কৃত্তিবাস কোন সময়ে আবির্ভূত হইয়াছিলেন, সে সম্বন্ধে বিভিন্ন সূত্র হইতে কিছু কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ধ্রুবানন্দের ‘মহাবংশাবলী’ প্রভৃতি কুলজী-গ্রন্থে কৃত্তিবাস ও তাঁহার পূর্বপুরুষদের এবং তাঁহার অনেক আত্মীয়ের নাম পাওয়া যায়; কৃত্তিবাসের পূর্বপুরুষ ও আত্মীয়দের মধ্যে অনেকে কুলীন ব্রাহ্মণদের ‘সমীকরণ, ‘মেল বন্ধন’ প্রভৃতি সামাজিক অনুষ্ঠানগুলিতে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। এই সব সামাজিক অনুষ্ঠানের সময় সম্বন্ধে মোটামুটি যে আভাস পাওয়া যায়, তাহা হইতে কৃত্তিবাসের আবির্ভাবকাল সম্বন্ধে এইটুকু মাত্র অনুমান করা যায় যে, কৃত্তিবাস পঞ্চদশ শতাব্দীর কোন এক সময়ে বর্তমান ছিলেন।
কৃত্তিবাসের আত্মকাহিনী হইতেও তাঁহার আবির্ভাবকাল নির্ণয়ের চেষ্টা হইয়াছে। আত্মকাহিনীর প্রথম ছত্রে উল্লিখিত “বেদানুজ মহারাজকে কেহ ত্রয়োদশ শতাব্দীর রাজা দনুজমাধবের সহিত, আবার কেহ পঞ্চদশ শতাব্দীর রাজা দনুজমর্দনের সহিত অভিন্ন ধরিয়াছেন এবং তাহা হইতে কৃত্তিবাসের সময় নির্ধারণের চেষ্টা করিয়াছেন। আবার কেহ কেহ কৃত্তিবাসের জন্ম-তিথি “আদিত্যবার শ্রীপঞ্চমী পুণ্য মাঘ মাস” (এবং তাঁহার ভ্রান্ত পাঠান্তর “আদিত্যবার শ্রীপঞ্চমী পূর্ণ মাঘ মাস”) এর উপর নির্ভর করিয়াছেন এবং কতক কল্পনা, কতক জ্যোতিষ গণনার আশ্রয় লইয়া কৃত্তিবাসের একটা “জন্মসাল” স্থির করিয়াছেন। এই সমস্ত সিদ্ধান্ত কল্পনাভিত্তিক বলিয়া ইহাদের কোন মূল্য নাই।
কৃত্তিবাস যে গৌড়েশ্বরের সভায় গিয়াছিলেন, তাঁহার নাম তিনি উল্লেখ করেন নাই; না করাই স্বাভাবিক, কারণ আমরা এখনও পর্যন্ত সমসাময়িক রাজাদের কথা বলিবার সময় তাঁহার রাজপদবীরই উল্লেখ করি, নামের উল্লেখ করি না। যাহা হউক, পরোক্ষ প্রমাণের সাহায্যে কৃত্তিবাসের সংবর্ধনাকারীর পরিচয় আবিষ্কারের অনেকে চেষ্টা করিয়াছেন। কোন কোন পণ্ডিতের মতে এই গৌড়েশ্বর রাজা গণেশ; ইঁহাদের যুক্তি এই যে, কৃত্তিবাস গৌড়েশ্বরের যে সমস্ত সভাসদের উল্লেখ করিয়াছেন, তাঁহাদের সকলেই হিন্দু; সুতরাং গৌড়েশ্বরও হিন্দু; যেহেতু চতুর্দ্দশ পঞ্চদশ শতকে রাজা গণেশ ভিন্ন অন্য কোন হিন্দু গৌড়েশ্বরকে পাওয়া যাইতেছে।
, অতএব ইনি রাজা গণেশ। কিন্তু কৃত্তিবাস গৌড়েশ্বরের মাত্র ৮/৯ জন সভাসদের নাম করিয়াছেন; গৌড়েশ্বরের সভায় অন্তত ৬০/৭০ জন সভাসদ উপস্থিত ছিলেন; কৃত্তিবাস মাত্র কয়েকজন স্বধর্মী রাজসভাসদের উল্লেখ করিয়াছেন বলিয়া গৌড়েশ্বরের সমস্ত সভাসদই যে হিন্দু ছিলেন, তাহা বলার কোন অর্থ হয় না; সুতরাং ইহা হইতে গৌড়েশ্বরের হিন্দু হওয়াও প্রমাণিত হয় না। তাঁহার পর, কোন কোন পণ্ডিতের মতে কৃত্তিবাস-বর্ণিত গৌড়েশ্বর তাহিরপুরের ভূস্বামী রাজা কংসনারায়ণ; তিনি প্রকৃত গৌড়েশ্বর না হইলেও কৃত্তিবাস তাঁহাকে স্তাবকতা করিয়া গৌড়েশ্বর বলিয়াছেন। ইঁহাদের যুক্তি এই–কৃত্তিবাস গৌড়েশ্বরের যে সমস্ত সভাসদের উল্লেখ করিয়াছেন তাহাদের মধ্যে মুকুন্দ, জগদানন্দ ও নারায়ণ–এই তিনটি নাম পাওয়া যায়; এদিকে কুলজী-গ্রন্থে মুকুন্দ, জগদানন্দ ও নারায়ণ নামে কংসনারায়ণের তিনজন আত্মীয়ের উল্লেখ পাওয়া যাইতেছে; সুতরাং কংসনারায়ণই কৃত্তিবাস-উল্লিখিত গৌড়েশ্বর। কিন্তু এই মত সমর্থন করা কঠিন; কারণ, প্রথমত আত্মকাহিনীর মধ্যে কৃত্তিবাসের যে নির্লোভ ও তেজস্বী মনের পরিচয় পাওয়া যায়, তাহাতে তিনি একজন সাধারণ ভূস্বামীকে “গৌড়েশ্বর” বলিবেন, ইহা সম্ভবপর বলিয়া মনে হয় না; দ্বিতীয়ত, কংসনারায়ণের সময় সম্বন্ধে কিছুই জানা নাই; তৃতীয়ত, কংসনারায়ণের আত্মীয় মুকুন্দ জগদানন্দের পিতামহ ছিলেন বলিয়া কুলজী-গ্রন্থে উক্ত হইয়াছে, কিন্তু কৃত্তিবাসের আত্মকাহিনীতে উল্লিখিত রাজসভাসদ মুকুন্দ জগদানন্দের পুত্র (“মুকুন্দ রাজার পণ্ডিত প্রধান সুন্দর। জগদানন্দ রায় মহাপাত্রের কোঙর ॥”)। সুতরাং আলোচ্য মতের ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল।
কৃত্তিবাসের সংবর্ধনাকারী গৌড়েশ্বরকে হিন্দু বলিবার কোন কারণ নাই। তিনি যে মুসলমান নহেন, সে কথা জোর করিয়া বলিবারও কোন হেতু নাই। আসলে এই গৌড়েশ্বর যে রুকনুদ্দীন বারবক শাহ, সে সম্বন্ধে অনেক প্রমাণ আছে।
প্রথম প্রমাণ, কৃত্তিবাসের আত্মকাহিনীতে গৌড়েশ্বরের কেদার রায় ও নারায়ণ নামে দুইজন সভাসদের উল্লেখ পাওয়া যায়; রুকনুদ্দীন বারবক শাহের অধীনে এই দুই নামের দুইজন রাজপুরুষ ছিলেন; নারায়ণ ছিলেন বারবক শাহের চিকিৎসক; ইনি চৈতন্যদেবের পার্ষদ মুকুলের পিতা; ইহার নাম চূড়ামণি দাসের ‘গৌরাঙ্গবিজয়’ ও ভরত মল্লিকের চন্দ্রপ্রভাতে পাওয়া যায়, কেদার রায় ছিলেন বারবক শাহের অত্যন্ত বিশ্ব রাজপুরুষ, ইনি মিথিলা বা ত্রিহুতে বারবক শাহের প্রতিনিধি নিযুক্ত হইয়াছিলেন; বর্ধমান উপাধ্যায়ের ‘দণ্ডবিবেক ও মুল্লা তকিয়ার ‘বয়াজে’ ইঁহার নাম পাওয়া যায়।
দ্বিতীয় প্রমাণ, জয়ানন্দের ‘চৈতন্যমঙ্গল হইতে জানা যায় যে, হরিদাস ঠাকুর যখন ফুলিয়া হইতে নীলাচলে যান, তখন মুরারি, দুর্গাবর ও মনোহরের বংশে জাত কুলীননন্দন সুষেণ পণ্ডিত হরিদাসকে বিদায় দিয়াছিলেন; এই ঘটনা আনুমানিক ১৫১৬ খ্রীষ্টাব্দের। এদিকে ধ্ৰুবানন্দের মহাবংশাবলী’র মতে কৃত্তিবাসের সুষেণ নামে এক সম্পর্কিত পৌত্র (কৃত্তিবাসের পিতৃব্য অনিরুদ্ধের প্রপৌত্র) ছিলেন; এই সুষেণের বৃদ্ধ প্রপিতামহ, জ্যেষ্ঠতাত ও পিতার নাম যথাক্রমে মুরারি, দুর্গাবর ও মনোহর; ইনিও ফুলিয়ানিবাসী কুলীন ব্রাহ্মণ। সুতরাং এই সুষেণ ও জয়ানন্দ উল্লিখিত সুষেণ পণ্ডিত যে অভিন্ন, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। সুষেণ পণ্ডিত যখন ১৫১৬ খ্রীষ্টাব্দের মত সময়ে জীবিত ছিলেন, তখন তাঁহার পিতামহ-স্থানীয় কৃত্তিবাস গড়পড়তা হিসাবে তাঁহার পঞ্চাশ বৎসর পূর্বে, অর্থাৎ ১৪৬৬ খ্রীষ্টাব্দের মত সময়ে জীবিত ছিলেন বলিয়া ধরা যায়; ১৪৬৬ খ্রীষ্টাব্দে রুকনুদ্দীন বারবক শাহই গৌড়েশ্বর ছিলেন।
