৪
কাব্য
বঙ্গে তুর্কী আক্রমণের পর প্রায় দুইশত বৎসর পর্যন্ত এই দেশে রচিত কোন কাব্যগ্রন্থের সন্ধান মিলে না। চৈতন্যপ্রচারিত বৈষ্ণবধর্ম্মের প্রভাবে কাব্যশ্রীর আসন এই দেশে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। বাংলা দেশে রচিত কাব্যগুলি আঙ্গিক ও বিষয়বস্তুতে বৈচিত্র্যময়। বাঙালী পণ্ডিতগণ যেমন একদিকে কাব্য রচনা করিয়াছেন, তেমনই অপরদিকে মহাকাব্যাদির অভিনব টীকাটিপ্পনীও প্রণয়ন করিয়াছেন। মধ্যযুগে এই দেশে রচিত কাব্যগুলিকে নিম্নলিখিত শ্রেণীভুক্ত করা যায় :
(১) বৈষ্ণবকাব্য, (২) ঐতিহাসিক কাব্য, (৩) স্তবস্তোত্র, (৪) কোশ কাব্য, (৫) দূতকাব্য, (৬) গদ্যকাব্য ও চম্পূ।
১। বৈষ্ণবকাব্য : আলোচ্য যুগে রাধাকৃষ্ণের লীলা, কৃষ্ণবিষয়ক আখ্যান উপাখ্যান বা চৈতন্যের জীবনী অবলম্বনে বহু কাব্য রচিত হইয়াছিল। এই কাব্যগুলির মধ্যে নানা শ্রেণীর রচনা বিদ্যমান; যথা–মহাকাব্য, গীতিকাব্য, দূতকাব্য, চম্পূ ইত্যাদি।
মধ্যযুগের প্রারম্ভে বা তাঁহার কিছু পূর্বে রচিত লক্ষ্মীধরের ‘চক্রপাণিবিজয়’ নামক মহাকাব্যের বিষয়বস্তু বাণাসুরের কন্যা ঊষার সহিত কৃষ্ণপৌত্র অনিরুদ্ধের বিবাহ, বাণকর্ত্তৃক অনিরুদ্ধের নিগ্রহের সংকল্প, বাণের সহিত কৃষ্ণের তুমুল সংগ্রাম, শঙ্কর এবং কার্তিকের বাণের সহায় থাকা সত্ত্বেও কৃষ্ণের হস্তে তাঁহার পরাজয় ও পৌত্র এবং পৌত্রবধূ সহ কৃষ্ণের দ্বারকায় প্রত্যাবর্তন।
কৃষ্ণের জন্ম হইতে কংসবধ পর্যন্ত লীলা চতুর্ভুজের (খ্রষ্টীয় ১৫শ শতক) ‘হরিচরিত’-এর বিষয়বস্তু। রূপ ও সনাতনের ভ্রাতুষ্পুত্র জীবগোস্বামী (১৬শ-১৭শ শতক) ‘সংকল্পকল্পদ্রুমে’ কৃষ্ণের প্রকট ও অপ্রকট নিত্যলীলা বর্ণনা করিয়াছেন। জীবের ‘মাধবমহোৎসব’ কাব্যখানির বর্ণনীয় বিষয় কৃষ্ণকর্ত্তৃক রাধার বৃন্দাবনেশ্বরী রূপে অভিষেক ও তদুপলক্ষ্যে আনন্দোৎসব। বৃন্দাবনে কৃষ্ণের নিত্যলীলা অবলম্বনে চৈতন্যশিষ্য কবিকর্ণপুর বা পরমানন্দ সেনের ‘কৃষ্ণাহ্নিককৌমুদী’ কাব্য রচিত। ‘হরিবংশ’, ‘বিষ্ণুপুরাণ’ ও ‘ভাগবতো’ক্ত পারিজাতহরণের আখ্যান কবিকর্ণপুরের ‘পারিজাতহরণ’ নামক কাব্যের উপজীব্য। রাধাকৃষ্ণের বৃন্দাবনলীলা অবলম্বনে চৈতন্যশিষ্য প্রবেধানন্দ সরস্বতী রচনা করিয়াছিলেন সঙ্গীতমাধব’; ইহা ‘গীতগোবিন্দের আদর্শে রচিত। চৈতন্যের সমসাময়িক ও বৃন্দাবনের ফটগোস্বামীর অন্যতম রঘুনাথদাস ‘দানকেলিচিন্তামণি’ নামক কাব্য সম্ভবত রূপগোস্বামীর দানকেলিকৌমুদী অবলম্বনে রচনা করেন। কৃষ্ণদাস কবিরাজের (খ্রীষ্টীয় ১৬শ ১৭শ শতক) গোবিন্দলীলামৃত’ বঙ্গীয় বৈষ্ণব কাব্যের মধ্যে বৃহত্তম। কৃষ্ণের অষ্টকালিক নিত্যলীলা অবলম্বনে বিশ্বনাথ চক্রবর্তী (খ্রষ্টীয় ১৭শ শতক), ‘শ্রীকৃষ্ণভাবনামৃত’ রচনা করিয়াছিলেন।
চৈতন্যের সমকালীন মুরারিগুপ্ত কড়চা’ বলিয়া পরিচিত ‘শ্রীকৃষ্ণ’চৈতন্যচরিতামৃত’ বা ‘‘চৈতন্যচরিতামৃত’ নামক কাব্যে চৈতন্যের জীবনী বর্ণনা করিয়াছেন। কবি-কর্ণপুরের ‘‘চৈতন্যচরিতামৃত’ নামক কাব্যে চৈতন্যকে কৃষ্ণের অবতাররূপে কল্পনা করিয়া তাহাকে নায়ক করা হইয়াছে।
