উল্লিখিত গ্রন্থগুলি ছাড়া ‘কল্কিপুরাণ’ (অষ্টাদশ শতকের পূর্ববর্তী) কোন কোন যুক্তিবলে বাংলা দেশে রচিত হইয়াছিল বলিয়া অনুমান করা হয়।
গৌড় দরবারের জনৈক কর্মচারী কুলধর, গোবর্ধন পাঠকের সাহায্যে, ‘পুরাণ সর্বস্ব’ নামে পুরাণ ও স্মৃতিবিষয়ক সংগ্রহগ্রন্থ সংকলন করিয়াছিলেন ১৪৭৪-৭৫ খ্রীষ্টাব্দে। রাজেন্দ্রলাল মিত্রের সাক্ষ্য অনুসারে ইহাতে ইতিহাস, ভূগোল, রাজ্য শাসনপদ্ধতি ও পূজাপদ্ধতি সম্বন্ধে বিভিন্ন পুরাণ হইতে শ্লোকসমূহ উদ্ধৃত ও ব্যাখ্যাত হইয়াছে।
নদীয়ারাজ রুদ্ররায় কর্ত্তৃক সপ্তদশ খ্রীষ্টাব্দে ১৪০০০-এরও অধিকসংখ্যক শ্লোকে ‘পুরাণসার রচিত হইয়াছিল। এই জাতীয় অপর একখানি গ্রন্থ রাধাকান্ত তর্কবাগীশরচিত ‘পুরাণার্থপ্রকাশক’; ইহাতে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে পুরাতন রাজবংশের বর্ণনা আছে।
পুরাণ এবং পুরাণের সারসংকলন ছাড়াও কতক বাঙালী পণ্ডিত ‘চণ্ডী” ও ‘ভাগবত’-এর ব্যাখ্যা রচনা করিয়াছেন। কেহ কেহ পূজাপদ্ধতিও প্রণয়ন করিয়াছেন।
৭
গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শন, ধর্মতত্ত্ব ও ভক্তিতত্ত্ব
প্রাচীন হিন্দুদর্শনের সহিত তুলনায় বৈষ্ণবদর্শনের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য বহু। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ষড়দর্শনের মধ্যে প্রমাণের সংখ্যা সম্বন্ধে মতভেদ থাকিলেও প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান ও শব্দ–এই চারিটি প্রমাণ সর্ববদিসম্মত। বৈষ্ণবদর্শনে একমাত্র শব্দপ্রমাণই স্বীকৃত হইয়াছে। প্রাচীন দর্শনে শব্দপ্রমাণে শ্রুতি বা বেদ গৃহীত হইয়াছে; বৈষ্ণবগণের মতে, বৈষ্ণব পুরাণ, বিশেষত ভাগবত’, শব্দপদবাচ্য। পরমাত্মার সহিত জীবাত্মার একীভাব প্রাচীন দর্শনে চরম লক্ষ্য বলিয়া পরিগণিত। বৈষ্ণবদর্শনে কৃষ্ণই পরম দেবতা এবং কৃষ্ণপ্রাপ্তি ভক্তের চরম লক্ষ্য। নবদ্বীপের বৈষ্ণবগণের মতে, চৈতন্য একাধারে কৃষ্ণ ও রাধা এবং তিনিই চরম সত্তা ও পরম উপেয়–ইহাই গৌরপারম্যবাদ।
বাসুদেব সার্বভৌম তত্ত্বদীপিকা’ গ্রন্থে বৈষ্ণবদর্শনের কিছু আলোচনা করিয়াছেন। বৃহদ্ভাগবতামৃত’ নামক গ্রন্থে সনাতন ভক্তিতত্ত্ব বিশ্লেষণ পূর্বক কৃষ্ণলীলা ও কৃষ্ণপ্রাপ্তির উপায় আলোচনা করিয়াছেন। সনাতন ভাগবতে’র দশম স্কন্ধের বৈষ্ণবতোষণী’ নামক ব্যাখ্যা রচনা করেন। বৃহদ্ভাগবতামৃতের সংক্ষেপণ স্বরূপ রূপগোস্বামী ‘সংক্ষেপ (বা, লঘু-) ভাগবতামৃত’ রচনা করিয়াছেন; ইহাতে কৃষ্ণের স্বরূপ বর্ণনার পরে ভক্তের বৈশিষ্ট্য ও শ্রেণীবিভাগ আছে। রূপ ও সনাতনের ভ্রাতুষ্পুত্র জীবগোস্বামীর ছয়টি দর্শনগ্রন্থ ষট্সন্দর্ভ নামে পরিচিত; ইহাদের নাম ‘তত্ত্বসন্দর্ভ, ভগবৎসন্দর্ভ’, ‘পরমাত্মসন্দর্ভ’, শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ভ’,
