বাংলার বৈষ্ণব সাহিত্যের সমৃদ্ধি বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য শাখাকেও প্রভাবিত করিয়াছিল, তাই ঐ সমস্ত শাখাতেও চৈতন্য-পরবর্তী কালে উন্নততর সৃষ্টির অজস্র ফসল ফলিয়াছিল। ( মোটের উপর, ষোড়শ শতাব্দী হইতে বাংলা সাহিত্যে যে সৃষ্টির বান ডাকিয়াছিল, চৈতন্যদেবই তাঁহার প্রধান কারণ। এই কারণে সাহিত্যস্রষ্টা না হইয়াও চৈতন্যদেব বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি বিশিষ্ট আসন অধিকার করিয়া আছেন।
৬
পদাবলী-সাহিত্য
পদাবলী-সাহিত্য প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। বৈষ্ণব পদগুলির মধ্যে প্রেমের যে অপূর্ব মধুর ভক্তিসমণ্ডিত রূপায়ণ দেখা যায়, তাঁহার তুলনা বিরল। এ কথা সত্য যে, চৈতন্যদেবের আবির্ভাবের পূর্বেও বাংলা দেশে কৃষ্ণলীলা-বিষয়ক পদ রচিত হইয়াছে। কিন্তু চৈতন্য-পূর্ববর্তী কবিরা পদ লিখিয়াছেন নিজেদের স্বাধীন কবি-প্রেরণার বশবর্তী হইয়া এবং তাঁহাদের রচিত পদের সংখ্যা খুব বেশি নহে। কিন্তু চৈতন্য-পরবর্তী পদকর্ত্তাদের অধিকাংশই বৈষ্ণব সাধক ছিলেন। তাঁহাদের পদের উপরে তাঁহাদের সাধনার প্রভাব পড়াতে তাহা একটি অভিনব বৈশিষ্ট্য লাভ করিয়াছে এবং পদ-রচনাও তাঁহাদের সাধনার অঙ্গস্বরূপ বলিয়া তাঁহারা স্বতই অনেক বেশি পদ রচনা করিয়াছেন। এই জন্য বাংলার চৈতন্য পরবর্তী যুগের পদাবলী-সাহিত্য অনন্যসাধারণ বিশালতা লাভ করিয়াছে।
বিষয়বস্তু ও রসের দিক দিয়া পদাবলী-সাহিত্যে বৈচিত্র্য অপরিসীম। শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য, মধুর প্রভৃতি বিভিন্ন রসের অসংখ্য পদাবলী বাংলা দেশে রচিত হইয়াছিল। ইহাদের মধ্যে মধুর রসের রাধাকৃষ্ণবিষয়ক পদই সংখ্যায় সর্বাধিক। রাধাকৃষ্ণবিষয়ক পদগুলির মধ্যে সম্ভোগ ও বিপ্রলম্ভ উভয় পর্যায়েরই রচনা পাওয়া যায়। সম্ভোগ পর্যায়ের পদগুলিতে অভিসার, মিলন, মান প্রভৃতি এবং বিপ্রলম্ভ পর্যায়ের পদগুলিতে র্বরাগ, বিরহ, মাথুর প্রভৃতি স্তর বর্ণিত হইয়াছে।
বাঙালী কবিদের লেখা বৈষ্ণব পদগুলির সমস্তই অবিমিশ্র বাংলা ভাষায় রচিত নহে। অনেক পদ “ব্রজবুলী” নামে পরিচিত এক কৃত্রিম সাহিত্যিক ভাষায় লেখা। বিদ্যাপতির পদের, বিশেষভাবেতাঁহার যে সব পদ বাংলা দেশে প্রচলিত, তাহাদের ভাষার সহিত এই ব্রজবুলী ভাষার মিল খুব বেশি। ব্রজবুলী ভাষার উদ্ভব কীভাবে হইয়াছিল, সে প্রশ্ন রহস্যাবৃত। অনেকের মতে বিদ্যাপতিই এই ব্রজবুলী ভাষার সৃষ্টিকর্ত্তা। কিন্তু এই মত গ্রহণযোগ্য নহে; কারণ, প্রথমত, পৃথিবীর ইতিহাসে কোথাও এরকম দৃষ্টান্ত দেখা যায় না যে একজন মাত্র তোক একটি ভাষা সৃষ্টি করিলেন এবং সেই ভাষায় শত শত লোক পরবর্তী কালে সাহিত্য সৃষ্টি করিল; দ্বিতীয়ত, বিদ্যাপতির পূর্বেও কোন কোন কবি ব্রজবুলী ভাষায় পদ লিখিয়াছিলেন মনে করিবার সঙ্গত কারণ আছে। আবার কেহ কেহ মনে করেন বিদ্যাপতির খাঁটি মৈথিল ভাষায় লেখা পদগুলির ভাষা বিকৃত করিয়া মিথিলা হইতে প্রত্যাগত বাঙালী ছাত্রেরা বাংলা দেশে প্রচার করিয়াছিলেন এবং এই বিকৃত ভাষাই ব্রজবুলী; কিন্তু এই মতও গ্রহণ করা যায় না; কারণ প্রথমত, বাংলা দেশের শ্রেষ্ঠ কবিরা