বৈষ্ণবদূতকাব্যগুলির মধ্যে কতক কাব্যে দূতপ্রেরক কৃষ্ণ এবং উদ্দেশ্য গোপীগণ; কোন কোন কাব্যে ইহার বিপরীত ব্যাপারও লক্ষিত হয়। আবার কোন কোন কাব্যে ভক্ত প্রেরক ও কৃষ্ণ উদ্দেশ্য। এই কাব্যগুলির আখ্যানাংশে বৈষ্ণব পুরাণাদির, বিশেষত ভাগবতে’র প্রভাব সুস্পষ্ট। সম্ভবত পঞ্চদশ শতাব্দীর বিষ্ণুদাস ‘মনোদূত’-এর রচয়িতা; ইহাতে আছে ভক্তকর্ত্তৃক কৃষ্ণসমীপে স্বীয় মনকে দূতরূপে প্রেরণ। বিষ্ণুদাসের বংশধর রামরাম শর্মার মনোদূতে’ প্রেরক ও দূতের উক্তি-প্রত্যুক্তি রহিয়াছে। রূপগোস্বামী রচিত দূতকাব্য ‘হংসদূত’ ও ‘উদ্ধবসন্দেশ। প্রথমটির বিষয়বস্তু ললিতা কর্ত্তৃক মথুরায় কৃষ্ণের নিকট রাধার বিরহজ্বালা প্রশমিত করিবার অনুরোধ সহ হংসকে দূতরূপে প্রেরণ। মথুরা হইতে বৃন্দাবনে কৃষ্ণকর্ত্তৃক প্রধানা গোপীগণের, বিশেষত রাধার উদ্দেশ্যে উদ্ধবের মাধ্যমে সন্দেশ প্রেরণ ‘ভাগবতো’ক্ত এই ব্যাপার দ্বিতীয়টির উপজীব্য। শ্রীকৃষ্ণ সার্বভৌমের (১৭শ-১৮শ শতক) পদাঙ্কদূত’-এর বিষয়বস্তু কৃষ্ণের বিরহবিধুর গোপীগণ কর্ত্তৃক তৎপদাঙ্কসমূহকে মথুরায় দূতরূপে গমনের অনুরোধ। একই নামের অপর কাব্য অম্বিকাঁচরণ-রচিত।
জনৈক জয়দেবের শৃঙ্গারমাধবীয়চ’ নামক একখানি কাব্য আছে। জীবগোস্বামীর ‘গোপালচ’র পূর্বার্ধে কৃষ্ণের বৃন্দাবনলীলা এবং উত্তরার্ধে মথুরাও দ্বারকালীলা বর্ণিত হইয়াছে। কবিকর্ণপুরের ‘আনন্দবৃন্দাবনচম্পূ’ নামক বিশাল কাব্যের বিষয়বস্তু কৃষ্ণের বৃন্দাবনস্থ নিত্যলীলা। রঘুনাথদাসের মুক্তাচরিত্র’ নামক চম্পুকাব্যের উপজীব্য কৃষ্ণের নৈমিত্তিক লীলার অন্তর্গত দানলীলা। চিরঞ্জীবের (১৭শ-১৮শ শতক) মাধবচ’তে বর্ণিত ঘটনাবলী এইরূপকৃষ্ণের মৃগয়াগমন, বনে কলাবতী নাম্নী নারীর দর্শন ও পরস্পরের প্রতি আসক্তি, স্বয়ংবরে কলাবতাঁকে কৃষ্ণের পত্নীরূপে লাভ, কলাবতীসহ প্রত্যাবর্তনকালে রাক্ষসগণের সহিত কৃষ্ণের যুদ্ধ ও জয়লাভ, মধুপুরে কলাবতীসহ তাঁহার বাস, নারদের অনুরোধে কৃষ্ণের দ্বারকাগমন, বিরহক্লিষ্টা কলাবতীর শোচনীয় অবস্থা, কলাবতীকর্ত্তৃক হংসকে দূতরূপে প্রেরণ এবং দ্বারকা হইতে কৃষ্ণের মধুপুরে প্রত্যাবর্তন। বাণেশ্বর বিদ্যালঙ্কারের (১৭শ-১৮শ শতক) চিত্ৰচতে বর্ধমানাধিপতি চিত্রসেনের রাজত্বকালে মহারাষ্ট্ররাজ সাহুর বঙ্গদেশ আক্রমণ, রাজা কর্ত্তৃক ষট্চক্রভেদ প্রভৃতি কর্ত্তৃক ধর্মকার্যের অনুষ্ঠান, রাজার অদ্ভুত স্বপ্নবৃত্তান্ত, স্বপ্নে বৈষ্ণবমতে বেদান্ততত্ত্ব সম্বন্ধে রাজার জ্ঞানলাভ প্রভৃতি বর্ণিত হইয়াছে। মনে হয়, চৈতন্যপ্রচারিত বৈষ্ণবধর্ম অনুসারে জীবাত্মার মুক্তিলাভের উপায় বর্ণনা কবির মুখ্য উদ্দেশ্য। বর্ধমান জিলার রঘুনন্দন গোস্বামীর (১৮শ শতক) গৌরাঙ্গচ’তে ‘আস্বাদ’ নামক বত্রিশটি পরিচ্ছেদে চৈতন্যের জন্ম হইতে জীবনের যাবতীয় কার্যকলাপ বর্ণিত হইয়াছে।
