৫
নাট্যসাহিত্য
কাব্যের তুলনায় বাংলা দেশে রচিত নাট্যগ্রন্থের সংখ্যা অল্প। মদনের (১২শ-১৩শ শতক) পারিজাতমঞ্জরী’ বা ‘বিজয়শ্রী গুজরাটরাজ জয়সিংহের সহিত যুদ্ধে পরমাররাজ অর্জুনবর্ম্মার জয়লাভের স্মারকগ্রন্থ স্বরূপে রচিত হইয়াছিল। মধুসূদন সরস্বতীর (ষোড়শ শতক) নাট্যগ্রন্থের নাম কুসুমাবচয়’। রূপগোস্বামীর নাট্যগ্রন্থ তিনটি–দানকেলিকৌমুদী’, ‘বিদগ্ধমাধব’ ও ললিতমাধব’। সানুচর কৃষ্ণকর্ত্তৃক রাধাসহ গোপীগণের নিকট শুল্ক দাবী করিয়া তাঁহাদের পথরোধ এবং অবশেষে পৌর্ণমাসী কর্ত্তৃক রাধাকে শুল্করূপে দানের প্রস্ত বি ভাণিকা শ্রেণীর গ্রন্থ ‘দানকেলিকৌমুদী’র বিষয়বস্তু। পূর্বরাগ হইতে আরম্ভ করিয়া সংক্ষিপ্ত সঙ্কীর্ণ সম্ভোগ পর্যন্ত রাধাকৃষ্ণের বৃন্দাবনলীলাকে নাট্যরূপ দেওয়া হইয়াছে সপ্তাঙ্ক ‘বিদগ্ধমাধবে। দশাঙ্ক ললিতমাধব’-এ কৃষ্ণের বৃন্দাবনলীলা এবং মথুরা ও দ্বারকার জীবন বর্ণিত হইয়াছে। সম্ভবত কৃষ্ণমিশ্রের ‘প্রবোধচন্দ্রোদয়ের আদর্শে রচিত কবিকর্ণপুরের দশাঙ্ক নাটক ‘চৈতন্যচন্দ্রোদয়ে’ চৈতন্যের জীবনের প্রধান ঘটনাবলীকে নাট্যরূপ দেওয়া হইয়াছে। বারভুঞার অন্যতম নোয়াখালির ভুলুয়ার লক্ষ্মণমাণিক্যের (মোড়শ শতক) দুইখানি নাটক পাওয়া যায় ‘বিখ্যাতবিজয়’ ও ‘কুবলয়াশ্বচরিত’। বিখ্যাতবিজয়’ মহাভারতের কর্ণবধ অবলম্বনে রচিত। মহাভারতের মদালসা ও কুবলয়াশ্বের আখ্যান কুবলয়াশ্বের উপজীব্য। লক্ষ্মণমাণিক্যের পুত্র অমরমাণিক্য বাণাসুরকন্যা ঊষার কাহিনী অবলম্বনে বৈকুণ্ঠবিজয়’ রচনা করিয়াছিলেন। লক্ষ্মণ-মাণিক্যের সভাপতি কবিতার্কিক ‘কৌতুকরত্নাকর” নামক প্রহসনে পুণ্যবর্জিত নামক নগরের দুরিতার্ণব নামক রাজার নির্বুদ্ধিতার চিত্র অঙ্কন করিয়াছেন। কৌতুকসর্বস্ব’ নামক প্রহসনে গোপীনাথ চক্রবর্তী কলিবৎসল নামক রাজার বিশৃঙ্খলাময় রাজ্যশাসন এবং ব্রাহ্মণগণের উপর অত্যাচার বর্ণনা করিয়াছেন। সম্ভবত বঙ্গে তুর্কী আক্রমণের পরবর্তী শ্রীহর্ষ বিশ্বাসের পুত্র রামচন্দ্র যযাতির পৌরাণিক আখ্যান অবলম্বনে ‘ঐন্দবানন্দ’ নাটক রচনা করেন। চন্দ্রাভিষেক’ নামক নাটকটি বাণেশ্বর বিদ্যালঙ্কার (১৭শ-১৮শ শতক) কর্ত্তৃক রচিত।
৬
পুরাণ
পুরাণ ও উপপুরাণশ্রেণীর কতক গ্রন্থ বাংলা দেশে রচিত বলিয়া কেহ কেহ মনে করেন। কতক যুক্তিপ্রমাণ বইতে এইগুলির উৎপত্তিস্থল বঙ্গদেশ বলিয়া মনে হয়। আনুমানিক খ্ৰীষ্টীয় পঞ্চদশ শতকের মধ্যভাগে বা তৎপূর্ববর্তীকালে রচিত বৃহদ্ধর্ম্মপুরাণের বিষয়বস্তু বিবিধ পৌরাণিক আখ্যান-উপাখ্যান, বর্ণাশ্রমধর্ম, স্ত্রীধর্ম, পূজাব্রত, জাতিনিরূপণ, সঙ্করজাতি, দানধর্ম, কৃষ্ণের