বিদ্যাপতির ব্যক্তিগত পরিচয় সম্বন্ধে প্রায় কিছুই অবগত হওয়া যায় না। তিনি পণ্ডিত ছিলেন ও জাতিতে ব্রাহ্মণ ছিলেন, ইহার অতিরিক্ত তাঁহার সম্বন্ধে আর বিশেষ কোন কথা প্রামাণিকভাবে জানা যায় না। তবে একটি বিষয় জানা যায় তিনি মিথিলা বা ত্রিহুতের ওইনিবার বংশীয় ব্রাহ্মণ রাজাদের এবং রাজপরিবারভুক্ত বিভিন্ন লোকদের পৃষ্ঠপোষণ লাভ করিয়াছিলেন। এই সমস্ত রাজারা স্বাধীন ছিলেন না। জৌনপুরের সুলতান এই সময় ত্রিহুতের সার্বভৌম অধিপতি ছিলেন; তাঁহার অধীনে এইসব রাজারা সামন্ত ছিলেন। বিদ্যাপতি ভোগীশ্বর, কীর্তিসিংহ, দেবসিংহ, শিবসিংহ, পদ্মসিংহ, নরসিংহ, ধীরসিংহ, ভৈরবসিংহ প্রভৃতি অনেক রাজা ও রাজপুত্রের নিকটে পৃষ্ঠপোষণ লাভ করিয়াছিলেন, তবে ইহাদের মধ্যে শিবসিংহের সহিতই তাঁহার সম্পর্ক ছিল সর্বাপেক্ষা ঘনিষ্ঠ। কালিদাস ও বিক্রমাদিত্যের মত বিদ্যাপতি ও শিবসিংহের নামও এক সূত্রে গ্রথিত হইয়া আছে। শিবসিংহের রানী লছিমার নামও বিদ্যাপতির অনেক পদে উল্লিখিত হইয়াছে। তবে বিদ্যাপতি ও লছিমার পরকীয়া প্রেম সম্বন্ধে বাংলা দেশে যে কাহিনী প্রচলিত আছে, তাহা অমূলক।
বিদ্যাপতি একজন শ্রেষ্ঠ কবি ছিলেন। প্রেমের মধুর, সুকুমার রূপ তাঁহার পদাবলীতে অপরূপভাবে শিল্পকলামণ্ডিত হইয়া রূপায়িত হইয়াছে। রূপের বর্ণনাতে তাঁহার জুড়ি নাই; বিশেষভাবে বয়ঃসন্ধি পর্যায়ের নায়িকার তরুণ লাবণ্যের বর্ণনায় তিনি অদ্বিতীয়। বিদ্যাপতির পদের বাণীসৌন্দর্যও অনন্যসাধারণ। তাঁহার ভাষা যেমন মার্জিত ও মধুর, ছন্দও তেমনি স্বচ্ছন্দ ও সাবলীল, তাঁহার শব্দচয়নও ত্রুটিহীন। বিদ্যাপতির উপমা ও উৎপ্রেক্ষা অলঙ্কারগুলি অত্যন্ত মৌলিক ও হৃদয়গ্রাহী। অবশ্য বিদ্যাপতির অনেক পদে সৌন্দর্যের তুলনায় ভাবগভীরতার অভাব দেখা যায়। কিন্তু তাঁহার লেখা বিরহ ও ভাবসম্মিলন বিষয়ক পদগুলিতে আবার ভাবের অতলস্পর্শী গভীরতার নিদর্শন মিলে, বিরহের অপরিসীম শূন্যতা বিরহিণীর হৃদয়ের অন্তহীন হাহাকার এই পদগুলির মধ্যে অপূর্বভাবে রূপ পরিগ্রহ করিয়াছে।
বাংলা দেশের পদাবলী-সংকলনগ্রন্থগুলিতে বিদ্যাপতির পদগুলিকে অত্যন্ত বিশিষ্ট স্থান দেওয়া হইয়াছে। কিন্তু বাংলা দেশের বৈষ্ণব পদকর্ত্তারা শুধু কবি ছিলেন না, সেই সঙ্গে ভক্তও ছিলেন। বিদ্যাপতিও তাহাই ছিলেন বলিয়া অনেকে মনে করেন। কিন্তু বিদ্যাপতি কেবলমাত্র কবি ছিলেন, নিছক কাব্য-প্রেরণার তাগিদেই তিনি পদ লিখিয়াছিলেন; তিনি যে ভক্ত ছিলেন অথবা বৈষ্ণবধর্ম্মাবলম্বী ছিলেন, তাঁহার কোন প্রমাণ এ পর্যন্ত পাওয়া যায় নাই। বিদ্যাপতি নানা ধরনের পদ লিখিয়াছিলেন, তন্মধ্যে রাধাকৃষ্ণবিষয়ক পদও অন্যতম; রাধাকৃষ্ণবিষয়ক পদ রচনার দিকে তাঁহার যে বিশেষ ধরনের আসক্তি ছিল, তাহা নহে; তাঁহার প্রেমবিষয়ক পদগুলির মধ্যে অধিকাংশই লৌকিক প্রেমের পদ, এগুলিতে রাধাকৃষ্ণের নাম নাই; যেগুলিতে রাধাকৃষ্ণের নাম আছে, তাহাদের মধ্যে অনেকগুলিতে ভক্তিভাবের কোন নিদর্শন মিলে না, সেগুলিও প্রেমবিষয়ক পদ।
