চৈতন্যদেব মালাধর বসুর ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ কাব্য আস্বাদন করিয়া মুগ্ধ হইয়াছিলেন। নীলাচলে তিনি মালাধর বসুর পুত্র সত্যরাজ খানের কাছে ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’-এর একটি চরণ (“নন্দের নন্দন কৃষ্ণ মোর প্রাণনাথ”) আবৃত্তি করিয়া বলেন যে এই বাক্যটি রচনার জন্য তিনি গুণরাজ খানের বংশের কাছে বিক্রীত হইয়া থাকিবেন; তিনি আরও বলিয়াছিলেন যে মালাধর বসুর গ্রামের কুকুরও তাঁহার নিকট অন্য লোকের অপেক্ষা প্রিয়। চৈতন্যদেবের এই প্রশংসার জন্যই মালাধর বাংলার বৈষ্ণবদের হৃদয়ে শ্রদ্ধার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হইয়াছেন।
৫
চৈতন্যদেব
চৈতন্যদেব ১৪৮৬ খ্রীষ্টাব্দের ১৮ই ফেব্রুয়ারি তারিখে নবদ্বীপে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার পিতার নাম জগন্নাথ মিশ্র, মাতার নাম শচী দেবী। চৈতন্যদেবের পূর্বপুরুষদের নিবাস ছিল শ্রীহট্ট। চৈতন্যদেবের পূর্ব-নাম বিশ্বম্ভর, ডাক-নাম নিমাঞি বা নিমাই।
শৈশবে নিমাই অত্যন্ত দুরন্ত প্রকৃতির ছিলেন। ছাত্র হিসাবে তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। অল্প বয়সেই পণ্ডিত হইয়া তিনি নবদ্বীপে টোল খুলিয়া বসেন এবং সেখানে ব্যাকরণ পড়াইতে থাকেন। তিনি প্রথমে লক্ষ্মীদেবীকে বিবাহ করেন, কিন্তু বিবাহের কিছুদিন পর লক্ষ্মীদেবীর মৃত্যু হওয়াতে তিনি বিষ্ণুপ্রিয়া দেবীর পাণিগ্রহণ করেন।
তেইশ বৎসর বয়সে গয়ায় পিতার পিণ্ড দিতে গিয়া নিমাই পণ্ডিত বিষ্ণুর পাদপদ্ম দর্শন করেন এবং তাহাতেই তাঁহার ভাবান্তর উপস্থিত হয়। এখন হইতে তিনি হরিভক্তিতে বিভোর হইয়া পড়েন। ইহার পর নবদ্বীপে ফিরিয়া তিনি এক বৎসর বন্ধু ও ভক্তদের লইয়া হরিনাম সঙ্কীর্তন করেন। বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি তাঁহার পার্ষদশ্রেণীভুক্ত হন। ইহাদের মধ্যে ছিলেন শান্তিপুরনিবাসী প্রবীণ বৈষ্ণব আচার্য অদ্বৈত, বীরভূমের একচাকা গ্রামের হাড়াই ওঝার পুত্র অবধূত নিত্যানন্দ, বৈষ্ণবধর্ম্মান্তরিত মুসলমান হরিদাস ঠাকুর, নিমাই পণ্ডিতের সহপাঠী ও চরিতকার মুরারি গুপ্ত প্রভৃতি। এইসব ভক্তরা নিমাইকে ঈশ্বর বলিয়া গ্রহণ করেন।
এক বৎসর সঙ্কীর্তন করার পর নিমাই সন্ন্যাস গ্রহণ করিলেন এবং ‘শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য’ (সংক্ষেপে শ্রীচৈতন্য বা চৈতন্যদেব) নাম গ্রহণ করিলেন। ইহার পর তিনি নীলাচল বা পুরীতে চলিয়া গেলেন। পরবর্তী ছয় বৎসর তিনি তীর্থভ্রমণ করেন এবং তাঁহার পর একাদিক্রমে আঠারো বৎসর নীলাচলে শ্রীকৃষ্ণের ধ্যান করিয়া অতিবাহিত করিবার পর সাতচল্লিশ বৎসর ছয় মাস বয়সে–১৫৩৩ খ্রীষ্টাব্দের ১০ই অগস্ট তারিখে তিনি পরলোকগমন করেন। তাঁহার জীবকালে সহস্র সহস্র লোক তাঁহার ভক্তশ্রেণীভুক্ত হইয়াছিলেন; প্রতি বৎসর রথযাত্রার সময়ে ভক্তেরা নীলাচলে যাইতেন তাঁহাকে দর্শন করিবার জন্য।