ভক্তিসন্দর্ভ’, ও ‘প্রীতি-সন্দর্ভ’। প্রথম তিনটি সন্দর্ভের পরিশিষ্টস্বরূপ জীব। ‘সর্বসংবাদিনী’ নামক গ্রন্থখানিও রচনা করিয়াছিলেন। সন্দৰ্ভগুলিতে গৌড়ীয় বৈষ্ণবদর্শন পরিচ্ছন্নরূপে আলোচিত হইয়াছে। ইহাদের মধ্যে গ্রন্থকারের মৌলিক চিন্তা ও রচনার পারিপাট্য উল্লেখযোগ্য। উক্ত ‘বৈষ্ণবতোষণী’র ‘লঘুতোষণী’ নামক সংক্ষিপ্তসার জীব-প্রণীত। ভাগবতে’র ‘ক্রমসন্দর্ভ টীকা, অগ্নি ও পদ্মপুরাণের অংশবিশেষ টীকা ‘গোপালতাপনী’ উপনিষদ ও ব্রহ্মসংহিতা’র টীকা এবং কৃষ্ণার্চনার পদ্ধতিস্বরূপ কৃষ্ণার্চাদীপিকা’ প্রভৃতি গ্রন্থও জীবরচিত।
‘ভাগবতে’র ও ‘ভগবদগীতা’র টীকা ছাড়াও বিশ্বনাথ চক্রবর্তী রাগবচন্দ্রিকা ও মাধুর্যকাদম্বিনী’ প্রভৃতি দশখানি গ্রন্থ বৈষ্ণব ধর্ম ও দর্শন অবলম্বনে রচনা করিয়াছিলেন। ঈশ্বর ও সখা প্রভৃতি রূপে কৃষ্ণের প্রতি ভক্তি বিশ্বনাথ চক্রবর্তীর সাধ্যসাধনকৌমুদী’র প্রতিপাদ্য বিষয়। গৌরগণোদ্দেশদীপিকা’য় কবিকর্ণপুর বিশিষ্ট বৈষ্ণবগণের জীবনী প্রসঙ্গে অনেক তত্ত্বের আলোচনা করিয়াছেন। সম্ভবত খ্র ১৭শ শতকের রূপ কবিরাজের ‘সারসংগ্রহ’ বৈষ্ণব দর্শনে একখানি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। গৌড়ীয় বৈষ্ণবগণের আচার ও ধর্ম্মানুষ্ঠান সম্বন্ধে সর্বাপেক্ষা প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘হরিভক্তিবিলাস’। কেহ কেহ মনে করেন, ইহা বা অন্তত ইহার কাঠামোটি, সনাতনরচিত। কাহারও কাহারও মতে, ইহা গোপালভট্ট কর্ত্তৃক রচিত বা পরিবর্ধিত; এই গোপালভট্ট বৃন্দাবনের ষট্গোস্বামীর অন্যতম কিনা বলা যায় না। গোপালভট্টের নামাঙ্কিত ‘সৎক্রিয়াসারদীপিকা’ উক্ত গ্রন্থের পরিশিষ্টস্বরূপ; ইহাতে গৃহানুষ্ঠানাদি আলোচিত হইয়াছে। গোপালদাসের (১৬ শতক) ভক্তিরত্নাকর’-এ মুক্তিলাভের উপায় স্বরূপ কৃষ্ণভক্তির প্রাধান্য এবং ভাগবতে’র প্রামাণিকতা প্রতিপাদনের প্রয়াস রহিয়াছে। বলদেব বিদ্যাভূষণের (১৮শ শতক) ‘প্রমেয়রত্নাবলী’ গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম সম্বন্ধে প্রামাণ্য গ্রন্থ। বেদান্তসূত্রের বলদেবরচিত ব্যাখ্যার নাম ‘গোবিন্দভাষ্য’; ইহারই সংক্ষিপ্তসার তাঁহার রচিত ‘সিদ্ধান্তরত্ন’ বা ‘ভাষ্যপীঠক’। ভগবদগীতা এবং দশোপনিষদের টীকাও বলদেবরচিত। উড়িষ্যার লোক হইয়া থাকিলেও গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের সহিত বলদেবের সম্বন্ধ ছিল ঘনিষ্ঠ। শান্তিপুরের রাধামোহন গোস্বামী ভট্টাচার্যের ‘ভাগবততত্ত্বসার’ বৈষ্ণব শাস্ত্রে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। কৃষ্ণভক্তিসুধার্ণব’, ‘কৃষ্ণতত্ত্বার্ণব’, ‘ভক্তিরহস্য প্রভৃতি নয়খানি নিবন্ধ ও টীকা রাধামোহন রচিত।