একটি বিকৃত ভাষায় পদ লিখিবেন, ইহা বিশ্বাসযোগ্য নহে; দ্বিতীয়ত, পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ দিক হইতে একই সঙ্গে বাংলা, আসাম, ত্রিপুরা ও উড়িষ্যায় ব্রজবুলী ভাষায় পদ রচনার নিদর্শন পাওয়া যাইতেছে। সব জায়গাতেই মিথিলা হইতে প্রত্যাগত ছাত্রেরা একইভাবে বিদ্যাপতির পদের ভাষাকে বিকৃত করিয়াছে বলিয়া কল্পনা করা যায় না। ব্রজবুলীর উদ্ভব সম্বন্ধে তৃতীয় মত এই যে, আধুনিক ভারতীয় ভাষাসমূহ উদ্ভূত হইবার পরেও কেবল সাহিত্যসৃষ্টির মাধ্যম হিসাবে যে “অর্ব্বাচীন অপভ্রংশ” ভাষার প্রচলন ছিল, সেই ভাষাই ক্রমবিবর্তনের ফলে অবহট্ট ভাষায় এবং অবহট্ট ভাষা আবার ক্রমবিবর্তনের ফলে ব্রজবুলী ভাষায় পরিণত হইয়াছে। এই মত যুক্তিসঙ্গত বলিয়া মনে হয়।
চৈতন্যপরবর্তী যুগের পদকর্ত্তাদের মধ্যে কয়েকজনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইঁহাদের মধ্যে সময়ের দিক দিয়া প্রথম হইতেছেন যশোরাজ খান, মুরারি গুপ্ত, নরহরি সরকার, বাসুদেব ঘোষ ও কবিশেখর। যশোরাজ খান হোসেন শাহের অন্যতম কর্মচারী ছিলেন এবং ঐ সুলতানের নাম উল্লেখ করিয়া ব্রজবুলী ভাষায় একটি পদ লিখিয়াছিলেন; বাংলা দেশে প্রাপ্ত ব্রজবুলী ভাষায় লেখা প্রাচীনতম পদ এইটিই। মুরারি গুপ্ত চৈতন্যদেবের সহপাঠী ছিলেন, পরে তাঁহার ভক্ত হন, তাঁহার লেখা কয়েকটি উৎকৃষ্ট পদ পাওয়া গিয়াছে। নরহরি সরকার চৈতন্যদেবের বিশিষ্ট পার্ষদ ছিলেন, তিনি প্রথম জীবনে ব্রজলীলা অবলম্বনে পদ রচনা করিতেন, কিন্তু চৈতন্যদেবের অভ্যুদয়ের পরে তিনি কেবল চৈতন্যদেব সম্বন্ধেই পদ রচনা করিয়া অবশিষ্ট জীবন অতিবাহিত করেন। বাসুদেব ঘোষও চৈতন্যদেবের অন্যতম পার্ষদ ছিলেন, তিনি চৈতন্যদেবের লীলা সম্বন্ধে বহুসংখ্যক পদ রচনা করিয়াছিলেন।
কবিশেখর সম্ভবত দুইজন ছিলেন। একজন কবিশেখর—’কবিরঞ্জন’ ও ‘বিদ্যাপতি’ ভণিতায়ও পদ রচনা করিতেন। ইহার প্রকৃত নাম রঞ্জন। পদ রচনায় ইঁহার উৎকর্ষের জন্য সকলে ইঁহাকে ‘ছোট বিদ্যাপতি’ বলিত। ইনি প্রথম জীবনে হোসেন শাহ, নসরৎ শাহ, গিয়াসুদ্দীন মাহমুদ শাহ প্রভৃতি সুলতানের কর্মচারী ছিলেন; ঐ সমস্ত সুলতানের নাম উল্লেখ করিয়া তিনি কয়েকটি পদ লিখিয়াছিলেন। পরে তিনি বৈষ্ণব হন এবং শ্রীখণ্ডের রঘুনন্দন গোস্বামীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। দ্বিতীয় কবিশেখর ‘গোপালের কীর্তন অমৃত’ ও ‘গোপীনাথ-বিজয় নাটক’ নামে দুইখানি গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন, এই দুইটি গ্রন্থ পাওয়া যায় নাই। ইহা ভিন্ন তিনি কৃষ্ণলীলা বিষয়ক একটি বৃহৎ আখ্যানকাব্য লিখিয়াছিলেন, তাঁহার নাম ‘গোপালবিজয়’; এই কবিশেখরের প্রকৃত নাম দৈবকীনন্দন সিংহ, ইঁহার পিতার নাম চতুর্ভুজ, মাতার নাম হীরাবতী। যতদূর মনে হয়, ইনি ষোড়শ-সপ্তদশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বর্তমান ছিলেন। ইনিও রঘুনন্দনের শিষ্য ছিলেন।
