৮
অলঙ্কার, ছন্দ, নাট্যশাস্ত্র ও বৈষ্ণবরসশাস্ত্র
অলঙ্কার, ছন্দ ও নাট্যকলা বিষয়ে বাংলা দেশের দান সামান্য। এই সকল শাস্ত্র সম্বন্ধে বাঙালী-রচিত যে কয়খানি গ্রন্থ আছে, উহাদের মধ্যে বিশেষ মৌলিকতা নাই। বৈষ্ণবরসশাস্ত্রে বাঙালীর কীর্তি গৌরবের বিষয়।
কবিকর্ণপুরের ‘অলঙ্কারকৌস্তুভ’ মম্মটের কাব্যপ্রকাশ’ অনুসরণে রচিত। বিশেষত্ব এই যে, ‘অলঙ্কারকৌস্তুভে’র অধিকাংশ উদাহরণশ্লোক কৃষ্ণস্তুতিবিষয়ক। ইহাতে ভক্তি, বাৎসল্য ও প্রেম রসরূপে পরিগণিত হইয়াছে। খ্ৰীষ্টীয় ১৭শ শতকের কবিচন্দ্র ‘কাব্যচন্দ্রিকা’ নামক গ্রন্থে অলঙ্কারশাস্ত্রের মোটামুটি বিষয় এবং নাট্যশাস্ত্র আলোচনা করিয়াছেন। একই শতকের রামনাথ বিদ্যাবাচস্পতি ‘কাব্যরত্নাবলী’ নামক অলঙ্কারগ্রন্থের রচয়িতা। বলদেব বিদ্যাভূষণ প্রণয়ন করিয়াছিলেন কাব্যকুম্ভভ। রামদেব (বা, বামদেব) চিরঞ্জীব ভট্টাচার্যের ‘কাব্যবিলাস’ উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। ইনি চমৎকারিত্বকে কাব্যের প্রধান লক্ষণ বলিয়া স্বীকার করিয়াছেন। মায়ারস এবং বৈষ্ণবগণের বাৎসল্য, ভক্তি প্রভৃতি রস তদীয় গ্রন্থে স্বীকৃত হয় নাই। অলঙ্কারসমূহের উদাহরণশ্লোক চিরঞ্জীবের স্বরচিত।
উল্লিখিত গ্রন্থাবলী ছাড়াও প্রাচীন অলঙ্কারগ্রন্থাদির, বিশেষতঃ ‘কাব্যপ্রকাশ’ এবং ‘সাহিত্যদর্পণে’র কয়েকখানি টীকা বাঙালী রচিত। তন্মেধ্যে পরমানন্দ চক্রবর্তীর কাব্যপ্রকাশবিস্তারিকা’, জয়রামের ‘কাব্যপ্রকাশ-তিলক’ এবং রামচরণ তর্কবাগীশের সাহিত্যদর্পণটীকা সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।
‘ছন্দোমঞ্জরী’র রচয়িতা গঙ্গাদাস বৈদ্য বলিয়া আত্মপরিচয় দেওয়ায় তিনি বাঙালী ছিলেন বলিয়া মনে হয়। তাঁহার গ্রন্থে একটি অবহট্ঠ শ্লোক উদ্ধৃত হওয়ায় তাঁহার জীবনকালের ঊর্ধ্বসীমারেখা খ্রীষ্টীয় চতুর্দ্দশ শতকের শেষ দিকে টানা যায়। ইহাতে সন্নিবিষ্ট উদাহরণশ্লোকগুলির অধিকাংশই গ্রন্থকারের রচনা এবং কৃষ্ণের বৃন্দাবনলীলাবিষয়ক। বৃত্তমালা’ নামক দুইখানি গ্রন্থের মধ্যে একখানি কবিকর্ণপুরের নামাঙ্কিত এবং অপরটি রামচন্দ্ৰ কবিভারতী প্রণীত। চিরঞ্জীব ভট্টাচার্যের বৃত্তরত্নাবলী’ নামক গ্রন্থে উদাহরণস্বরূপ সুজাউদ্দৌলার সময়ে ঢাকার নায়েব দেওয়ান যশোবন্ত সিংহের প্রশস্তিসূচক শ্লোক আছে। চন্দ্রমোহন ঘোষের ‘ছন্দঃসারসগ্রহ’ একখানি সঙ্কলনগ্রন্থ। কাশীনাথ চৌধুরী (অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতক) ‘পদ্যমুক্তাবলী’ নামক ছন্দগ্রন্থের রচয়িতা।
রূপগোস্বামীর নাটকচন্দ্রিকা ছাড়া বাংলা দেশে নাট্যশাস্ত্র সম্বন্ধে স্বতন্ত্র কোন গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া যায় না। দশটি রূপকের মধ্যে একমাত্র নাটক ইহাতে আলোচিত হইয়াছে। এই গ্রন্থের অধিকাংশ উদাহরণ বৈষ্ণব গ্রন্থসমূহ হইতে গৃহীত।
