নরসিংহের এক পুত্র ধীরসিংহ পিতার জীবদ্দশাতেই রাজা হইয়াছিলেন, কিন্তু অপর পুত্র ভৈরবসিংহ পিতার পরে রাজা হন। বিদ্যাপতি তাঁহার কোন কোন পদ ও গ্রন্থে ভৈরবসিংহের নাম উল্লেখ করিয়াছেন, কিন্তু সর্বত্র তাঁহাকে তিনি রাজপুত্র’ বলিয়াছেন, কোথাও ‘রাজা বলেন নাই। ভৈরবসিংহ ১৪৭৩ খ্রীষ্টাব্দে রাজা হন বলিয়া প্রামাণিকভাবে জানা যায়; সুতরাং বিদ্যাপতি যে ১৪৭৩ খ্রীষ্টাব্দের পূর্বেই পরলোক গমন করিয়াছিলেন, তাহাতে সন্দেহের অবকাশ অল্প।
২
চণ্ডীদাস
চণ্ডীদাস একজন শ্রেষ্ঠ ও অবিস্মরণীয় কবি। কিন্তু সাম্প্রতিককালে তাঁহাকে লইয়া এক জটিল সমস্যার সৃষ্টি হইয়াছে। সংক্ষেপে আমরা এই সমস্যাটি সম্বন্ধে আলোচনা করিতেছি।
চণ্ডীদাসের নামে অনেকগুলি শ্রেষ্ঠ বাংলা রাধাকৃষ্ণবিষয়ক পদ প্রচলিত আছে। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক পর্যন্ত সকলে এইগুলিকেই কবি চণ্ডীদাসের একমাত্র কৃতি বলিয়া জানিত। চণ্ডীদাস যে চৈতন্য-পূর্ববর্তী কবি, তাহাতেও কাহারও কোন সন্দেহ ছিল না, কারণ কৃষ্ণদাস কবিরাজের ‘‘চৈতন্যচরিতামৃত’ ও অন্যান্য প্রামাণিক বৈষ্ণব গ্রন্থে লেখা আছে যে চৈতন্যদেব চণ্ডীদাসের লেখা গীত শুনিতেন।
কিন্তু ১৯১৬ খ্রীষ্টাব্দে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ হইতে ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ নামে একখানি নবাবিষ্কৃত গ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার ফলে সমস্যার সৃষ্টি হইল। ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন একখানি রাধাকৃষ্ণবিষয়ক আখ্যানকাব্য; জন্মখণ্ড, তাম্বুলখণ্ড, দানখণ্ড, নৌকাখণ্ড–ইত্যাদি অনেকগুলি খণ্ডে কাব্যখানি বিভক্ত; ভণিতায় এই কাব্যের রচয়িতার নাম পাওয়া যায় ‘বড় চণ্ডীদাস’। কাব্যখানির ভাষা প্রাচীন ধরনের, রচনার মধ্যে লেখকের পাণ্ডিত্য ও অলঙ্কারপ্রীতির নিদর্শন আছে, উপরন্তু তাঁহার মধ্যে স্কুল আদিরস এবং অশ্লীল বর্ণনার নিদর্শন অনেক স্থানে মিলে; কাব্যের মধ্যে কবিত্বের পরিচয় যথেষ্ট থাকিলেও কাব্যটিতে আধ্যাত্মিকতা বিশেষ নাই, উৎকট লালসার কথাই প্রাধান্য লাভ করিয়াছে। কিন্তু চণ্ডীদাসের নামে প্রচলিত শ্রেষ্ঠ পদগুলির ভাষা আধুনিক ভাষার কাছাকাছি, তাহাদের মধ্যে লেখকের পাণ্ডিত্য প্রদর্শন বা কৃত্রিম অলঙ্কার সৃষ্টির কোন নিদর্শন নাই এবং তাহাদের ভাব অত্যন্ত পবিত্র ও অপার্থিব আধ্যাত্মিকতায় পূর্ণ। অবশ্য দুইটি বিষয়ে ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের সঙ্গে চণ্ডীদাস নামাঙ্কিত পদাবলীর মিল দেখা গেল; উভয় রচনাতেই কবি মাঝে মাঝে ‘বাসলী’ (বা “বাশুলী”) দেবীর বন্দনা করিয়াছেন আর ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে’র মত পদাবলীতেও অনেক স্থানে কবির ভণিতায় ‘বড় চণ্ডীদাস’ নাম পাওয়া যায়। ইহার পরে ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের একটি পদ রূপান্তরিত আকারে প্রচলিত পদাবলীর মধ্যে পাওয়া গেল। চৈতন্যদেবের বিশিষ্ট পার্ষদ সনাতন গোস্বামী তাঁহার বৃহৎবৈষ্ণবতোষণী’ নামক ভাগবতের টীকার মধ্যে চণ্ডীদাস রচিত ‘দানখণ্ড-নৌকাখণ্ড’র উল্লেখ করিয়াছেন বলিয়াও আবিষ্কৃত হইল।
