‘অষ্টাধ্যায়ী’র সংক্ষিপ্তরূপ সংক্ষিপ্তসার’ নামক ব্যাকরণের প্রণেতা ক্রমদীশ্বর (পঞ্চদশ শতক?) কাহারও কাহারও মতে ছিলেন বাঙালী। পুণ্ডরীকাক্ষ বিদ্যাসাগর (ষোড়শ শতকের পূর্ববর্তী?) দুর্গসিংহের ‘কাতন্ত্রবৃত্তিটীকা’র ব্যাখ্যা করিয়াছেন। ‘কাতন্ত্রপ্রদীপ’ গ্রন্থে। ইহা ছাড়া, ‘ন্যাসটীকা’, ‘কারককৌমুদী’, ‘তত্ত্বচিন্তামণিপ্রকাশ’ ও ‘কাতন্ত্রপরিশিষ্টটীকা’ পুণ্ডরীকাক্ষরচিত। বলরাম পঞ্চাননের ‘প্রবোধপ্রকাশ’ শৈব সম্প্রদায়ের ব্যাকরণ; ইহাতে স্বরবর্ণের নাম ‘শিব’ ও ব্যঞ্জনবর্ণসমূহ অভিহিত হইয়াছে শক্তি’ নামে। ধাতুপ্রকাশ’ নামক ধাতুপাঠ বলরামের নামের সহিত যুক্ত।
উল্লিখিত গ্রন্থাবলী ছাড়া বাঙালী পণ্ডিতগণ বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্রন্থ ও টীকাটিপ্পনী রচনা করিয়াছিলেন। এই জাতীয় গ্রন্থগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভরত সেন বা ভরত মল্লিকের ‘দ্রুতবোধব্যাকরণ’, ‘সুখলেখন এবং তারানাথ তর্কবাচস্পতির ‘আশুবোধব্যাকরণ’। টীকাটিপ্পনীসমূহের মধ্যে ত্রিলোচন দাসের কাতন্ত্রবৃত্তিপঞ্জিকা উল্লেখযোগ্য। এই জাতীয় গ্রন্থের মধ্যে কাতন্ত্রব্যাকরণের সংক্ষিপ্তসার বা টীকার সংখ্যাই অধিকতর। অনেক বাঙালী নৈয়ায়িক ব্যাকরণের নানা বিষয় সম্বন্ধে বহু বাদগ্রন্থও রচনা করিয়াছিলেন।
১০
অভিধান
বাঙালী পণ্ডিতগণ শুধু প্রসিদ্ধ অভিধানের টীকা রচনা করিয়াই নিবৃত্ত হন নাই। তাঁহাদের মধ্যে কেহ কেহ অভিধানগ্রন্থও রচনা করিয়াছিলেন। এই অভিধানগুলির মধ্যে অভিনব কয়েকটি প্রণালীতে রচিত।
সম্ভবত বৈয়াকরণ পুরুষোত্তমদেবের সহিত অভিন্ন পুরুষোত্তমদেবের ‘ত্রিকাণ্ডশেষ’ বিখ্যাত অভিধান। ‘নামলিঙ্গানুশাসন’ বা ‘অমরকোষে’র অপূর্ণ অংশ পূরণ করাই অভিধানকারের উদ্দেশ্য-ইহা তিনি এই গ্রন্থে (১১।২) নিজেই বলিয়াছেন। পুরুষোত্তমের অপর অভিধানগুলির নাম ‘হারাবলী’, ‘বর্ণদেশনা’ ও ‘দ্বিরূপকোষ’। প্রথম গ্রন্থটিতে সাধারণত অপ্রচলিত প্রতিশব্দ ও সমধ্বনিবিশিষ্ট ভিন্নার্থক শব্দসমূহ সংগৃহীত হইয়াছে। দ্বিতীয়টিতে আছে বিভিন্নরূপ বর্ণবিন্যাসবিশিষ্ট শব্দসমুহের সংগ্রহ। ইহাতে সংগৃহীত শব্দগুলির বর্ণবিন্যাসপদ্ধতি দ্বিবিধ। ‘একাক্ষরকোষ’ নামক অভিধানও ইহার নামাঙ্কিত। চাটুগ্রাম (= চট্টগ্রাম?) নিবাসী জটাধর (পঞ্চদশ শতক?) অভিধানতন্ত্র নামক গ্রন্থের রচয়িতা। পঞ্চদশ শতকের বৃহস্পতি রায়মুকুট রচনা করিয়াছিলেন ‘অমরকোষে’র বিস্তৃত টীকা ‘পদচন্দ্রিকা। বর্তমান গ্রন্থের ষষ্ঠ অধ্যায়ে ইহার সম্বন্ধে আলোচনা করা হইয়াছে। ভরত মল্লিকের (আ সপ্তদশ শতক) অভিধান দুইটি-একবর্ণার্থসংগ্রহ’ ও ‘দ্বিরূপধ্বনিসংগ্রহ। তাঁহার মুগ্ধবোধিনী’ ‘অমরকোষে’র টীকা। লিঙ্গাদিসংগ্রহ’ নামক গ্রন্থে তিনি ‘অমরকোষ’-ধৃত শব্দগুলির লিঙ্গ নির্দেশ করিয়াছেন।
সপ্তদশ শতকের মথুরেশ বিদ্যালঙ্কার শব্দরত্বাবলী’ নামক অভিধান রচনা করিয়াছিলেন; নানার্থশব্দ’ ইহারই অংশ। এই মথুরেশ সম্ভবত ‘অমরকোষে’র ‘সারসুন্দরী’ নামক টীকাটিও রচনা করিয়াছিলেন। মথুরেশের গ্রন্থের রচনাকাল দেখা যায় ১৫৮৮ শকাব্দ ( = ১৬৬৬ খ্রীষ্টাব্দ)। ‘শব্দরত্নাবলী’তে গ্রন্থকারের পৃষ্ঠপোষকস্বরূপ মূর্ছা খা’র উল্লেখ আছে। ইহাকে ঈশা খাঁর পুত্র মুসা খা বলিয়া কেহ কেহ মনে করেন। প্রাণকৃষ্ণ বিশ্বাসের আনুকূল্যে নদীয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের গুরু রামানন্দ ন্যায়ালঙ্কারের পুত্র রঘুমণি বিদ্যাভূষণ ‘প্রাণকৃষ্ণ-শব্দাক্কি’ প্রণয়ন করিয়াছিলেন। রঘুমণির অপর অভিধানের নাম ‘শব্দমুক্তামহার্ণব’।
১১
বিবিধ
বাঙালী-রচিত এমন কতক সংস্কৃত গ্রন্থ আছে যেগুলিকে পূর্ব্বোক্ত কোন শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত করা যায় না। এইরূপ বিবিধ বিষয়ক গ্রন্থ বর্তমান প্রসঙ্গে আলোচ্য।
রামনাথ বিদ্যাবাচস্পতি বা সিদ্ধান্তবাচস্পতি (খ্রী ১৭শ শতক) এবং রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য কতক বৈদিক মন্ত্রের ভাষ্য রচনা করিয়াছিলেন। চিরঞ্জীব (১৭শ-১৮শ শতক) বিদ্বনন্মাদতরঙ্গিনী’ নামক গ্রন্থে তদীয় পিতা রাঘবেন্দ্র শতাবধান-রচিত মন্ত্ৰার্থদীপ’ (মন্ত্রদীপ?) নামক গ্রন্থের উল্লেখ করিয়াছেন; ইহাতে আছে কতক বৈদিক মন্ত্রের ব্যাখ্যা ও সিদ্ধান্ত। কাত্যায়নের ‘ছন্দোগপরিশিষ্টে’র ‘ছন্দোগপরিশিষ্টপ্রকাশ’ নামক টীকার রচয়িতা নারায়ণ স্বীয় পরিচয় প্রসঙ্গে বলিয়াছেন যে, তাঁহার পূর্বপুরুষ ছিলেন উত্তররাঢ়ের অধিবাসী। ‘ক্ষিতীশবংশাবলীচরিত’-এ নবদ্বীপরাজ কৃষ্ণচন্দ্রের পূর্বপুরুষগণের ইতিহাস লিপিবদ্ধ আছে। অনঙ্গরঙ্গ’ নামক গ্রন্থ কল্যাণমল্লভূপতির নামের সহিত যুক্ত; এই কল্যাণমন্ত্র সম্ভবত ভরত মল্লিকের (১৭শ শতক?) পৃষ্ঠপোষক এবং বর্ধমানের অন্তর্গত ভূরশুট নিবাসী ছিলেন। গোবিন্দ রায় ‘স্বাস্থ্যতত্ত্ব’ নামক সংস্কৃত গ্রন্থের প্রণেতা।
‘নাদদীপক’ নামক গ্রন্থে জনৈক ভট্টাচার্য শব্দ, নাদ ও স্বরাদির উৎপত্তি বর্ণনা করিয়া রাগরাগিণী প্রভৃতি নিরূপণের চেষ্টা করিয়াছেন। রঘুনন্দন ‘হরিস্মৃতিসুধাঙ্কুর’ এ রাগরাগিণী নিরূপণপূর্বক হরিবিষয়ক সঙ্গীত নিরূপণ করিতে প্রয়াসী হইয়াছেন।
চম্পাহট্টীয়কুলজাত ঈশানের পুত্র অর্জুন মিশ্র (পঞ্চদশ শতক) মহাভারতের ‘মহাভারতার্থপ্রদীপিকা’ বা ‘ভারতসংগ্রহদীপিকা’ নামক টীকার রচয়িতা।
