৩
কৃত্তিবাস
কৃত্তিবাস সর্বপ্রথম বাংলা ভাষায় রামায়ণ রচনা করেন। তাঁহার মত জনপ্রিয় কবি বাংলা দেশে বোধ হয় আর কেহই জন্মগ্রহণ করেন নাই। তাঁহার আবির্ভাবকালের পরে কত শতাব্দী পার হইয়া গিয়াছে, অথচ তাঁহার জনপ্রিয়তা এখনও অম্লান।
কিন্তু এই জনপ্রিয়তা একদিক দিয়া ক্ষতির কারণ হইয়াছে। কৃত্তিবাসের রামায়ণ বিপুল প্রচার লাভ করিবার ফলে লোকমুখে এত পরিবর্তিত হইয়াছে এবং তাহাতে এত প্রক্ষিপ্ত অংশ প্রবেশ করিয়াছে যে কৃত্তিবাস-রচিত মূল রামায়ণের বিশেষ কিছুই আজ বর্তমান প্রচলিত “কৃত্তিবাসী রামায়ণ”-এর মধ্যে অবশিষ্ট নাই।
কৃত্তিবাসের রামায়ণকে বাঙালীর জাতীয় কাব্য বলা যাইতে পারে। কারণ প্রথমত সমগ্র জাতিই এই কাব্যকে সাদরে বরণ করিয়াছে, কোটিপতির প্রাসাদ হইতে দীনদরিদ্রের পর্ণ-কুটির পর্যন্ত, দেশের এ প্রান্ত হইতে ও প্রান্ত পর্যন্ত এ কাব্যের সমান জনপ্রিয়তা; দ্বিতীয়ত, কৃত্তিবাসের রামায়ণ বর্তমানে যে রূপ লাভ করিয়াছে, তাহা আর ব্যক্তিবিশেষের রচনা নাই, তাঁহার উপরে সমগ্র জাতির হাতের ছাপ আছে; তৃতীয়ত, কৃত্তিবাসের রামায়ণের চরিত্রগুলি ও তাহাদের জীবনযাত্রা অবিকল বাঙালীর চরিত্র ও জীবনযাত্রার ছাঁচে ঢালা; চতুর্থত, কৃত্তিবাসী রামায়ণে বাঙালীর জাতীয় ইতিহাসের বিভিন্ন স্তরের স্বাক্ষর সংরক্ষিত হইয়াছে, যে স্তরে বৈষ্ণবরা প্রাধান্য লাভ করিয়াছিল, সেই স্তরের স্বাক্ষর রহিয়াছে রামচন্দ্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত রাক্ষসদের রামভক্তি প্রদর্শনমূলক অংশ প্রক্ষেপ করার মধ্যে; আবার শাক্তেরা যে স্তরে প্রাধান্য লাভ করিয়াছিল, তাঁহার স্বাক্ষর রহিয়াছে রামচন্দ্র কর্ত্তৃক শক্তিপূজা করার অংশ প্রক্ষেপের মধ্যে।
কৃত্তিবাসের ব্যক্তিগত পরিচয় সম্বন্ধে ধ্রুবানন্দের ‘মহাবংশাবলী’ প্রভৃতি কুলজী গ্রন্থ এবং কৃত্তিবাসী রামায়ণের কয়েকটি পুঁথি হইতে কিছু কিছু সংবাদ পাওয়া যায়। কিন্তু সর্বাপেক্ষা অধিক সংবাদ পাওয়া যায় “কৃত্তিবাসের আত্মকাহিনী” হইতে। এই আত্মকাহিনী বদনগঞ্জনিবাসী হারাধন দত্তের একটি পুঁথিতে সর্বপ্রথম আবিষ্কৃত হয় এবং দীনেশচন্দ্র সেনের ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’ গ্রন্থের প্রথম সংস্করণে (১৮৯৯ খ্রী) সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয়। হারাধন দত্তের যে পুঁথিতে এই আত্মকাহিনী পাওয়া গিয়াছিল, সেটি সাধারণের দৃষ্টিগোচর না হওয়াতে কেহ কেহ এই আত্মকাহিনীর অকৃত্রিমতা সম্বন্ধে সন্দেহ প্রকাশ করিয়াছিলেন। কিন্তু পরে ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালী আর একটি পুঁথিতে এই আত্মকাহিনী পাইয়াছেন; আত্মকাহিনীর অনেকগুলি