যাহা হউক, ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ প্রকাশিত হইবার পর হইতেই এই গ্রন্থ ও চণ্ডীদাস নামাঙ্কিত শ্রেষ্ঠ পদগুলি এক লোকের লেখা কিনা, সে সম্বন্ধে বিতর্ক চলিয়া আসিতেছে। অপেক্ষাকৃত পরবর্তীকালে একজন অর্ব্বাচীন চণ্ডীদাসের লেখা একটি বৃহৎ কৃষ্ণলীলা-বিষয়ক আখ্যানকাব্য আবিষ্কৃত ও প্রকাশিত হইয়াছে। এই বইটির মধ্যে কবি অনেকবার “দীন চণ্ডীদাস” নামে নিজেকে অভিহিত করিয়াছেন। এই কাব্যটিতে চৈতন্যদেবের পরবর্তীকালের ভাবধারার প্রভাব আছে এবং রূপ গোস্বামীর গ্রন্থের নাম আছে। পর্তুগীজ শব্দও আছে। বইটির মধ্যে কবিত্বশক্তি বিশেষ কিছুই নাই। এই বইখানি ছাড়াও চণ্ডীদাস-নামাঙ্কিত আরও বহু নিকৃষ্ট পদ পরবর্তীকালে আবিষ্কৃত হইয়াছে। চণ্ডীদাসের ভণিতার বহু সহজিয়া পদও পাওয়া গিয়াছে।
পূর্ব্বোল্লিখিত বিষয়গুলি মিলিয়া চণ্ডীদাস-সমস্যাকে এত ঘোলা করিয়া তুলিয়াছে যে, এ সম্বন্ধে সর্বদিসম্মত সিদ্ধান্তে উপনীত ইহবার আশা করা যাইতে পারে না। তবে, যে সমস্ত বিষয় সম্বন্ধে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ একমত, সেগুলি নিম্নে উল্লেখ করা হইল।
১। ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ চৈতন্য-পূর্ববর্তী কালের রচনা। কোন কোন পণ্ডিত ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’কে চৈতন্য-পরবর্তী রচনা বলিতে চাহেন, কিন্তু ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’-এর ভাষার প্রাচীনতা, আদিরসের স্থূলতা, ইহার মধ্যে বিভিন্ন বিষয়বস্তু ও প্রাচীন ভাবধারার নিদর্শন মেলা এবং সনাতন গোস্বামী কর্ত্তৃক চণ্ডীদাস রচিত “দানখণ্ড-নৌকাখণ্ড”র উল্লেখ–এই সমস্ত কারণের জন্য ইহাকে চৈতন্য-পূর্ববর্তী রচনা বলাই সঙ্গত।
২। চৈতন্যদেবের পূর্বে মাত্র একজন চণ্ডীদাসই ছিলেন, তিনি ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ রচয়িতা বড়ু চণ্ডীদাস। অবশ্য ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ চৈতন্যদেব আস্বাদন করেন নাই, করিলে ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ এমনভাবে বিস্মৃত ও লুপ্তপ্রায় হইত না। সুতরাং বড় চণ্ডীদাস ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ছাড়া কতকগুলি পদও লিখিয়াছিলেন এবং চৈতন্যদেব তাহাই আস্বাদন করিয়াছিলেন–এইরূপ মনে করাই যুক্তিসঙ্গত।
৩। চণ্ডীদাস-নামাঙ্কিত শ্ৰেষ্ঠ পদগুলির মধ্যে কতকগুলি বড় চণ্ডীদাসের রচনা; বাকীগুলির মধ্যে কয়েকটি অন্যান্য কবির রচনা, এখন চণ্ডীদাসের নামে চলিয়া গিয়াছে। অবশিষ্ট শ্রেষ্ঠ পদগুলি ‘দ্বিজ চণ্ডীদাস’ নামক একজন চৈতন্য-পরবর্তী কবির রচনা।
