যোগদর্শনে উক্ত বিজ্ঞানভিক্ষুর ‘যোগবার্তিক’ এবং গঙ্গাধর কবিরাজের ‘পাতঞ্জলসূত্রভাষ্য’ উল্লেখযোগ্য।
বিজ্ঞানভিক্ষু-রচিত ‘বিজ্ঞানামৃতভাষ্য’ ব্রহ্মসূত্রের ব্যাখ্যা। আনুমানিক খ্ৰীষ্টীয় ষোড়শ শতকের প্রথমার্ধে ফরিদপুরের কোটালিপাড়ার অন্তর্গত উনশিয়া গ্রামে আবির্ভূত মধুসূদন সরস্বতী আকবরের সভায় সম্মানিত হইয়াছিলেন বলিয়া প্রসিদ্ধি আছে। মধুসূদন-রচিত দর্শন বিষয়ক গ্রন্থ ও টীকাসমূহের সংখ্যা দ্বাদশ; ইহাদের মধ্যে ‘অদ্বৈতসিদ্ধি’ বেদান্তদর্শনে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। ‘প্রস্থানভেদ’ নামক গ্রন্থে মধুসূদন সমস্ত বিদ্যার সারোল্লেখপূর্বক বেদান্তের প্রাধান্য প্রতিপাদন করিয়াছেন। নবদ্বীপের মহানৈয়ায়িক বাসুদেব সার্বভৌম লক্ষ্মীধরকৃত ‘অদ্বৈত-মকরন্দ’ নামক গ্রন্থের টীকা রচনা করিয়াছিলেন। বাংলা দেশের স্বল্পজ্ঞাত বেদান্ত-বিষয়ক গ্রন্থসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য গৌড়পূৰ্ণানন্দ কবিচক্রবর্তীর তত্ত্বমুক্তাবলী-মায়াবাদ শতদূষণী’, গদাধরের নৈয়ায়িক?) ব্রহ্মনির্ণয়’, সম্ভবত মধুসূদনের সমসাময়িক গৌব্রহ্মানন্দের ‘অদ্বৈতসিদ্ধান্তবিদ্যোতন’, রামনাথ বিদ্যাবাচস্পতির ‘বেদান্ত রহস্য’, পদ্মনাভ মিশ্রের (আ খ্রী ১৬ শতক), ‘খণ্ডনপরাক্রম’, নন্দরামতর্কবাগীশের (খ্রী ১৭শ শতক) ‘আত্মপ্রকাশক। কৃষ্ণচন্দ্রের সভাপণ্ডিত রামানন্দ বাচস্পতি বা রামানন্দ তীর্থ বেদান্তবিষয়ে অদ্বৈতপ্রকাশ’ ও ‘অধ্যাত্মবিন্দু’ প্রভৃতি সাত আটখানি গ্রন্থ প্রণয়ন করিয়াছিলেন। অধ্যাত্মবিন্দুতে হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈনদর্শনের প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয়ের উল্লেখপূর্বক ইনি বেদান্তমতের প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন। তত্ত্বসংগ্রহ নামক গ্রন্থে রামানন্দ বেদান্ত ও সাংখ্য মতের সাহায্যে বিভিন্ন দেবদেবীর অস্তিত্ব ও মাহাত্ম প্রতিপাদন করিয়াছেন। এই স্বল্পজ্ঞাত লেখকগণের মধ্যে কেহ কেহ শারীরিকসূত্র ও গীতা প্রভৃতির টীকাও রচনা করিয়াছিলেন।
৩
তন্ত্র
কোন কোন পণ্ডিতের মতে বাংলা দেশেই সর্বপ্রথম তন্ত্রশাস্ত্রের উদ্ভব হয়। ইহা বিতর্কের বিষয় হইলেও এই দেশের ধর্মজীবনে যে তন্ত্রের প্রভাব সুপ্রতিষ্ঠিত সেই বিষয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নাই। বাংলা দেশের পূজাপার্ব্বণে এবং স্মৃতিনিবদ্ধগুলিতে তান্ত্রিক প্রজাব সুস্পষ্ট। এই দেশে পূৰ্ণানন্দ, রামকৃষ্ণ পরমহংস, গোঁসাই ভট্টাচার্য, বামাক্ষ্যাপা ও অর্ধকালী প্রভৃতি বহু তান্ত্রিক সাধক ও সাধিকার আবির্ভাব হইয়াছিল। তাহা ছাড়া, অনেক তন্ত্রগ্রন্থও বাঙালী পণ্ডিতগণ রচনা করিয়াছিলেন। তন্ত্রশাস্ত্র প্রধানতঃ হিন্দু ও বৌদ্ধ ভেদে দ্বিবিধ। হিন্দুতন্ত্র প্রধানতঃ শৈব, শাক্ত অথবা বৈষ্ণব; প্রথম দুই শ্রেণীর গ্রন্থের সংখ্যাই অধিকতর।