জন্ম ও লীলা প্রভৃতি। ইহাতে ছত্রিশ সঙ্করজাতির এবং ‘রায়’, ‘দাস’, ‘দেবী’, ‘দাসী’ প্রভৃতি পদবীর উল্লেখ বাংলা দেশে প্রচলিত কালীমূর্ত্তির বর্ণনা, বাংলা দেশের নদী পদ্মাবতী (= পদ্মা) ও ত্রিবেণীর (= মুক্তবেণী) উল্লেখ, গীতগোবিন্দে’র প্রভাব, বাঙালী কবির প্রিয় ‘চৌত্রিশা’ নামক রচনাপদ্ধতি প্রভৃতি হইতে ইহা বাংলা দেশে রচিত বলিয়া মনে হয়। এই পুরাণোক্ত শারদীয়া পূজা এবং রাসযাত্রা বাংলা দেশে অদ্যাবধি ব্যাপকভাবে প্রচলিত। ইহার অদ্যাবধিপ্রাপ্ত পুঁথিগুলির প্রায় সবই বঙ্গদেশে প্রাপ্ত ও বঙ্গাক্ষরে লিখিত। আনুমানিক চতুর্দ্দশ শতকের বা তৎপরবর্তী কালের বৃহন্নান্দি কেশ্বরপুরাণে’র অদ্যাবধি আবিষ্কৃত সকল পুঁথিই বাংলা দেশে প্রাপ্ত এবং বঙ্গাক্ষরে লিখিত; নন্দিকেশ্বরপুরাণের ক্ষেত্রেও ইহা প্রযোজ্য। এই দুই পুরাণোক্ত দুর্গাপূজা একমাত্র বাংলা দেশেই প্রচলিত। এই সকল কারণে এই দুই গ্রন্থ বাংলা দেশে রচিত হইয়াছিল বলিয়া মনে হয়।
আনুমানিক এয়োদশ-চতুর্দ্দশ শতকে রচিত মহাভাগবতপুরাণ’-এর আলোচ্য বিষয়সমূহের মধ্যে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য দেবী কর্ত্তৃক দশমহাবিদ্যার রূপধারণ, দক্ষযজ্ঞনাশ, একান্নটি মহাপীঠের উৎপত্তি, পদ্মানদীর উৎপত্তি, শারদীয়া পূজায় দেবীর অকালবোধন, রাম কর্ত্তৃক তাড়কাবধ হইতে রামরাবণের যুদ্ধ পর্যন্ত রামায়ণ-বর্ণিত ঘটনাবলী ইত্যাদি। ইহাতে ভাগীরথী ও পদ্মা নদীর সহিত নিবিড় পরিচয়, এই পুরাণবর্ণিত শারদীয়া পূজার সহিত বর্তমান বাংলায় প্রচলিত দুর্গাপূজার সাদৃশ্য, ইহাতে প্রযুক্ত ‘গর্বচূর্ণ’, ‘লোকলজ্জা’ প্রভৃতি শব্দের বর্তমান বাংলা ভাষায় প্রতিরূপ প্রভৃতি হইতে ইহা বাংলা দেশে রচিত বলিয়া মনে হয়। এই পুরাণের প্রায় সকল পুঁথিই বাংলা দেশে প্রাপ্ত এবং বঙ্গাক্ষরে লিখিত।
বর্তমান ‘ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ’-এর আদিম রূপের উদ্ভব হয় আনুমানিক খ্রীষ্টীয় অষ্টম শতকে; দশম হইতে ষোড়শ শতকের মধ্যে, বোধ হয়, ইহার নবরূপায়ণ হইয়াছিল। এই পুরাণ চারিটি খণ্ডে বিভক্ত–ব্রহ্মখণ্ড, প্রকৃতিখণ্ড, গণপতিখণ্ড ও কৃষ্ণজন্মখণ্ড। ইহার প্রধান আলোচ্য বিষয় কৃষ্ণের মাহাত্ম ও লীলা। গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম ও দর্শনের উপরে এই পুরাণের প্রভাব গভীর। ইহাতে বাংলা দেশে বর্তমান সঙ্করবর্ণসমূহের বিবরণ, বৈদ্য উপবর্ণের উল্লেখ, কৈবর্তগণের উদ্ভবের সবিস্তার বর্ণনা প্রভৃতি হইতে ইহাকে বাংলা দেশের রচনা বলিয়া মনে করা হয়।
