৪। চৈতন্য-পরবর্তী কালের কবি “দীন চণ্ডীদাস”–”বড় চণ্ডীদাস” ও “দ্বিজ চণ্ডীদাস” ইহতে স্বতন্ত্র ব্যক্তি। কোন কোন গবেষক মনে করেন, দীন চণ্ডীদাসই চণ্ডীদাস-নামাঙ্কিত শ্রেষ্ঠ পদগুলির রচয়িতা। কিন্তু ইহা সম্ভব নহে, কারণ প্রথমত, দীন চণ্ডীদাসের অসন্দিগ্ধ রচনাগুলি অত্যন্ত নিকৃষ্ট শ্রেণীর; দ্বিতীয়ত, তাঁহার কৃষ্ণলীলাবিষয়ক আখ্যানকাব্যে বহু পদ থাকিলেও শ্রেষ্ঠ পদগুলির একটিও তাঁহার মধ্যে মিলে নাই; তৃতীয়ত, শ্রেষ্ঠ পদগুলির মধ্যে কোথাও “দীন চণ্ডীদাস” ভণিতা মিলে নাই।
৫। চণ্ডীদাস-নামাঙ্কিত সহজিয়া পদগুলি চণ্ডীদাসের নাম দিয়া অন্য সহজিয়া কবিরা লিখিয়াছেন; চণ্ডিদাসকে সহজিয়ারা নিজেদের গুরু মনে করিতেন, তাঁহারা তাঁহাকে “রসিক” আখ্যা দিয়াছেন এবং তাঁহারাই তাঁহার নামে সহজিয়া পদ লিখিয়া নিজেদের কৌলীন্য বৃদ্ধি করিয়াছেন। তরুণীরমণ নামক একজন সহজিয়া কবির নামান্তর ছিল চণ্ডীদাস।
৬। চণ্ডীদাস নামে আরও দুই একজন অর্ব্বাচীন ও নগণ্য কবি ছিলেন।
‘পদকল্পতরু’তে সঙ্কলিত দুইটি পদে বলা হইয়াছে যে, চণ্ডীদাস ও বিদ্যাপতি পরস্পরের সমসাময়িক ছিলেন, তাঁহারা পরস্পরকে গীত লিখিয়া প্রেরণ করিতেন এবং উভয়ের মধ্যে সাক্ষাৎ হইয়াছিল। আরও দুইটি পদে বলা হইয়াছে যে, সাক্ষাতের পর উভয়ের মধ্যে সহজিয়া তত্ত্ব সম্বন্ধে আলোচনা হইয়াছিল। কোন কোন গবেষকের মতে প্রথম দুইটি পদের উক্তি সত্য, অর্থাৎ বড় চণ্ডীদাস ও মৈথিল বিদ্যাপতির সমসাময়িকত্ব, পরস্পরের সহিত যোগাযোগস্থাপন ও মিলন ঐতিহাসিক ঘটনা, কিন্তু শেষ দুইটি পদের উক্তি, অর্থাৎ কবিদের সহজিয়া তত্ত্ব লইয়া আলোচনা করার কথা সত্য নহে। আবার কোন কোন গবেষক মনে করেন, চারিটি পদের উক্তিই কবিকল্পনা মাত্র। তৃতীয় একদল গবেষকের মতে পদগুলির কথা সত্য, কিন্তু চৈতন্য-পূর্ববর্তী চণ্ডীদাস ও বিদ্যাপতির কথা তাহাদের মধ্যে বলা হয় নাই, চৈতন্য-পরবর্তী দ্বিতীয় চণ্ডীদাস ও দ্বিতীয় বিদ্যাপতির কথা ইহাদের মধ্যে বলা হইয়াছে এবং ইঁহাদের মধ্যেই মিলন ঘটিয়াছিল; কিন্তু এই মত সত্য হইতে পারে না, কারণ পদগুলির মধ্যে “লছিমা”র উল্লেখ হইতে বুঝা যায় যে, ইহাদের মধ্যে বিদ্যাপতি’ বলিতে চৈতন্য-পূর্ববর্তী বিদ্যাপতিকে বুঝানো হইয়াছে।
রামী নামে চণ্ডীদাসের একজন রজকজাতীয় পরকীয়া প্রেমিকা ছিলেন বলিয়া প্রবাদ আছে। এই প্রবাদ অমূলক এবং সহজিয়াদের বানানো বলিয়া মনে হয়। প্রাচীন সহজ-পন্থী সাধকেরা আধ্যাত্মিক শক্তির তারতম্য অনুসারে ডোম্বী, নটী, রজকী, চণ্ডালী ও ব্রাহ্মণী–এই পাঁচটি কুলে বিভক্ত হইতেন। “রজকী” কুলের সহিত চণ্ডীদাসের “রজকিনী”-প্রেমের কাহিনীর কোন সম্পর্ক থাকা অসম্ভব নয়। চণ্ডীদাসের বাসভূমি হিসাবে কোন কোন কিংবদন্তীতে বাঁকুড়া জেলার ছাতনা এবং কোন কোন কিংবদন্তীতে বীরভূম জেলার নানুরের নাম পাওয়া যায়। বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক বিষয় হইতে মনে হয়, বড় চণ্ডীদাস বাঁকুড়া অঞ্চলের এবং দ্বিজ চণ্ডীদাস বীরভূম অঞ্চলের লোক। তবে এ সম্বন্ধে জোর করিয়া কিছু বলা যায় না।