আনুমানিক ১৪শ শতকের পরিব্রাজকাঁচার্য ‘কাম্যযন্ত্রোদ্ধার’ নামক নিবন্ধে তান্ত্রিক যন্ত্রসমূহ সংগ্রহ করিয়াছেন। চৈতন্যের সমকালীন বা কিঞ্চিৎ পরবর্তী কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ এই শাস্ত্রে যুগন্ধর পুরুষ। তৎপ্রণীত তন্ত্রসার’-এ হিন্দুতন্ত্রের সকল সম্প্রদায়েরই সার লিপিবদ্ধ আছে। ইহাতে তন্ত্রশাস্ত্রের প্রধান বিষয়গুলির আলোচনা ছাড়াও বিভিন্ন দেবদেবীর স্তবস্তোত্র লিপিবদ্ধ আছে। বাংলা দেশে প্রচলিত কালীমূর্ত্তির কল্পনা ও পূজার প্রবর্তন নাকি কৃষ্ণানন্দেরই কীর্তি। অমৃতানন্দ ভৈরব ও রামানন্দ তীর্থ তন্ত্রসারের’ পৃথক পৃথক্ রূপ প্রস্তুত করিয়াছিলেন। শ্ৰীতত্ত্বচিন্তামণি’ কৃষ্ণানন্দের নামাঙ্কিত অপর একখানি তন্ত্রগ্রন্থ। ‘সর্বোল্লাস’ নামক গ্রন্থ ত্রিপুরা জিলার মেহার গ্রামনিবাসী সর্ববিদ্যা’ উপাধিধারী খ্রীষ্টীয় পঞ্চদশ শতকের সর্বানন্দের নামাঙ্কিত। আনুমানিক খ্রীষ্টীয় ষোড়শ শতকের প্রথম বা মধ্যভাগে ব্রহ্মানন্দ গিরি শাক্তানন্দতরঙ্গিণী’ ও ‘তারারহস্য’ নামক গ্রন্থদ্বয় রচনা করেন। ইহার শিষ্য ময়মনসিংহ জিলার কাটিহালী গ্রামনিবাসী পূৰ্ণানন্দ পরমহংস পরিব্রাজক নিম্নলিখিত তন্ত্রগ্রন্থসমূহের রচয়িতা: শ্যামারহস্য’, শাক্তক্রম’, শ্ৰীতত্ত্বচিন্তামণি’, তত্ত্বানন্দতরঙ্গিণী, ষটকর্মোল্লাস’ ও ‘কালিকাদিসহস্রনামস্তুতিরত্নটীকা’ ষট্চক্র বা ষট্চক্রভেদ’, ‘গদ্যবল্লরী’, আনুমানিক খ্ৰীষ্টীয় ষোড়শ-সপ্তদশ শতকের গৌড়ীয় শঙ্করে নামাঙ্কিত গ্রন্থ ‘তারারহস্যবৃত্তি’, ‘শিবার্চনমহারত্ন’, ‘শৈবরত্ন’, কুলমূলাবতার’ ও ‘ক্রমস্তব’। অজ্ঞাতনামা লেখকের ‘রাধাতন্ত্র’ সম্ভবত বাংলা দেশে রচিত। রাধার সহিত শক্তির উপাসক কৃষ্ণের মিলনেই সিদ্ধিলাভ–ইহাই এই তন্ত্রের প্রতিপাদ্য।
উক্ত গ্রন্থসমূহ ব্যতীত পঞ্চাশটিরও অধিকসংখ্যক তন্ত্রগ্রন্থ বাঙালী রচয়িতৃগণের নামাঙ্কিত; এই রচয়িতৃগণের নাম অনেকের নিকট অজ্ঞাত বা অল্পজ্ঞাত। এই গ্রন্থগুলি প্রায়ই মৌলিকতাবিহীন; ইহাদের মধ্যে অনেকগুলি প্রসিদ্ধ তন্ত্রগ্রন্থের অথবা তান্ত্রিক স্তবস্তুতির টীকাটিপ্পনী। এই শ্রেণীর গ্রন্থসমূহের মধ্যে রামতোষণ বিদ্যালঙ্কারের প্রাণতোষিণী’ উল্লেখযোগ্য। গ্রন্থকার ছিলেন কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের বৃদ্ধপ্রপৌত্র। ২৪ পরগণা জিলার খড়দহের প্রাণকৃষ্ণ বিশ্বাসের আনুকূল্যে এই গ্রন্থ রচিত হয়।
