তৃতীয় প্রমাণ, রুকনুদ্দীন বারবক শাহ বিদ্যা ও সাহিত্যের একজন বিখ্যাত পৃষ্ঠপোষক। ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’-কার মালাধর বসু, অমরকোষটীকা ‘পদচন্দ্রিকা’র রচয়িতা রায়মুকুট বৃহস্পতি মিশ্র, ফার্সী শব্দকোষ শরফ নামা’র সঙ্কলয়িতা ইব্রাহিম কায়ুম ফারুকী প্রভৃতি তাঁহার নিকট পৃষ্ঠপোষণ লাভ করিয়াছিলেন। সুতরাং অন্য গৌড়েশ্বর অপেক্ষা তাঁহারই নিকটে কৃত্তিবাসের সংবর্ধনা লাভ করা বেশি স্বাভাবিক।
অতএব কৃত্তিবাস যে রুকনুদ্দীন বারবক শাহেরই সভায় গিয়াছিলেন ও তাঁহারই নিকট সংবর্ধনা লাভ করিয়াছিলেন, এইরূপ সিদ্ধান্ত খুবই যুক্তিসঙ্গত। এই সম্বন্ধে গৌণ প্রমাণও কতকগুলি আছে, বাহুল্যবোধে সেগুলি উল্লেখ করা হইল না।
মহাকবি কৃত্তিবাসের নাম বাঙালীর অমূল্য সম্পত্তি। তাঁহার রচিত মূল রামায়ণ আজ অবিকৃতভাবে পাওয়া যাইতেছে না, ইহা অত্যন্ত দুঃখের বিষয়। কিন্তু আর এক দিক দিয়া ইহা কবির পক্ষে অত্যন্ত গৌরবের বিষয়, কারণ কৃত্তিবাসের কাব্যের জনপ্রিয়তা ও প্রচার যে কত অসাধারণ হইয়াছিল, তাহা ইহা হইতেই বুঝা যায়; সাধারণ কবির বা জনপ্রিয়তাহীন কবির রচনা এইভাবে যুগে যুগে লোকহস্তে পরিবর্তন লাভ করে না। অসামান্য জনপ্রিয়তা ভিন্ন কৃত্তিবাসের পক্ষে আর একটি গর্বের বিষয় এই যে, তিনি শুধু বাংলা রামায়ণের প্রথম রচয়িতা নহেন, শ্রেষ্ঠ রচয়িতাও। সাধারণত সাহিত্যের কোন ধারার প্রবর্তক ঐ ধারার শ্রেষ্ঠ স্রষ্টা হন না। কৃত্তিবাস ইহার উজ্জ্বল ব্যতিক্রম।
কৃত্তিবাসের রচিত মূল রামায়ণ কী রকম ছিল, সে সম্বন্ধে নিশ্চিত করিয়া কিছু বলা যায় না। তবে এইটুকু স্বচ্ছন্দে বলা যাইতে পারে যে, তিনি বাল্মীকির রামায়ণকে অবিকলভাবে অনুসরণ করেন নাই। বাল্মীকি-রামায়ণ বহির্ভূত রামলীলা বিষয়ক অনেক কাহিনী বহু পূর্ব হইতে বাংলা দেশে প্রচলিত ছিল, কৃত্তিবাস নিঃসন্দেহে তাহাদের অনেকগুলিকে তাঁহার রামায়ণের মধ্যে স্থান দিয়াছিলেন। কৃত্তিবাসী রামায়ণের বর্তমান-প্রচলিত সংস্করণে রাম, সীতা, লক্ষ্মণ প্রভৃতি চরিত্রের মধ্যে যে বাঙালীসুলভ কোমলতা দেখিতে পাওয়া যায়, কৃত্তিবাসের মূল রচনার মধ্যেও চরিত্রগুলির এই বৈশিষ্ট্য ছিল বলিয়া অনুমান করা যাইতে পারে। বর্তমান প্রচলিত সংস্করণের তুলনায় কৃত্তিবাসের মূল রচনা যে কতকটা সংক্ষিপ্ত ছিল তাহাতে কোন সন্দেহ নাই, কারণ ইহার বিভিন্ন সময়ে লিপিকৃত পুঁথিগুলির তুলনা করিলে দেখা যায় প্রাচীনতর পুঁথিগুলির তুলনায় অর্ব্বাচীন পুঁথিগুলি অপেক্ষাকৃত বিপুলকলেবর; যতই দিন গিয়াছে, ততই ইহার মধ্যে উত্তরোত্তর প্রক্ষিপ্ত উপাদান প্রবেশ করিয়াছে এবং বর্ণনাগুলি পল্লবিত হইয়াছে।
৪
মালাধর বসু
মালাধর বসু ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ নামক কাব্য রচনা করিয়া খ্যাতি অর্জন করিয়াছেন; কাব্যটির মধ্যে শ্রীমদ্ভাগবতের অনুসরণে শ্রীকৃষ্ণের বৃন্দাবনলীলা বর্ণিত হইয়াছে। এই কাব্যের অনেক স্থানে শ্রীমদ্ভাগবতের অংশবিশেষের অনুবাদ দেখিতে পাওয়া যায়, ‘হরিবংশের প্রভাবও কোথাও কোথাও দেখা যায়। কিন্তু কাব্যটির মধ্যে কবির স্বাধীন রচনার নিদর্শনও যথেষ্ট পরিমাণে মিলে।
‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’-এর প্রাচীন পুঁথিতে ইহার যে রচনাকালবাচক শ্লোক পাওয়া যায়, তাহা হইতে জানা যায় যে, এই কাব্যের রচনা ১৩৯৫ শকাব্দে (১৪৭৩-৭৪ খ্রীষ্টাব্দ) আরম্ভ হয় এবং ১৪০২ শকাব্দে (১৪৮০-৮১ খ্রীষ্টাব্দ) শেষ হয়। মালাধর বসু গৌড়েশ্বরের নিকট ‘গুণরাজ খান’ উপাধি লাভ করিয়াছিলেন। স্বনাম অপেক্ষা এই উপাধি দ্বারাই তিনি বিশেষভাবে পরিচিত। ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়ে’র শুরু হইতে শেষ পর্যন্ত মালাধর ‘গুণরাজ খান’ নামে ভণিতা দিয়াছেন। সুতরাং কাব্যের রচনা আরম্ভ করিবার পূর্বে তিনি ‘গুণরাজ খান’ উপাধি লাভ করিয়াছিলেন, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। ১৩৯৫ শকাব্দে (১৪৭৩-৭৪ খ্রীষ্টাব্দ) গৌড়েশ্বর ছিলেন রুকনুদ্দীন বারবক শাহ। অতএব মালাধর বারবক শাহের কাছেই যে ‘গুণরাজ খান’ উপাধি লাভ করিয়াছিলেন, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই।
মালাধর বসুর নিবাস ছিল কাটোয়ার কুলীনগ্রামে। তিনি জাতিতে কায়স্থ ছিলেন। তাঁহার পিতার নাম ভগীরথ, মাতার নাম ইন্দুমতী। মালাধর বসুর সত্যরাজ খান ও রামানন্দ নামে দুই পুত্র ছিলেন। ইহারা পরে চৈতন্যদেবের বিশিষ্ট পার্ষদ হইয়াছিলেন এবং প্রতি বৎসর রথযাত্রার সময় নীলাচলে গিয়া ইহারা চৈতন্যদেবকে দর্শন করিয়া আসিতেন।
মালাধর বসুর ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ অত্যন্ত সরল ও সুখপাঠ্য রচনা। মালাধর শুধু কবি ছিলেন না, ভক্তও ছিলেন। ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’-এর অনেক স্থানে তাঁহার ভক্ত হৃদয়ের ছাপ পড়িয়াছে। বাংলার চৈতন্যপূর্ববর্তী যুগের বৈষ্ণব ভক্তির স্বরূপ সম্বন্ধে খানিকটা আভাস ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয় হইতে পাওয়া যায়। ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’-এর আর একটি প্রশংসনীয় বিষয় এই যে, ইহার মধ্যে অনেক স্থানে ভারতীয় অধ্যাত্মতত্ত্বের সারকথাগুলি অত্যন্ত সংক্ষেপে সরল ভাষায় বর্ণিত হইয়াছে।
‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ কাব্যে কিছু কিছু অভিনব বিষয়ের নিদর্শন পাওয়া যায়। রাধার সখী ও কৃষ্ণের সখাদের যে সমস্ত নাম বাংলা দেশে প্রচলিত (যেমন বৃন্দা, ললিতা, অনুরাধা, বিশাখা, শ্রীদাম, সুদাম, সুবল প্রভৃতি), তাহাদের দুই একটি ভিন্ন অন্যগুলি বাংলার বাহিরে পরিচিত নহে; প্রাচীন পুরাণে বা কাব্যেও সেগুলি মিলে না, এই সমস্ত নামের অধিকাংশেরই উল্লেখ মালাধর বসুর ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়ে’ সর্বপ্রথম পাওয়া যায়।