খণ্ডাংশ অন্যান্য কৃত্তিবাসী রামায়ণের পুঁথিতে পাওয়া গিয়াছে এবং আত্মকাহিনীতে প্রদত্ত প্রায় সমস্ত সংবাদের সমর্থন অন্য কোন না কোন সূত্রে মিলিয়াছে। সুতরাং আত্মকাহিনীটি যে কৃত্তিবাসের নিজেরই রচনা, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। ইহার প্রচার বেশি না হওয়ার দরুণ ইহার মূল রূপটি প্রায় অবিকৃতভাবেই রক্ষিত হইয়াছে, তবে ভাষা খানিকটা আধুনিক হইয়া গিয়াছে।
কৃত্তিবাসের আত্মকাহিনী হইতে জানা যায় যে, কৃত্তিবাসের বৃদ্ধ প্রপিতামহ–“বেদানুজ মহারাজা”র পাত্র (পাঠান্তরে-’পুত্র’)-নারসিংহ ওঝার আদি নিবাস পূর্ববঙ্গে; সেখানে কোন বিপদ উপস্থিত হওয়াতে তিনি পশ্চিমবঙ্গে চলিয়া আসিয়া গঙ্গাতীরে ফুলিয়া গ্রামে বসতি স্থাপন করেন; নারসিংহের পুত্র গর্ভেশ্বর, গর্ভেশ্বরের অন্যতম পুত্র মুরারি; মুরারির অন্যতম পুত্র বনমালী; বনমালীর ছয় পুত্র-তন্মধ্যে সর্বজ্যেষ্ঠ কৃত্তিবাস। গর্ভেশ্বরের বংশে আরও অনেক বিশিষ্ট ও রাজানুগৃহীত ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। কৃত্তিবাস মাঘ মাসে শ্রীপঞ্চমী তিথিতে রবিবারে (“আদিত্যবার শ্রীপঞ্চমী পুণ্য মাঘ মাস”) জন্মগ্রহণ করেন। বারো বৎসর বয়সে পদার্পণ করিয়া তিনি গুরুগৃহে পড়িতে যান এবং নানা দেশে নানা গুরুর কাছে অধ্যয়ন করিয়া অবশেষে উত্তরবঙ্গের একজন গুরুর কাছে পাঠ সাঙ্গ করিয়া সর্বশাস্ত্র-বিশারদ হইয়া ঘরে ফেরেন। অতঃপর কৃত্তিবাস “গৌড়েশ্বর” অর্থাৎ বাংলার রাজার সহিত দেখা করিতে যান। সভাভঙ্গের অল্পক্ষণ পূর্বে রাজসভায় প্রবেশ করিয়া কবি দেখেন যে গৌড়েশ্বর সভায় বসিয়া আছেন, তাঁহার চতুর্দিকে জগদানন্দ, সুনন্দ, কেদার খা, কেদার রায়, নারায়ণ, তরণী, গন্ধর্ব রায়, সুন্দর, শ্রীবৎস্য, মুকুন্দ পণ্ডিত প্রভূতি সভাসদেরা বসিয়া আছেন; ইহা ভিন্ন আরও বহু লোক বসিয়া ও দাঁড়াইয়া আছে। রাজার প্রাসাদ কোলাহল ও নৃত্যগীতে ভরপুর। কৃত্তিবাসকে রাজা সঙ্কেতে আহ্বান করিলে কৃত্তিবাস তাঁহার কাছে গিয়া সাতটি শ্লোক পড়িলেন। ইহাতে রাজা খুশী হইয়া কৃত্তিবাসকে ফুলের মালা ও পাটের পাছড়া দিলেন এবং রাজসভাসদ কেদার খা কবির মাথায় চন্দনের ছড়া ঢালিয়া দিলেন; রাজা কৃত্তিবাসের ইচ্ছামত যে কোন বস্তু দান করিতে চাহিলেন, কিন্তু কৃত্তিবাস তাহা প্রত্যাখ্যান করিয়া বলিলেন যে কাহারও নিকট হইতে তিনি অর্থ চাহেন না, গৌরব ভিন্ন তাঁহার আর কিছু কাম্য নাই। অতঃপর কৃত্তিবাস রাজপ্রাসাদ হইতে বাহির হইয়া আসিলেন। তখন প্রাসাদের বাহিরে সমবেত বিরাট জনতা কৃত্তিবাসকে বিপুল সংবর্ধনা জানাইল এবং কৃত্তিবাসের রামায়ণ রচনার উল্লেখ করিয়া তাহারা বাল্মীকির সহিত কৃত্তিবাসের তুলনা করিল।