চৈতন্যদেব বৈষ্ণবধর্মকে এক নতুন রূপ দেন; এই নতুন বৈষ্ণব ধর্ম ‘গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম’ নামে পরিচিত। এই ধর্ম্মের মূল কথা সংক্ষেপে এই–শ্রীকৃষ্ণই একমাত্র ঈশ্বর ও আরাধ্য, কিন্তু তিনি প্রেমময়; তাঁহাকে লাভ করিতে হইলে তিনি যে ঈশ্বর, সে কথা ভুলিয়া তাঁহাকে ভালবাসিতে হইবে। এই ভালবাসার প্রাথমিক স্তর ভক্তি, তাঁহার অপেক্ষাও উক্তৃষ্ট দাস্যপ্রেম, তাঁহার অপেক্ষাও উৎকৃষ্ট সখ্যপ্রেম, তাঁহার অপেক্ষাও উৎকৃষ্ট বাৎসল্যপ্রেম এবং সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট কান্তাপ্রেম। কান্ত প্রেমের মধ্যে আবার স্বকীয়া প্রেমের তুলনায় পরকীয়া প্রেম শ্রেষ্ঠ, কারণ পরকীয়া প্রেমের মধ্যে যে তীব্রতা ও চিরনবীনতা রহিয়াছে, স্বকীয়া প্রেমে তাহা নাই। এই কারণে কৃষ্ণের সমস্ত ভক্তদের মধ্যে পরকীয়া প্রেমের নায়িকা গোপীদের স্থান সর্বোচ্চে, গোপীদের মধ্যে আবার রাধাই শ্রেষ্ঠা, কারণ কৃষ্ণ তাঁহার প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট। তত্ত্বের দিক দিয়া রাধা সর্বশক্তিমান কৃষ্ণের হ্লাদিনী অর্থাৎ আনন্দদায়িনী শক্তি; শক্তি ও শক্তিমান অভিন্ন, সুতরাং রাধা ও কৃষ্ণও অভিন্ন, কিন্তু লীলারস আস্বাদনের জন্য দুই রূপ ধারণ করিয়াছেন। রাধাকৃষ্ণের লীলা নিত্য, ভক্তেরা এই লীলা শ্রবণ-কীর্তন-চরণ-বন্দন করিবে, ইহাই তাহাদের সাধনার মুখ্য অঙ্গ।
গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম্মের তত্ত্বের পরিকল্পনা চৈতন্যদেবের, অবশ্য উপরে বর্ণিত তত্ত্বগুলির সবটাই চৈতন্যদেবের দান বলিয়া মনে হয় না। ‘চৈতন্যভাগবত’ প্রভৃতি প্রাচীন চৈতন্যচরিতগ্রন্থে রাধার কোন উল্লেখ নাই। যাহা হউক, এই ধর্মকে বিস্তৃত ভাষ্যের মধ্য দিয়া চূড়ান্ত রূপ দান করিয়াছেন বৃন্দাবনের গোস্বামীরা। ইঁহাদের মধ্যে রূপ-সনাতন ভ্রাতৃযুগল ও তাঁহাদের ভ্রাতৃম্পুত্র জীব প্রধান।
চৈতন্যদেব কর্ত্তৃক প্রবর্তিত ও বৃন্দাবনের গোস্বামীগণ কর্ত্তৃক ব্যাখ্যাত বৈষ্ণবধর্ম অচিরেই বাংলা দেশে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করিল। ইহার ফলে বাংলা সাহিত্যও বিশেষভাবে সমৃদ্ধি লাভ করিল। পূর্বেই বলা হইয়াছে যে গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম্মে ভক্তের সাধনার মুখ্য অঙ্গ রাধা-কৃষ্ণ-লীলা শ্রবণ-কীর্তন-স্মরণ-বন্দন। এই শ্রবণ-কীর্তন-স্মরণ-বন্দন-গানের মধ্য দিয়া যতটা সুষ্ঠুভাবে করা সম্ভব, অন্য কোনভাবে ততখানি করা সম্ভব নহে; তাই বৈষ্ণব ভক্তদের মধ্যে যাঁহারা কবি ছিলেন, তাঁহারা কৃষ্ণলীলা অবলম্বনে অসংখ্য গান বা পদ লিখিতে লাগিলেন; বহু পদই খুব উৎকৃষ্ট হইল; এইভাবে বাংলার বিশাল ও সমৃদ্ধ পদাবলী-সাহিত্য গড়িয়া উঠিল। চৈতন্যদেবের জীবন-চরিত অবলম্বনেও অনেকগুলি বৃহৎ ও সুন্দর গ্রন্থ রচিত হইল; এইভাবে বাংলা সাহিত্যের এক নতুন শাখা-চরিত-সাহিত্য সৃষ্ট হইল। ইহা ভিন্ন কৃষ্ণলীলা অবলম্বনে অনেক আখ্যানকাব্য রচিত হইল এবং গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম্মের তত্ত্ব ব্যাখ্যা করিয়া, বৈষ্ণব ভক্তদের গুরু-শিষ্য পরম্পরা বর্ণনা করিয়া অনেকগুলি ক্ষুদ্র ও বৃহৎ গ্রন্থ লিখিত হইল। চৈতন্যদেব আবির্ভূত না হইলে এইসব রচনাগুলির কোনটিই রচিত হইত না। অথচ এইসব রচনাগুলিই প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সম্পদ এবং ইহাদের পরিমাণও সুবিশাল। সুতরাং দেখা যাইতেছে যে চৈতন্যদেব স্বয়ং বাংলা ভাষায় কিছু না লিখিলেও তিনি বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণযুগ সৃষ্টি করিয়া গিয়াছেন।
