্বামীও তাঁহার পদের প্রশংসা করিয়া তাহাকে পত্র লিখিয়াছিলেন।
গোবিন্দদাস কবিরাজ প্রধানত ব্রজবুলী ভাষায় পদ রচনা করিয়া গিয়াছেন। তাঁহার পদগুলির কাব্যমাধুর্য অতুলনীয়। পূর্বরাগ এবং অনুরাগের বর্ণনায় তিনি প্রেমের সূক্ষ্ম ভাববৈচিত্র্য অপূর্বভাবে ফুটাইয়া তুলিয়াছেন। কিন্তু গোবিন্দদাস সর্বাপেক্ষা দক্ষতার পরিচয় দিয়াছেন অভিসার বিষয়ক পদে। বিশেষত তাঁহার বর্ষাভিসার সম্বন্ধীয় পদগুলির তুলনা হয় না, এই সব পদের শব্দঝঙ্কারের মধ্য দিয়া বর্ষার ছন্দ আশ্চর্যভাবে ঝঙ্কত হইয়া উঠিয়াছে। গোবিন্দদাস অভিসারের বহু নূতন নূতন পরিবেশ সৃষ্টি করিয়া মৌলিকতা দেখাইয়াছেন। গোবিন্দদাস ‘গৌরচন্দ্রিকা পদ রচনাতেও অপূর্ব দক্ষতার পরিচয় দিয়াছেন; বিভিন্ন পর্যায়ের পদাবলী গাহিবার পূর্বে গায়কেরা চৈতন্যদেবের ঐ পর্যায়ের ভাবে ভাবিত হওয়া বিষয়ক একটি পদ গাহিয়া লন; এই পদগুলিকেই ‘গৌরচন্দ্রিকা’ বলা হয়; ‘গৌরচন্দ্রিকা পদের শ্রেষ্ঠ কবি গোবিন্দদাস। গোবিন্দদাস ভাষা, শব্দপ্রয়োগ, ছন্দ ও অলঙ্কারের ক্ষেত্রে অসামান্য নৈপুণ্যের পরিচয় দিয়াছেন; বাণী-সৌষ্ঠব ও আঙ্গিক-পারিপাট্যের দিক দিয়া তাঁহার পদগুলি তুলনারহিত বলিলেও অত্যুক্তি হয় না।
গোবিন্দদাসের সমসাময়িক অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি তাঁহার গুণগ্রাহী ছিলেন। ইঁহাদের মধ্যে অন্যতম যশোহরের রাজা প্রতাপাদিত্য এবং পক্কপল্লীর (পাইকপাড়া) রাজা হরিনারায়ণ।
গোবিন্দদাসের সমসাময়িক আর একজন বিশিষ্ট পদকর্ত্তা নরোত্তম দাস। ইনি উত্তরবঙ্গের জনৈক ধনী ভূস্বামীর পুত্র। যৌবনে সন্ন্যাসগ্রহণ করিয়া ইনি বৃন্দাবনে গিয়া লোকনাথ গোস্বামীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। পরে ইনি শ্রীনিবাস আচার্যের সঙ্গে বাংলা দেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং এ দেশে বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার করিতে থাকেন। নরোত্তম বাঙালীর একান্ত পরিচিত ঘরোয়া ভাষায় পদ রচনা করিতেন; পদগুলি অনাড়ম্বর সৌন্দর্যের জন্য আমাদের মনোহরণ করে। প্রার্থনা বিষয়ক পদে নরোত্তম সর্বাপেক্ষা দক্ষতার পরিচয় দিয়াছেন। এই পদগুলির মধ্যে ভক্তহৃদয়ের আকুতি মর্মস্পর্শী অভিব্যক্তি লাভ করিয়াছে। নরোত্তম কয়েকটি গ্রন্থও রচনা করিয়াছিলেন। তাহাদের মধ্যে প্রেমভক্তিচন্দ্রিকা সর্বাপেক্ষা বিখ্যাত।
