বাংলা দেশে বহু কুলপঞ্জী সংস্কৃতে রচিত হইয়াছিল। সর্বক্ষেত্রে কুলপঞ্জীর বিবরণ হয়ত নির্ভরযোগ্য নহে; কিন্তু বঙ্গের সামাজিক ইতিহাসের পক্ষে এই সকল গ্রন্থের তথ্য একেবারে অগ্রাহ্য নহে। চন্দ্রকান্ত ঘটকের ‘রাঢ়ীয়কুলকল্পদ্রুম’, ধ্রুবানন্দ মিশ্রের ‘মহাবংশাবলী’, রামানন্দ শর্মার ‘কুলদীপিকা’, ভরত মল্লিকের ‘চন্দ্রপ্রভা’, ‘রত্নপ্রভা’ ও ‘বৈদ্যকুলতত্ত্ব’ এবং রামকান্ত দাসের ‘সদ্বৈদ্যকুলপঞ্জিকা’ প্রভৃতি এই শ্রেণীর উল্লেখয়োগ্য গ্রন্থ।
১৫. বাংলা সাহিত্য
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ – বাংলা সাহিত্য
চর্যাগীতির রচনা দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যেই সম্পূর্ণ হইয়াছিল। জয়দেবের গীতগোবিন্দ বাংলায় রচিত না হইলেও বাংলা সাহিত্যের সহিত ঘনিষ্ঠভাবে সম্পান্বিত, তাহাও ১২০০ খ্রীষ্টাব্দের মত সময়ে প্রণীত হইয়াছিল। ইহার পর প্রায় আড়াই শত বৎসর বাঙালীর সাহিত্যসৃষ্টির বিশেষ কোন নিদর্শন পাই না। এই সময়টাতে বাঙালী সংস্কৃত ভাষাতেও উল্লেখযোগ্য কিছু রচনা করে নাই, বাংলা ভাষাতে তো করেই নাই। কেন করে নাই, তাহা বলা দুঃসাধ্য। অনেকে মুসলমান বিজয়কেই এজন্য দায়ী করেন। তাঁহাদের মতে মুসলমান বিজেতাদের অত্যাচার ও তাহাদের হিন্দুদের গ্রন্থাদি নষ্ট করার প্রবণতার দরুণ এবং সারা দেশে অশান্তি ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করিতে থাকার দরুণই এদেশে এই সময়ে সাহিত্য সৃষ্টি সম্ভবপর হয় নাই। কিন্তু এই অভিমত স্বীকার করা যায় না। কারণ হিন্দুদের সাহিত্যের প্রতি মুসলমানদের আক্রোশের কোন প্রমাণ এ পর্যন্ত পাওয়া যায় নাই; আর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অশান্তির সময়েও যে সাহিত্যিকের লেখনী নিশ্চল হইয়া থাকে না, তাঁহার বহু প্রমাণ বিভিন্ন দেশের সাহিত্যের ইতিহাস হইতে পাওয়া যায়। সুতরাং আলোচ্য সময়ে বাংলা দেশে সাহিত্যসৃষ্টির অনাবির্ভাবের কারণ এইভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। এ সম্বন্ধে নিশ্চিত করিয়া কিছু বলা সম্ভব নয়। সম্ভবত ইহার প্রকৃত কারণ এই যে, এই সময়ের মধ্যে কোন প্রতিভাধর সাহিত্যিক আবির্ভূত হন নাই। কিছু নগণ্য লেখক আবির্ভূত হইয়াছিলেন, তাহাদের অকিঞ্চিৎকর রচনা স্বতই লুপ্ত ও বিস্মৃত হইয়াছে।
১
বিদ্যাপতি
পঞ্চদশ শতাব্দীর বাঙালী কবিদের মধ্যে দুইজনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য চণ্ডীদাস ও কৃত্তিবাস। অবশ্য আরও একজন কবির নাম এই প্রসঙ্গে উল্লিখিত হইতে পারে-ইনি মৈথিল কবি বিদ্যাপতি। বিদ্যাপতি বাঙালী নহেন, এবং বাংলা ভাষায় কিছু লেখেন নাই। তাহা সত্ত্বেও তাঁহার নাম বাংলা সাহিত্যের সহিত অচ্ছেদ্য সূত্রে জড়িত হইয়া গিয়াছে, কারণ বিদ্যাপতির জনপ্রিয়তা তাঁহার মাতৃভূমি