তুলনায় বৈষ্ণব রসশাস্ত্রের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য লক্ষিত হয়। প্রাচীন অলঙ্কারশাস্ত্রের সাহিত্যিক রসের পরিবর্তে বৈষ্ণবগণ ঐ শাস্ত্রের ভক্তিনামক ভাবকে রস বলিয়া প্রতিপন্ন করিলেন; এই রসের স্থায়িভাব কৃষ্ণরতি এবং ইহার আস্বাদ করিবেন অলঙ্কারশাস্ত্রের সহৃদয়ের পরিবর্তে ভক্ত। প্রাচীনতর শাস্ত্রের আটটি (শান্ত সহ নয়টি) রসের স্থলে বৈষ্ণবগণ পাঁচটি মুখ্য ভক্তিরস স্বীকার করিলেন; যথা–শান্ত, প্রীত, প্রেয়, বাৎসল্য ও মধুর। শৃঙ্গাররসের নাম ইঁহারা দিলেন মধুর, উজ্জ্বল বা শৃঙ্গার ভক্তিরস; এই রস ভক্তিরসরাজ এবং আলম্বন বিভাগ স্বয়ং কৃষ্ণ। উক্ত মুখ্য ভক্তিরস ছাড়াও তাঁহারা সাতটি গৌণ ভক্তিরস স্বীকার করিয়াছেন, যথা–বীর, বীভৎস, রৌদ্র, হাস্য, ভয়ানক, করুণ ও অদ্ভুত।
বৈষ্ণব রসশাস্ত্রে রূপগোস্বামীর অক্ষয় কীর্তি ভক্তিরসামৃতসিন্ধু ও ‘উজ্জ্বলনীলমণি’। প্রথমোক্ত গ্রন্থে রূপ ভক্তিরসের বিশ্লেষণ করিতে গিয়া ভাব ও বিভাব প্রভৃতির সংজ্ঞানির্দেশ ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিভাগ করিয়াছেন। রসশাস্ত্রে উজ্জ্বলরসের প্রাধান্যহেতুই, বোধ হয়, রূপগোস্বামী শুধু এই রসের বিশ্লেষণে ‘উজ্জ্বলনীলমণি’ রচনা করিয়াছিলেন। ইহাতে কৃষ্ণকে ‘নায়কচূড়ামণি’, এবং রাধাকে তাঁহার ‘তন্ত্রে প্রতিষ্ঠিতা’ হ্লাদিনী শক্তিরূপে কল্পনা করা হইয়াছে, নায়িকার শ্রেণীভাগ ও সম্ভোগ এবং বিপ্রলম্ভশৃঙ্গারের নানা অবস্থার বিশ্লেষণ করা হইয়াছে। উক্ত গ্রন্থদ্বয়ের সংক্ষিপ্তসার রচনা করিয়াছেন বিশ্বনাথ চক্রবর্তী যথাক্রমে ভক্তিরসামৃতসিন্ধুবিন্দু এবং উজ্জ্বলনীলমণিকিরণ’ নামক গ্রন্থে। রূপের গ্রন্থদ্বয়ের ব্যাখ্যা করিয়াছেন জীবগোস্বামী; ব্যাখ্যাগ্রন্থ দুইখানির নাম যথাক্রমে– ‘দুর্গমসংগমনী, এবং ‘লোচনরোচনী”। রূপের দুইটি গ্রন্থের পরিশিষ্টস্বরূপ ‘রসামৃতশেষ’ নামক গ্রন্থও সম্ভবত জীবরচিত।
৯
ব্যাকরণ
টীকাকার সৃষ্টিধরের সাক্ষ্য অনুসারে পুরুষোত্তমদেব লক্ষ্মণসেনের আদেশে ‘অষ্টাধ্যায়ী’র ‘ভাষাবৃত্তি’ নামক ব্যাখ্যা রচনা করিয়াছিলেন। তাহা ছাড়া, পুরুষোত্তমের গ্রন্থে বর্গীয় ‘ব’ ও অন্তঃস্থ ‘ব’ এর কোন ভেদ দেখা যায় না। একটি সূত্রের ব্যাখ্যায় বৃত্তিকার পদ্মাবতী (= পদ্মা) নদীর উল্লেখ করিয়াছেন। এই সকল কারণে তাঁহাকে বাঙালী মনে করা হয়। বৌদ্ধ বলিয়াই সম্ভবত পুরুষোত্তম ‘অষ্টাধ্যায়ী’র বৈদিক অংশ বর্জন করিয়াছেন। ভাষাবৃত্তি সংক্ষিপ্ত অথচ সহজবোধ্য। ‘দুর্ঘটবৃত্তি’-রচয়িতা শরণদেব ও লক্ষ্মণসেনের সভাকবি শরণ, কাহারও কাহারও মতে অভিন্ন। যে সকল প্রয়োগ আপাতদৃষ্টিতে অপাণিনীয় উহাদের শুদ্ধিবিচার এই গ্রন্থের বিষয়বস্তু। রূপগোস্বামীর (মতান্তরে সনাতনের বা জীবের) সংক্ষেপ-(বা, লঘু-) হরিনামামৃতব্যাকরণের বৈশিষ্ট্য এই যে, ইহাতে সংজ্ঞা ও উদাহরণগুলি রাধাকৃষ্ণের বা কৃষ্ণলীলার নামাঙ্কিত। ইহার অধিকাংশ সূত্রে বিষ্ণুর বা তাঁহার সহিত সংশ্লিষ্ট দেবদেবীর নাম আছে। জীবগোস্বামীর ‘হরিনামামৃত ব্যকরণ বৃহত্তর গ্রন্থ এবং একই উদ্দেশ্যে রচিত। স্বরচিত ব্যাকরণের পরিশিষ্টস্বরূপ ইনি ‘ধাতুসংগ্রহ’ বা ‘ধাতুসূত্রমালিকা’ (?) নামক গ্রন্থও রচনা করিয়াছিলেন।