বিদ্যাপতির পদগুলি অপূর্ব হইলেও তাহাদের একটি ত্রুটি এই যে, তাহাদের মধ্যে অনেক স্থানে অশ্লীল ও রুচিবিগর্হিত বর্ণনা পাওয়া যায়; অসামাজিক ও অশোভন পরকীয়া প্রেমের নগ্ন বর্ণনাও তাঁহার অনেক পদে দেখা যায়; তবে এগুলির জন্য বিদ্যাপতি ততটা দায়ী নহেন, যতটা দায়ী তাঁহার সমসাময়িক কালের রুচি ও প্রবৃত্তি।
বিদ্যাপতির রচনা বলিয়া প্রসিদ্ধ এমন অনেক পদ বর্তমানে প্রচলিত আছে, যেগুলি অন্য কবিদের রচনা, যথা—’ভরা বাদর মাহ ভাদর’ ও ‘কি পুছসি অনুভব মোয়’; এই দুইটি পদ যথাক্রমে শেখর ও কবিবল্লভের রচনা।
বিদ্যাপতির আবির্ভাবকাল নির্ণয়ের প্রশ্ন কিছু জটিল। অনেক সমসাময়িক পুঁথিতে তাঁহার নাম পাওয়া যায়; এই সব পুঁথির তারিখ ‘লক্ষ্মণসেন-সংবতে’ (সংক্ষেপে ‘ল সং’) দেওয়া আছে। ল সং-এর আদি বৎসর কোন্ খ্রীষ্টাব্দে পড়িয়াছিল, সে সম্বন্ধে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ আছে। কীলহর্ন মনে করিয়াছিলেন, ১১৯ খ্রীষ্টাব্দই ল সং-এর আদি বত্সর, কিন্তু এই মত ভিত্তিহীন। এ পর্যন্ত যে সমস্ত তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গিয়াছে, তাহা হইতে দেখা যায় যে মিথিলায় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের ল সং প্রচলিত ছিল এবং খ্রীষ্টাব্দের সঙ্গে তাহাদের পার্থক্য ১০৭৯ বৎসর হইতে সুরু করিয়া ১১১৯ বৎসর পর্যন্ত হইত।
যাহা হউক, ল সং-এ তারিখ দেওয়া পুঁথিগুলি হইতে একটা বিষয় জানা যায় যে, বিদ্যাপতি চতুর্দ্দশ শতাব্দীর শেষভাগ এবং পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথম ও মধ্যভাগে বর্তমান ছিলেন। এই পুঁথিগুলির সাক্ষ্য বাদ দিলেও বিদ্যাপতির আবির্ভাবকাল নির্ণয় করা যায়। বিদ্যাপতির প্রথম দিককার একটি পদে রাজা ভোগীশ্বরের নাম পৃষ্ঠপোষক হিসাবে উল্লিখিত হইয়াছে; ভোগীশ্বর ফিরোজ শাহ্ তোগলকের (রাজত্বকাল ১৩৫১-৮৮ খ্রী) সমসাময়িক। জৌনপুরে সুলতান ইব্রাহিক শর্কী পঞ্চদশ শতকের প্রথম দশকে ত্রিহুতে আসিয়া রাজা কীর্তিসিংহকে তাঁহার পিতৃসিংহাসনে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন; বিদ্যাপতি ঐ সময়ে জীবিত ছিলেন, কারণ তিনি এই ঘটনা স্বচক্ষে দেখিয়া তাঁহার কীর্তিলতা’ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। বিদ্যাপতির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রাজা শিবসিংহ পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথম ও দ্বিতীয় দশকে রাজত্ব করেন এবং ১৪১৫ খ্রীষ্টাব্দেই ইব্রাহিম শর্কী ও বাংলার রাজা গণেশের সংঘর্ষে গণেশের পক্ষাবলম্বন করেন। সুতরাং বিদ্যাপতি নিশ্চয়ই ১৪১৫ খ্রীষ্টাব্দেও জীবিত ছিলেন। বিদ্যাপতি রাজা নরসিংহেরও পৃষ্ঠপোষণ লাভ করিয়াছিলেন, নরসিংহের একটি শিলালিপির তারিখ ১৩৭৫ শক বা ১৪৫৩ খ্রীষ্টাব্দ। মোটের উপর বিদ্যাপতি আনুমানিকভাবে ১৩৭০ খ্রীষ্টাব্দ হইতে ১৪৬০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত জীবিত ছিলেন বলিয়া সিদ্ধান্ত করা যাইতে পারে। এইরূপ সিদ্ধান্ত করিলেই বিদ্যাপতির জীবঙ্কাল সম্বন্ধে প্রাপ্ত সমস্ত তথ্যের এবং তাঁহার ভোগীশ্বর হইতে নরসিংহ পর্যন্ত রাজাদের পৃষ্ঠপোষণ লাভ করার সামঞ্জস্য করা যায়।