মিথিলা অপেক্ষা বাংলা দেশেই অধিক হইয়াছিল; স্বয়ং চৈতন্যদেবের নিকট বিদ্যাপতির পদ অত্যন্ত প্রিয় ছিল। বিদ্যাপতি যে বাঙালী নহেন, সে কথাই এক সময়ে বাংলা দেশের লোকে ভুলিয়া গিয়াছিল। বিদ্যাপতির শ্রেষ্ঠ পদগুলি বাংলা দেশেই সংরক্ষিত হইয়া কালের গ্রাস হইতে অব্যাহতি পাইয়াছে। এইগুলি এখন যে ভাবে পাওয়া যাইতেছে, তাহাতে বাঙালীর হাতের ছাপও অনেকখানি আছে। তাহা ভিন্ন বাংলায় প্রচলিত বিদ্যাপতি-নামাঙ্কিত পদগুলি যে সমস্তই মৈথিল বিদ্যাপতির রচনা, তাহাও নহে। ইহাদের মধ্যে পরবর্তীকালের এক বা একাধিক বাঙালী বিদ্যাপতির রচনা আছে; আছে সেই সমস্ত অজ্ঞাতনামা কবির রচনা, যাঁহারা নিজেদের পদকে অমরত্ব দান করিবার জন্য তাহাতে নিজের ভণিতা না দিয়া বিদ্যাপতির ভণিতা বসাইয়া দিয়াছিলেন; অধিকন্তু ইহাদের মধ্যে আছে অন্য অনেক কবির লেখা পদ, যেগুলির মধ্যে আদিতে মূল কবিরই ভণিতা ছিল, গায়নরা বা পুঁথি-লিপিকররা পদগুলির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করিবার জন্য তাহাদের ভণিতা বদলাইয়া মূল কবিদের নামের স্থলে বিদ্যাপতির নাম প্রবেশ করাইয়া দিয়াছেন। সুতরাং বিদ্যাপতি-নামাঙ্কিত পদগুলির মধ্যে কেবল মৈথিল বিদ্যাপতিরই রচনা নাই, অনেক বাঙালী কবিরও রচনা আছে। অতএব যেকোন দিক হইতেই দেখা যাক না কেন, বিদ্যাপতিকে বা তাঁহার নামাঙ্কিত পদগুলিকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস হইতে নির্বাসন দেওয়ার কোন উপায় নাই।
বিদ্যাপতি শুধু কবি ছিলেন না, নানা বিষয়ের নানা গ্রন্থও তিনি রচনা করিয়াছিলেন। তাঁহার লেখা গ্রন্থগুলির মধ্যে আছে কয়েকটি স্মৃগ্রিন্থ দানবাক্যাবলী, বিভাগসার, কৰ্ষকৃত্য, দুর্গাভক্তিতরঙ্গিণী ও ব্যাড়ীভক্তিতরঙ্গিণী, দুইটি গল্পের বই-ভূপরিক্রমা ও পুরুষ-পরীক্ষা, একটি পৌরাণিক নিবন্ধ শৈবসর্বস্বসার, একটি পত্র-লিখন বিষয়ক গ্রন্থ-লিখনাবলী, একটি নাটক গোরক্ষবিজয়, দুইটি সমসাময়িক রাজার কীর্তিগাথা-কীর্তিলতা ও কীর্তিপতাকা। বিদ্যাপতির রচিত পদগুলি নানা ধরনের; লৌকিক প্রেমবিষয়ক পদ, রাধাকৃষ্ণবিষয়ক পদ, হরগৌরী বিষয়ক পদ, গঙ্গা সম্বন্ধীয় পদ, অন্যান্য দেবদেবী বিষয়ক পদ, প্রহেলিকা পদ-প্রভৃতি অনেক ধরনের পদই তিনি রচনা করিয়াছিলেন; তন্মধ্যে লৌকিক প্রেমবিষয়ক পদ ও রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদগুলিই সর্বাপেক্ষা বিখ্যাত। তবে মির্ধিলায় তাঁহার হরগৌরী বিষয়ক পদগুলি সমধিক প্রসিদ্ধ। বিদ্যাপতির পদগুলি মৈথিলী ও ব্রজবুলি ভাষায়, কীর্তিলতা ও কীর্তিপতাকা অবহট্ট ভাষায় এবং অন্যান্য গ্রন্থগুলি সংস্কৃত ভাষায় রচিত। বিদ্যাপতির মত বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন ও এতগুলি ভাষায় লেখনী ধারণে সক্ষম লেখক সে যুগে বোধ হয় আর কেহই জন্মগ্রহণ করেন নাই।