বড় চণ্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে অনেক অশ্লীল ও রুচিবিগহিত উপাদান থাকিলেও কাব্যটি শক্তিশালী কবির রচনা। কবি সংক্ষিপ্ত ও শাণিত উক্তিপরম্পরার মধ্য দিয়া এবং লৌকিক জীবনের উপমার মধ্য দিয়া যেরূপে ভাব প্রকাশ করিয়াছেন, তাহা বিশেষ প্রশংসনীয়। এই কাব্যের ‘বংশীখণ্ড’ ও ‘রাধাবিরহ’ নামক খণ্ড দুইটি উচ্চস্তরের রচনা, ইহাদের মধ্যে স্থূলতা বা অশ্লীলতা বিশেষ নাই, এই দুইটি খণ্ডে গভীর প্রেমের হৃদয়গ্রাহী অভিব্যক্তি দেখিতে পাওয়া যায়। ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যে তিনটি প্রধান চরিত্র–রাধা, কৃষ্ণ ও বড়াই (বৃদ্ধা দূতী); তিনটিই জীবন্ত, উজ্জ্বল ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হইয়া উঠিয়াছে। রাধার চরিত্র একটি সুন্দর ক্রমবিকাশের মধ্য দিয়া রূপায়িত হইয়াছে। ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের আর একটি বৈশিষ্ট্য এই যে, কাব্যটি প্রায় আগাগোড়াই নাটকীয় রীতিতে, অর্থাৎ বিভিন্ন পাত্রপাত্রীর উক্তিপ্রত্যুক্তির মধ্য দিয়া রচিত; তাঁহার ফলে ইহার মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণ নাট্যরস সৃষ্টি হইয়াছে। ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে’ সে যুগের সমাজ সম্বন্ধে অজস্র তথ্য পাওয়া যায়; তখনকার লোকদের জীবনযাত্রা, আচার-ব্যবহার, খাদ্য-পরিধেয়, এমন কি কুসংস্কার সব কিছুর পরিচয় এই গ্রন্থ হইতে মিলে। ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যে স্কুল লালসার বর্ণনা হইতে মনে হয়, সে যুগে বাঙালী বিশেষভাবে দেহসচেতন ও ভোগাসক্ত হইয়া উঠিয়াছিল।
চণ্ডীদাস-নামাঙ্কিত রাধাকৃষ্ণবিষয়ক পদগুলি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ। এই পদগুলিতে ভাবের যে গভীরতা দেখিতে পাওয়া যায়, তাঁহার তুলনা বিরল। ইহাদের মধ্যে বিশেষভাবে প্রেমের বেদনাকে মর্মস্পর্শীভাবে রূপায়িত করা হইয়াছে। এই পদগুলিতে একটি অপার্থিব আধ্যাত্মিকতা ব্যঞ্জিত হইয়াছে। চণ্ডীদাসের পদে যে রাধার দেখা পাওয়া যায়, তিনি বাহ্যত প্রেমিকা হইলেও প্রকৃতপক্ষে সাধিকা, হৃদয়ে প্রেমের উন্মেষ তাহাকে জীবনের সমস্ত ভোগ ও সুখের মোহ ভুলাইয়া দিয়া তপস্বিনীতে পরিণত করিয়াছে। চণ্ডীদাস-নামাঙ্কিত পদগুলিতে গভীরতম ভাব অভিব্যক্ত হইলেও পদগুলির ভাষা অত্যন্ত সরল; ইহাদের মধ্যে সর্বজনবোধ্য উপমার মধ্য দিয়া ভাব প্রকাশ করা হইয়াছে। এই বৈশিষ্ট্যের জন্যই অপেক্ষাকৃত পরবর্তীকালের একজন কবি চণ্ডীদাসের পদ সম্বন্ধে মন্তব্য করিয়াছিলেন, “সরল তরল রচনা প্রাঞ্জল প্রসাদগুণেতে ভরা”। এই মন্তব্য সম্পূর্ণ সার্থক। চণ্ডীদাস-নামাঙ্কিত পদগুলির মধ্যে বিশেষভাবে পূর্বরাগ, আক্ষেপানুরাগ, রসোদ্গার, আত্মনিবেদন, বিরহ ও ভাবসম্মিলনের পদগুলি উৎকৃষ্ট।
